মৃত্যুর আগেও মায়ের হাতে ভাত খেয়েছিল দুই বোন

প্রথম সকাল ডটকম ডেস্ক: বইয়ের তাকে থরে থরে সাজানো বই-খাতা। কাঁচা হাতে নাম লেখা: হাসিবা তাসনীম হিমি। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মায়ের সঙ্গে পড়তে বসত শিশুটি। তবে সোমবারের সন্ধ্যাটা ছিল অন্য রকম। প্রতিদিন বিকাল সাড়ে ৩টার মধ্যে অফিস থেকে বাসায় ফিরতেন জেসমিন আক্তার।

সোমবার দুপুর আড়াইটার মধ্যে বাসায় ফিরেন তিনি। ঘরে এসে ফুটফুটে দুই মেয়েকে খাটে বসিয়ে নিজ হাতে ভাত খাওয়ান। এরপর তাদের সঙ্গে নিয়ে ঘরের ভেতরে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়েন। সন্ধ্যায় দরজা ভেঙে স্ত্রী জেসমিন ও আদরের দুই মেয়ে হিমি ও হানিকে রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন হাসিবুল হাসান।

পুলিশ সূত্রে, ফ্ল্যাটে প্রবেশের বাম দিকের প্রথম রুমের মেঝেতে জেসমিন আক্তারের এবং খাটের ওপর দুই মেয়ের রক্তাক্ত লাশ পড়েছিল। জেসমিনের গলা ও দুই হাতের কব্জি কাটা। পেটে ৮-১০টি আঘাত আছে। বড় মেয়ে হিমি’র বুকে তিনটি ছুরির আঘাত, হাতের কব্জি কাটা ও গলা জবাই করা। আর ছোট মেয়ে হানি’র পেটে একটাই ছুরির আঘাত।

তার নাড়িভুঁড়ি বের হওয়া। ঘটনাস্থল দারুস সালাম থানার অধীন মিরপুর বাংলা কলেজ সংলগ্ন পাইকপাড়া সি টাইপ সরকারি কোয়ার্টারের ১৩৪ নম্বর ভবনের চারতলার বাম পাশের একটি ফ্ল্যাট। সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে এ ফ্ল্যাট থেকে তিনটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হচ্ছেন জেসমিন আক্তার (৩৫), তার মেয়ে হাসিবা তাহসিন হিমি (৯) এবং আদিলা তাহসিন হানি (৫)।

ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়। আর ময়নাতদন্তের জন্য লাশ তিনটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। নিহতের পবিবার ও পুলিশের ধারণা, চাকরি ও সংসার নিয়ে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে দুই সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন মা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার।পুলিশ জানায়, ঘটনার সময় তাদের স্বজনদের দুই/তিনজন ওই ফ্ল্যাটেই উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে নিহতের স্বামীর ভাগিনা রওশন জামিল এবং তার স্ত্রী রোমানা পারভীন ও নিহত জেসমিনের এক খালাতো বোন রেহানা উপস্থিত ছিলেন। তারা পাশের ঘরে শুয়ে ছিলেন। কিন্তু কেউই কোনও রকমের চিৎকারের শব্দ শোনেননি বলে জানিয়েছেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) শেখ নাজমুল আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মা তার দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজেও আত্মহত্যা করেছেন। তবে এই ঘটনায় অন্য কোনও বিষয় জড়িত আছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জেসমিনের ভাই শাহীনুর ইসলাম বলেন, আপা তার চাকরি ও সংসার নিয়ে খুব ডিপ্রেশনে ভুগতেন।

তিনি আমাদের প্রায়ই বলতেন চাকরি করে সংসার ও বাচ্চাদের দেখাশোনা কিভাবে করবেন? বাচ্চাদের দেখাশোনা করতে হলে চাকরি ছাড়তে হবে। এসব নিয়ে তিনি সব সময় টেনশন করতেন। তিনি বলেন, ডিপ্রেশনে ভুগতে ভুগতে একটা সময় আপার প্রচণ্ড পরিমাণ মাইগ্রেনের সমস্যা দেখা দেয়।

গত মাসেও আপার হঠাৎ মাইগ্রেনের ব্যথা উঠার পর তিনি একসাথে তিনটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন। পরে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। বাসার পাশের মুদি দোকানী আব্দুল আহাদ বলেন, বাচ্চা দুইটা প্রায়ই আমার দোকানে আসতো। সোমবার দুপুর সোয়া একটার দিকে এসেছিল। বড় মেয়েটা আমার মেয়ের সঙ্গে দেড়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত পাশের মসজিদে আরবি পড়তো।

সোমবারও সে মসজিদে আরবি পড়তে গিয়েছিল। তিনি জানান, তার দোকান থেকে হাসিবুল ও জেসমিন বাজার করতো। তারা সারামাস বাজার বাকিতে নিতো এবং মাস শেষে টাকা পরিশোধ করে দিতো। জেসমিনকে দেখে কখনো অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়েনি তার। আশপাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা বলছেন, পরিবারটি বেশ হাসিখুশি ছিল।  জেসমিন ও তাঁর স্বামীর গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার ভজনপুরে।

This website uses cookies.