অবৈধ নিয়োগে ‘তৈয়ব আলী ডিগ্রি কলেজ’র অধ্যক্ষ মফিজুর!

শোয়েব উদ্দিন, জৈন্তাপুর (সিলেট):  সিলেটের জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো: মফিজুর রহমান চৌধুরীর নিয়োগ অবৈধ হলেও তিনি পদে বহাল রয়েছেন।

২০০৮ খৃষ্টাব্দের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা টিম অধ্যক্ষের নিয়োগ অবৈধ বলে প্রতিবেদন দেয় এবং নিয়োগ প্রাপ্তির পর থেকে এমপিও বাবদ উত্তোলিত সমুদয় অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়ার নির্দেশ প্রদান করে।

কিন্তু মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নির্দেশনাটি ধামাচাপা দিয়ে অধ্যক্ষ পদে বহাল রয়েছেন অধ্যক্ষ মফিজুর। গত ১৮বছরে মাত্র একবারের অভ্যন্তরীন অডিটে নানা আর্থিক অনিয়ম ও কেলেংকারির চিত্র ফুটে উঠে। সম্প্রতি বিভিন্ন দপ্তরে অধ্যক্ষ মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে পাঠানো অভিযোগ অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৭ খৃষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কলেজটির প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন লোকমান হোসেন।

তিনি কর্মরত থাকা অবস্থায় সম্পূর্ণ অবৈধ পন্থায় ভুয়া নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে ২০০০ খৃষ্টাব্দের ২০ জুলাই মোঃ মফিজুর রহমান চৌধুরী অধ্যক্ষ পদে অবৈধভাবে নিয়োগ লাভ করেন। নিয়োগ বৈধ করার জন্য মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে ২০০২ খৃষ্টাব্দের ৩১ অক্টোবর পুনরায় অবৈধভাবে নিয়োগ লাভ করে।

নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে মো: মফিজুর রহমান চৌধুরী নিজেই দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ খৃষ্টাব্দে কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগদান দেখালেও ২০০২ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠান তৈয়ব আলী কারিগরি কলেজ থেকে সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় কলেজের অধ্যক্ষ মো: মফিজুর রহমান চৌধুরী ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ দেখিয়ে নিয়োগ লাভ করেন।

তিনি এইচএসসি ও বি-কম ৩য় শ্রেণী এবং মাস্টার্স পূর্ব ভাগে ৩য় শ্রেণী ডিগ্রীধারী। অর্থাৎ তার একাধিক তৃতীয় বিভাগ রয়েছে। নিয়োগকালে ভুয়া তথ্য প্রদান করেছেন এবং কাম্য অভিজ্ঞতা না থাকায় মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অধ্যক্ষের নিয়োগ সম্পূর্ণ অবৈধ হিসাবে উল্লেখ করে। অধ্যক্ষ মফিজুর রহমান প্রতিবেদনের জবাব দাখিলের পর ২০১২ খৃষ্টাব্দের ১৪ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্রডশিট জবাব অনুমোদনে অনেকগুলো সিদ্ধান্ত প্রদান করে।

ব্রডশিট জবাবে দেখা যায়, অধ্যক্ষ মো: মফিজুর রহমান চৌধুরীর নিয়োগ বিধি সম্মত না হওয়ায় উত্তোলিত সমুদয় বেতন ভাতার সরকারি অংশের অর্থ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে নির্দেশ করা হয়। সেই সাথে অর্থ জমাদানের চালানের সত্যায়িত ছায়ালিপি পত্র জারির ৩০ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে অধ্যক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়। ব্রডশিটে অধ্যক্ষ হিসেবে মফিজুর রহমান তৈয়ব আলী ডিগ্রি কলেজে যোগদানের পর তৈয়ব আলী কারিগরি কলেজ থেকে অতিরিক্ত উত্তোলিত টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দানের নির্দেশও দেয়া হয়। তাছাড়া কলেজের অভ্যন্তরীণ অডিটে অধ্যক্ষের নানা অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারীর চিত্র ভেসে উঠে।

বিগত ১৮ বছর ধরে তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করলেও তার মেয়াদ কালে কলেজের অভ্যন্তরীণ অডিট হয়েছে ১ বার মাত্র। অভিযোগ উঠেছে অধ্যক্ষ কলেজের গভর্নিং বডিকে ব্যবহার করে এসব অনিয়ম করছেন। সূত্র আরও জানায়, ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ দেখিয়ে নিয়োগসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ২০০৫সনে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি মরহুম রশিদ হেলালী অধ্যক্ষ মোঃ মফিজুর রহমান চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করে।

কিন্তু অধ্যক্ষের সহোদর রাষ্ট্রপ্রতির তৎকালীন প্রেস সচিব মোখলেছুর রহমান চৌধুরীর সুবাদে তিনি ওই যাত্রায় রক্ষা পান। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক প্রতাপ চৌধুরী জানান, জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ মফিজুর রহমানের নিয়োগ বিধি সম্মত নয়, মর্মে তারা একটি অভিযোগ পেয়েছেন।

কলেজের শিক্ষক প্রতিনিধির অভিযোগ প্রাপ্তির পর তারা সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারী এবং অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করেছেন। উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করে তারা এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ে পত্র দিয়েছেন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলে জানান এ কর্মকর্তা। এ ব্যাপারে কলেজের গভর্ণিং বডির সভাপতি মাস্টার আব্দুর রহিম জানান, কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে কলেজ গভর্নিং বডির আগামী সভায় আলোচনা হবে।

কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ মফিজুর রহমান চৌধুরী মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তাঁর নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করার কথা স্বীকার করলেও এসব আপত্তি পরবর্তীতে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানান। তবে, নিস্পত্তির কোন ডকুমেন্ট দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য মুটো ফোনের মাধ্যমে ক্ষুদে বার্তায় অনুরোধ করেন।

এ ব্যাপারে কলেজের শিক্ষক প্রতিনিধি মাসুক আহমদ জানান, অধ্যক্ষ মোঃ মফিজুর রহমান চৌধুরীর নিয়োগ সম্পূর্ণ অবৈধ। ইতিপূর্বে গ্রহণকৃত বেতনের টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ফেরত দানের নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের এ আদেশ উপেক্ষা করে তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বহাল তবিয়তে আছেন।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *