মজুরী বৈষম্যের শিকার শাহজাদপুরের চাতালের মহিলা শ্রমিকেরা

মাসুদ মোশাররফ, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ): সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার চাতালে কর্মরত নারী শ্রমিকরা এখনও মজুরী বৈষম্যের শিকার হয়ে কোনমতে সংগ্রামী জীবনযাপন করছে। গোটা উপজেলায় প্রায় ২০টির মত ধানের চাতাল রয়েছে।

এর মধ্যে নরিনা গ্রামেই রয়েছে বড় বড় ৫টি চাতাল। এছাড়াও কুটি সাতবাড়িয়া, পুটিয়া, ঘোড়শাল, বেতকান্দী, বাঘাবাড়ী, তালগাছীতে ধানের চাতাল রয়েছে। নরিনার ৫টি চাতাল মিলে প্রায় নারী পুরষ মিলে ৩ শতাধিক শ্রমিক কাজ করে।

এর মধ্যেই সিংহভাগ শ্রমিকই নারী। অধিকাংশই দরিদ্র, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারী। জীবিকার প্রয়োজনে এসব শ্রমিকরা রোদে পুড়ে কাজ করলেও নায্য মজুরী থেকে তারা বঞ্চিত।

ফলে নারী শ্রমিকদের প্রতি চরম অবহেলা করা হচ্ছে বলে তারা অভিযোগে জানিয়েছেন। সরেজমিনে ঘুরে গত সোমবার নরিনায় ধান চাতালগুলো দেখা যায়, নারী শ্রমিকদের পরিশ্রমের নানা চিত্র। সেখানে প্রতিটি চাতালে ৪ থেকে ৫ জন নারী শ্রমিক এবং ২ জন পুরুষ শ্রমিকসহ এক একটি চাতালে ৭-৮ জন শ্রমিক কাজ করছে।

একজন পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি একজন নারী শ্রমিক গুদাম থেকে ধান নামানো, ধান ভেজানো, গ্যাস চুল্লিতে ধান সিদ্ধ করা, ধান শুকানো, ভাঙ্গানো, চাল ও গুড়া পৃথক করা চাল বস্তায় ভরা, বস্তা সেলাই করাসহ নানান ধরনের কাজ করে চলেছেন। থ্রি স্টার অটো রাইস  মিলের শ্রমিক নরিনা গ্রামের মর্জিনা খাতুন জানায়, দীর্ঘ ৮ মাস যাবৎ এই মিলে কাজ করছি।

ধান সিদ্ধ করা থেকে শুরু করে শুকিয়ে ঘরে তোলা পর্যন্ত তার কাজ। এই কাজ করে মাসুদা তার বৃদ্ধা মা ও তিন বছরের সন্তান মাসুদ রানাকে নিয়ে কোন রকমে বেঁচে আছে। মর্জিনা আরও জানায়, এখান থেকে আমি যা পাই তা দিয়ে সংসার চলে খুবই কষ্টে। আবার রয়েছে মিল মালিকের মন জুগিয়ে চলা।

মর্জিনা ও জরিনার মতো অভাবে জর্জরিত আরো অনেক নারী শ্রমিক দিনের পর দিন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে চলেছেন এই নরিনার ধান চাতালে। মহিলা শ্রমিক ডালিম খাতুন জানান, কাজের অভাব তার ওপর আবার জিনিসের দাম ‘এতে আমাগো মজুরী বেশী হইলেও করন লাগবো, আবার কম হইলেও করন লাগবো।

তারা জানায়, মালিকরা পুরুষ শ্রমিকদের অনেক বেতন দেন। কিন্তু তাদের বেলায় উল্টো। তবে অন্যান্য সময় যা পায় তা দিয়ে তাদের কোন রকম চললেও  এখন বর্ষা মৌসুমে বিপাকে পড়ে তারা। বৃষ্টির কারণে কাজ না থাকায় অর্ধাহারে অনাহারে থাকতে হয় তাদের। নরিনার চাতালগুলোতে ধান শুকানো ও ভাঙ্গানোর কাজে পুরুষদের সঙ্গে নারীরা একই ধরণের কাজ করলেও পুরুষ শ্রমিকরা মাসে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা পান আর নারীরা ৮শ থেকে ১৫শ টাকা।

এতে নারী শ্রমিকরা মজুরী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে তারা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। এ নরিনা থ্রি স্টার অটো রাইচ মিলের ম্যানেজার হাবিবুর রহমান জানান, তাদের এখানে সরকারি কোন নিয়ম কানুন নেই। তবুও মালিকপক্ষ নারী শ্রমিকদের সাধ্য মতো মজুরি দেয়ার চেষ্টা করেন। আর খুদের সাথে তারা কিছু ভাল চালও নারী শ্রমিকদের দিয়ে থাকেন বলে তিনি জানালেন।

সকল মিল ও চাতাল মালিক এক হয়ে নারী শ্রমিকদের বেতন বাড়িয়ে দিলে তারা উপকৃত হবে। তাছাড়া যাতায়াত সমস্যা ও সুযোগ সুবিধার অভাবে অনেক পাইকারীরা এখানে আসতে চান না। ফলে মালিকপক্ষও খুব ব্যবসায়িক সফলতা পাচ্ছেনা। সরকারী সাহায্য সহযোগীতা পেলে ভবিষ্যতে এই নরিনা হয়ে উঠতে পারে জেলার  প্রধান চাল উৎপাদন ও সরবরাহকারী স্থান।

This website uses cookies.