শঙ্কা কাটছে না দাকোপের ৭টি ইউনিয়নের মানুষের

প্রথম সকাল ডটকম (খুলনা): নদী শাসন ব্যবস্থা না থাকায় শঙ্কা কাটছে না আইলা দুর্গত খুলনার দাকোপের দুইটি পোল্ডারের ৭টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের।

পানি উন্নয়ন বোর্ড এ দুইটি পোল্ডারে ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চায়নার একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

কিন্তু মেগা বাজেটের এই প্রকল্পের আওতায় নদী শাসনের ব্যবস্থা না থাকায় শঙ্কার মধ্যে আছে এলাকাবাসী।

নদী ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া বাঁধ নির্মাণ হলে কয়েক শত কোটি টাকা অপচয় ছাড়া আর কোনো কাজ হবে না বলে মন্তব্য করছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।

বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় খুলনার দাকোপ উপজেলার আড়াই লক্ষাধিক মানুষকে নদী ভাঙন এবং নদীর লবনাক্ততা পানির সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করে বাঁচতে হয় সারা বছর। প্রায় নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছিলো উপকূলীয় এলাকার বসত ঘর-বাড়ি, যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর নদী ভাঙন তাদের নিত্যসঙ্গী।

ষাটের দশকে নির্মিত পাউবো’র বেড়িবাঁধ যুগপোযোগী নয় উল্লেখ করে দাকোপবাসী সেই থেকে নদী ভাঙন প্রতিরোধে ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছিলেন। উপজেলার ৩২ ও ৩৩ নং পোল্ডার এবং বাগেরহাট জেলার রামপাল ও শরণখোলা উপজেলার ২টি পোল্ডারে টেকসই ও মজবুত বাঁধ নির্মাণের নির্দেশ দেন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় বিশ্ব ব্যাংকের ৬৯৭ কোটি ব্যয়ে উল্লেখিত উপকূলীয় এলাকার টেকসই বাঁধ নির্মাণে একটি প্যাকেজ গ্রহণ বরা হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় দাকোপের পৃথক ২টি পোল্ডারে ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ভূমি থেকে ১০ ফুট উচ্চতা এবং বাঁধের টপ লেভেলে ১৫ ফুট প্রশস্ত করে প্রকল্পের ডিজাইন করা হয়।

চায়নার দি ফাস্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো নামক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান গত ২৬ জানুয়ারি ২০১৬ কাজ শুরু করেন। প্রকল্পের কাজ শুরু হলে এলাকাবাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই প্রকল্পে কেবল বাঁধ নির্মাণ হবে। নদী শাসন অর্থাৎ ভাঙন প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা থাকছে না।

অপর একটি সূত্রে জানা যায়, প্রজেক্ট ডাইরেক্টর হিসেবে সরাফাত হোসেন বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি নদী শাসন ব্যবস্থা রেখে প্রথম অবস্থায় কাজের ডিজাইন করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি বদলি হলে তার স্থলাভিত্তিকযুক্ত ডাইরেক্টর ডিজাইন পরিবর্তন করে কেবল বাঁধ নির্মাণকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করেন।

ফলে কয়েক শত কোটি টাকা ব্যয়ে সরকার যে উদ্দেশ্য এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে তা কাজে না আশার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। নদী শাসন ছাড়া কেবল বাঁধ নির্মাণ হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সেটি আবারও নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হান্নান নদী শাসনের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, বর্তমানে ডিজাইন অনুযায়ী ৩২নং পোল্ডারে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে মাত্র ২ কিলোমিটার নদী শাসন ব্যবস্থা ধরা আছে, অনুরূপ অবস্থা ৩৩নং পোল্ডারেও।

তিনি বলেন, প্রতিনিয়ত নদী ভাঙনের কারণে পরিস্থিতি তুলে ধরে পর্যাপ্ত নদী শাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আমরা উপর মহলে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। স্থানীয় সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাস বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে নির্মাণাধীন দাকোপ উপজেলার ৩২ ও ৩৩ নং পোল্ডারের বেড়িবাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি নদী শাসন ব্যবস্থা রাখার জন্য পানি সম্পদমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি এবং বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছি।

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ আবুল হোসেন বলেন, সমুদ্র উপকূলীয় এ উপজেলায় পৃথক দুইটি পোল্ডারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়নে বিশ্ব ব্যাংক টেকসই ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলেও নদী শাসন ব্যবস্থা না রেখে বাঁধ নির্মাণ করায় এর স্থায়ীত্ব নিয়ে বেশ চিন্তিত।

নদী শাসন ব্যবস্থা রাখার জোর দাবিসহ ৩১ নং পোল্ডারের বেড়িবাঁধটি যুগোপযোগী করে নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। নদী শাসন ছাড়া বাঁধ নির্মাণ হলেও যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আবারও আইলার মতো মহাবিপর্যয় মানুষের মাঝে নেমে আসতে পারে।

This website uses cookies.