অনিশ্চিতয়তায় কুয়াকাটা সৈকত ভাঙ্গন রোধ প্রকল্প : শঙ্কিত বিনিয়োগকারীসহ স্থানীয়রা

আরিফ সুমন, কলাপাড়া (পটুয়াখালী): অনিশ্চিতয়তার মধ্যে পড়ল কুয়াকাটা সৈকত ভাঙ্গন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সৈকত রক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্প। পরিকল্পনা মন্ত্রনালয় থেকে পুন:সমীক্ষার জন্য প্রকল্প প্রস্তাবনা ফেরত পাঠানোয় দেখা দিয়েছে এমন অনিশ্চয়তা।

ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমেও সাগরের অস্বাভাবিক জোয়ারের উত্তাল ঢেউয়ের তান্ডব থেকে রক্ষা পাচ্ছেনা সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের এ বেলাভূমি।

আগামী অর্থ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে কিনা তাও নিশ্চিত করতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমুদ্র স্্েরাতধারার পরিবর্তনে অর্ধ যুগ ধরে ব্যাপক ভাংগন আর বালুক্ষয়ে বিলীন হচ্ছে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের বেলাভূমি কুয়াকাটা।

ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে মনোলোভা এ সৈকতের দীর্ঘ ৩কি.মি. প্রশস্থ এলাকা, সৈকতের নারিকেল বাগান, ইকোপার্কসহ প্রায় শতাধিক স্থাপনা। ঝুঁকিতে পড়েছে সৈকত ঘেঁষা পর্যটন পার্ক, বিশাল বনভ’মি, ফার্মস এন্ড ফার্মসের অবশিষ্টাংশসহ মুল বেরিবাঁধ। সম্প্রতি কয়েক দফা অস্বাভাবিক জোয়ারের উত্তাল ঢেউয়ের তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে সৈকতের প্রায় ৪০ ফুট প্রস্থ এলাকা।

বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের সময় সৈকতের বেলাভূমে থাকছেনা কোন ওয়াকিং জোন। সরেজমিন দেখা গেছে, কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে সৈকতের দিকে যেতেই চোখে পড়ে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ প্রচন্ড শব্দে সৈকতে আচড়ে পড়ছে। উত্তাল জলরাশির এমন উম্মাদ নৃত্যে কুয়াকাটা মহাসড়কের প্রায় ১২ ফিট সড়ক বিলীন হয়ে গেছে।

সৈকতের পূর্ব দিকের শতবর্ষী নারিকেল, মেহেগনি, তাল গাছসহ বনবিভাগের রোপিত শতাধিক দৃষ্টি নন্দন ঝাউ গাছ উপড়ে পড়ে আছে বালু তটে। কিছু গাছের গোড়া থেকে বালু সরে গিয়ে গাছের মূলসহ শিকড়-বাকর কঙ্কালের মতো করে দাড়িয়ে আছে ধ্বংসের অপেক্ষায়। ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগানে স্থাপন করা ঐতিহ্যবহনকারী সুন্দরী ও শাল কাঠসহ মূল্যবান বিভিন্ন কাঠের তৈরী দো-তলা টিনের ঘরটি সমুদ্রের ঢেউয়ের তান্ডবে ইতোমধ্যে অস্তিত্বহীন।

ভাংগন রক্ষায় ২১২ কোটি টাকা প্রকল্প ব্যায় নির্ধারন করে সৈকতের শুন্য পয়েন্ট থেকে দুই দিকে পাঁচ কি.মি. এলাকা ২১ মিটার প্রস্থ, আড়াই মিটার উচু করে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুমোদনোর জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। চলতি বছরে এ প্রকল্পের কাজ শুরুর কথা থাকলেও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পুন:সমীক্ষার জন্য ফেরত পাঠানোয় তা হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত।

কুয়াকাটাকে অব্যাহত ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য মানববন্ধন, সমাবেশসহ সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জোরালো দাবী তুলেছেন স্থানীয় মানুষ, পর্যটকসহ ব্যবসায়ীরা। ভাঙ্গন রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বারংবার আশ্বাসের বানী শোনালেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি অদ্যবধি।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এমন চিত্র দেখে কুয়াকাটা ভ্রমনে আসা পর্যটক মনজুরুল হোসাইন বলেন, কুয়াকাটাকে রক্ষায় কার্যকর উদ্দোগ গ্রহন এখন সময়ের দাবী হয়ে উঠেছে। এখনই যথাযথ উদ্যোগ গ্রহন করা না হলে বনবিভাগের গড়ে তোলা সবুজ বেষ্টনী, কুয়াকাটার দর্শনীয় একাধিক স্পট, ঝাউ বাগান, নারিকেল বাগান, সৈকতের পশ্চিম দিকে অবস্থিত লেম্বুরচরের ম্যানগ্রোভ বন কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে কি না-এ নিয়ে  শঙ্কা দেখা আছে।

আবাসিক হোটেল কিংস’র মালিক মোস্তাফিজুর রহমান সুমন বলেন, আমি সর্বশান্ত হয়ে গেছি। জমি এবং হোটেলসহ প্রায় এক কোটি টাকার সম্পত্তি সমুদ্রের হিং¯্রতায় শেষ হয়ে গেছে। এখানে আমাদের জমি ছিলো ৩০ শতাংশ, সমুদ্রের ভাঙ্গনে গত বছর টিকেছিলো ১৪ শতাংশ। এ বছর সমুদ্রের ভাঙ্গনে হোটেল’র ভবনসহ জমি সমুদ্রের ঢেউয়ের তান্ডবে বিলিন হয়ে গেছে।

এখন অবশিষ্ট আছে মাত্র পাঁচ শতাংশ জমি। সৈকতের পশ্চিমে মাঝি বাড়ি পয়েন্টের বেড়িবাঁধের পাঁচ ফুট অংশ সমুদ্রের ঢেউয়ের তান্ডবে বিলীন হয়ে গেছে। তাও বর্ষা মৌসুমে আর থাকে কিনা বলা যায় না। কুয়াকাটা পৌর মেয়র ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য আ. বারেক মোল্লা বলেন, পর্যটকদের স্বার্থে পাবলিক টয়লেটটি রক্ষার জন্য বালুর বস্তা এবং ইট সুঁড়কি দিয়ে রক্ষার চেষ্টা চলছে।

পৌরসভার উদ্যোগে কোরবানীর পর জিও পাইপে বালু ঢুকিয়ে স্বল্প পরিসরে সৈকত রক্ষা করার উদ্যোগ নেয়া হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের জানান, ভাঙ্গন প্রতিরোধে স্থায়ীভাবে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষার জন্য ‘সৈকত রক্ষা প্রকল্প’ প্রস্তাবনা আকারে পাঠানো হয়েছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে।

যা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে পুন: বিস্তারিত সমীক্ষার জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে। যার জন্য এবছর বর্ষা মোৗসুমে সাগরের ভাঙন রোধে সৈকত রক্ষা প্রকল্পের কাজ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব উদ্যোগে ও অর্থায়নে স্বল্প পরিসরে জরুরী ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ এবং সৈকত প্রটেকশনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ও কুয়াকাটা বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ড. মো. মাছুমুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, কুয়াকাটা সৈকতে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ট্যুরিজম পার্ক এলাকাসহ সৈকতের বেলাভূমি ঢেউয়ের তোড়ে বিলীন রোধে অন্তত: দুই কিলোমিটার এলাকা জরুরী প্রটেকশনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই এর কাজ শুরু হবে।

প্রসংগত, কুয়াকাটা সৈকত রক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্প তৈরি করে ২০১৭ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড’র স্থানীয় প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠায়। সেখান থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। যা অনুমোদন শেষে এবছর কাজ শুরুর সম্ভাবনা ছিল। সম্পূর্ন সরকারি অর্থায়নে এ প্রকল্পের বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয়-বরাদ্দ নির্ধারন করা হয়েছিল ২১২ কোটি টাকা।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *