মিরপুরে ঘরের ভেতর মা ও দুই মেয়ের লাশ

প্রথম সকাল ডটকম: রাজধানীর মিরপুরের বাঙলা কলেজের পাশের সি টাইপ সরকারি কোয়ার্টারের ১৩৪ নম্বর ভবনের চারতলার বাসা থেকে মা ও দুই মেয়ের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

সোমবার সন্ধ্যার পর মিরপুরে বাঙলা কলেজের পাশে পাইকপাড়া সরকারি কোয়ার্টারের ভবন থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। মা জেসমিন আক্তার (৩৫)।

তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ক্যাশিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার দুই মেয়ে হাসিবা তাহসিন হিমি (৯) ও আদিবা তাহসিন হানি (৬)। এদের মধ্যে হাসিবা তাহসিন হিমি স্থানীয় একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী।

জেসমিনের স্বামী হাসিবুল ইসলাম। তিনি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে চাকরি করেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জেসমিনকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে পুরো ঘটনা রহস্যজনক বলে দাবি করেছেন সরকারি কোয়ার্টার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হেলাল উদ্দিন।

তিনি বলেন, জেসমিনের গলা ও দুই হাতের রগ কাটা ছিল। দুই বাচ্চাকে হত্যার পর যদি তিনি নিজেই আত্মহত্যা করে থাকেন তাহলে দুই হাতের রগ কাটার পর কিভাবে নিজ গলায় ছুরি চালানো সম্ভব। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে বলেন, আমাদের ধারণা এর সঙ্গে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে।

একই সঙ্গে জেসমিন অনেক পরহেজগার ও সামাজিক ছিলেন বলে জানান তিনি। পুলিশ জানায়, বিকাল ৫টার দিকে জেসমিনের স্বামী হাসিব কর্মস্থল থেকে ফিরে তাদের শোবার ঘর ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান। বেলা ৩টার দিকে দুপুরের খাবার খেয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে শোবার ঘরে ছিলেন জেসমিন। অন্য ঘরে জেসমিনের ভাইসহ অন্য স্বজনরা ছিলেন।

দারুস সালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান বলেন, হাসিব ফেরার পর অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ঢুকে তিনজনের মৃতদেহ দেখতে পান। এ সময় হাসিবের সঙ্গে তার স্ত্রীর ভাইও ছিলেন। এরপর থানায় খবর দেয়া হলে পুলিশ গিয়ে লাশ তিনটি উদ্ধার করে। ওসি সেলিমুজ্জামান বলেন, তিনজনেরই গলাকাটা এবং জেসমিনের গলার সঙ্গে পেটেও ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল।

ঘটনাস্থল থেকে একটি ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে। মিরপুর জোনের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আহমেদ বলেন, যেখানে হত্যার ঘটনা ঘটেছে, বাইরে থেকে কোনো লোক দিয়ে ঘটনা ঘটানোর সম্ভাবনা খুবই কম। পরিবারের সদস্যদের উদ্ধৃতি দিয়ে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, জেসমিন আক্তারের মাইগ্রেনের সমস্যা ছিল। কিছু দিন আগে ভারত থেকে চিকিৎসা করিয়ে আনা হলেও কোনো উন্নতি হয়নি।

পাশাপাশি একমাস আগে তার মা মারা যান। জেসমিন হতাশায় ভুগছিলেন। জেসমিন সবসময় বলতেন, তিনি না থাকলে মেয়েদের কে দেখবে। মানসিক সমস্যা থেকে জেসমিন ২৫ দিন আগে মেয়েদের অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খাওয়াতে গিয়েছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে জানিয়েছেন। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে জানান পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদ।

জেসমিনের ভাই শাহিনুর ইসলাম বলেন, আমার বোনের মাইগ্রেনের সমস্যা ছিল। গত মাসেও ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল। সবসময় দুশ্চিন্তা করত। মানসিক চাপে থাকত। তিনি বলেন, বেলা ৩টার দিকে বাসায় ঢুকে দেখি রুম ভেতর থেকে আটকানো। টিভির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এরপর তিনি আর ডাকাডাকি করেননি। পরে বাইরে চলে যান।

সন্ধ্যা ৬টায় বাসায় ফিরে দেখতে পান দুলাভাই হাসিব আছেন। রুমের দরজা তখনও বন্ধ। তার দুলাভাই ৫টার দিকে বাসায় ফেরেন। জেসমিনের খালাতো বোন রেহানা পারভীন জানান, তার আপা ভারতসহ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মাইগ্রেনের চিকিৎসা করাতেন। মানসিক রোগী ছিলেন না। প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী সোহেল  বলেন, জেসমিন বেলা ২টার দিকে অফিস থেকে বাসায় ফিরে দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রুমে ঢোকেন। ৫টার দিকে তার স্বামী অফিস থেকে আসেন।

বাসায় এসে শোবার ঘরের দরজা বন্ধ দেখে কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা না করে নামাজ পড়তে যান। মাগরিবের আজানের সময় জেসমিনের খালাতো বোন রেহানা পারভীন দরজায় নক করেন। কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে তিনি তার ভাই শাহিনকে ফোন দিয়ে ডাকেন। এ সময় তার স্বামী হাসিবও চলে আসেন। একপর্যায় দরজা ভেঙে রুমে প্রবেশ করেন।

তখন তারা রক্তাক্ত লাশ দেখতে পেয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) শেখ নাজমুল আলম সাংবাদিকদের জানান, তারা ধারণা করছেন, দুই সন্তানকে হত্যা করে জেসমিন নিজে আত্মহত্যা করেছেন। রুমের দরজা ভেতর থেকে আটকানো ছিল।

তবে এ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বন্ধ ওই ঘরে শিশু দুটির লাশ ছিল বিছানায়। তাদের মায়ের লাশ পড়ে ছিল বিছানার পাশেই মেঝেতে। লাশ তিনটি উদ্ধারের পাশাপাশি এ ঘটনায় ব্যবহৃত একটি ছুরিও পুলিশ উদ্ধার করেছে। পুলিশ জানায়, জেসমিনের গলা ও দুই হাতের কব্জি কাটা। পেটে ৮-১০টি আঘাতের চিহ্ন আছে।

বড় মেয়ে হিমির বুকে তিনটি ছুরির আঘাত, হাতের কব্জি কাটা ও জবাই করা। আর ছোট মেয়ে হানির পেটে একটাই ছুরির আঘাত। তার নাড়িভুঁড়ি বের হওয়া। পরে রাত সাড়ে ১০টার পর সিআইডি ক্রাইম সিন ইউনিটের পরিদর্শক সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। দারুস সালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।

This website uses cookies.