নবীগঞ্জে প্রাইমারী স্কুলে দপ্তরী নিয়োগে জালিয়াতি প্রমানিত হওয়ায় ৯ বিদ্যালয়ে নিয়োগ সাময়িক বাতিল

উত্তম কুমার পাল হিমেল, (নবীগঞ্জ): নবীগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কামপ্রহরী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নবীগঞ্জ তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাজিনা সারোয়ার যাচাই-বাছাই ছাড়াই আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ভুয়া স্কুলসনদ ও ভূয়াজন্ম সনদ দিয়ে চাকুরী প্রদান করায় জনমনে দেখা দিয়েছে মারাত্মক ক্ষোভ।

কাগজপত্র সঠিক থাকা সত্ত্বেও টাকা দিতে না পারায় নিয়োগ বঞ্চিতরা হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবরে ২৬ জন প্রার্থী লিখিত অভিযোগ দেওয়ার  ফলে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মনীষ চাকমা প্রাথমিকভাবে যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় নবীগঞ্জ উপজেলার ৯টি বিদ্যালয়ের নিয়োগকৃত দপ্তরীকে সাময়িকভাবে নিয়োগ বাতিল করেন।

বাতিলের খরব শোনে তারা নিয়োগ বৈধ করতে নবীগঞ্জের বাহির থেকে পুনরায় স্কুল সনদ সংগ্রহ করতে দৌড়ঝাপ শুরু করছেন। অনিয়মের ফলে বাতিলকৃত বিদ্যালয়গুলো হল নবীগঞ্জ উপজেলার করিমপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুর্গাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, দৌলতপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুনারু সরকারী প্রাতমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম তিমিরপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর সোনাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, হায়রারঘাট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, গুজাখাইড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ও গজনাইপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।

হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক কর্তৃক ৯ টি বিদ্যালয়ের দপ্তরী নিয়োগ সাময়িকভাবে বাতিলের সংবাদ গত ১২ ফ্রেবুয়ারী দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশ হলে নড়েচড়ে বসেন হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও নবীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এ ব্যাপারে বঞ্চিত প্রার্থীরা সিলেট বিভাগীয় কমিশনার, হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবরে লিখিত অভিযোগ প্রেরন করছেন।

অভিযোগ সুত্রে জানা যায়, নবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৫২ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কামপ্রহরী পদের মৌখিক পরীক্ষা গত ১৩ ডিসেম্বর নিয়োগ কমিটির সভাপতি নবীগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন নির্বাহী অফিসার তাজিনা সারোয়ারের কার্যালয়ে অনুষ্টিত হয়। এতে অংশ গ্রহন করেন ৪৯০ জন।

তড়িঘড়ি করে পরদিন ১৪ ডিসেম্বর ফলাফল ঘোষনা করে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ৫২ জনকে নিয়োগ দেয় নিয়োগ কমিটি। নিয়োগ কমিটির সভাপতি ছিলেন নবীগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন নির্বাহী অফিসার তাজিনা সারোয়ার এবং সদস্য সচিব ছিলেন তৎকালীন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক।

৬ সদস্যর নিয়োগ কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানের ১ জন করে প্রতিনিধি এবং নির্ধারিত বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয় গুলোতে  দপ্তরী পদে নিয়োগ পত্র প্রদান করার পরই এ পদে বঞ্চিত প্রার্থীরা নানা অনিয়মের অভিযোগ তোলেন।

সনদে জালজালিয়াতি, ভুয়া পরিচয়, ভুয়া ঠিাকানা ব্যবহার করে চাকরী নেওয়ার অভিযোগ এনে ২৬ জন প্রার্থী হবিগঞ্জ জেলা প্রমাসকের নিকট লিখিত অভিযোগ প্রেরন করেন।  তৎকালীন জেলা প্রশাসক মনীষ চাকমা এসব অভিযোগ তদন্ত করে  ৯টি বিদ্যালয়ে দপ্তরী নিয়োগে দুর্নীতি ও অনিয়মের সত্যতা পান।

এ নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার পর পরই নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজিনা সারোয়ার গত ১ জানুয়ারী ব্রাম্মান বাড়িয়ায় এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক সিলেটের দক্ষিন সুরমায় বদলী হন। নবীগঞ্জ উপজেলা বর্তমান শিক্ষা কর্মকর্তা জিয়াউল হক সাংবাদিকদের জানান,তিনি গত ৩ জানুয়ারী নবীগঞ্জে যোগদান করার পর জেলা প্রশাসকের মহোদয়ের চিঠি পাওয়ার পর ৯টি বিদ্যালয়ের দপ্তরী নিয়োগ সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে।

এ পরীক্ষায় নবীগঞ্জ উপজেলার অন্যান্য বিদ্যালয়ের মত অংশ নেয় ইনাতগঞ্জ ইউনিয়নের ২২ নং করিমপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৮ জন প্রার্থী। নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুযায়ী এ বিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় ১ম দেখানো হয় করিমপুর গ্রামের গিরীন্দ্র দাশের পুত্র দ্বিজেন দাশ,২য় চানপুর গ্রামের হিরালাল রায়ের পুত্র জগন্নাথ রায়এবং ৩য় চানপুর গ্রামের ব্রজগোপাল দাশের পুত্র বিশ্বজিত দাশকে দেখানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চাকুরীর জন্য চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থী করিমপুর গ্রামের গিরীন্দ্র দাশের পুত্র  দ্বিজেন দাশ মুলত ৫ম শ্রেনীও পাশ না করে নাদামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে প্যাডে প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর জাল করে সনদ দাখিল কওে চাকুরীর জন্য  নির্বাচিত হয়।

সনদপত্র প্রদানকারী নাদামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে খোজ নিয়ে জানাযায়, করিমপুর গ্রামের গিরীন্দ্র দাশের পুত্র দ্বিজেন দাশ নামের কোন ছাত্র এ বিদ্যালয়ে কখনো পড়াশোনা করে নাই মর্মে প্রধান শিক্ষক প্রত্যয়ন করেছেন।

এছাড়া মেধা তালিকায় ২য় স্থান অর্জনকারী প্রার্থী চানপুর গ্রামের হিরালাল রায়ের পুত্র জগন্নাথ রায়ের দাখিলকৃত আবেদন পত্রে  জন্ম সনদ ভোটার কার্ডে জন্ম তারিখ১১/৩/১৯৭৭ ইং রয়েছে। হিসাবঅনুযায়ী ঐ প্রার্থীও বয়স হয় প্রায় ৪০ বছর। আর মেধাতালিকায় ৩য় চানপুর গ্রামের ব্রজগোপাল দাশের পুত্র বিশ্বজিত দাশের শিক্ষাগত সনদ এবংজন্ম সনদ ঠিক থাকার পরও নিয়োগকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তাকে ৩য় স্থানে রাখা হয়েছে।

তাই নিয়োগবিধি মোতাবেক ১ম ও ২য় স্থানের প্রার্থী জাল জালিয়াতীতে বাদ পড়লে  ৩য় স্থানে থাকা চানপুর গ্রামের ব্রজগোপাল দাশের পুত্র বিশ্বজিত দাশ এ পদে চাকুরী পাবার কথা থাকলেও নিয়োগের ক্ষেত্রে মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও অন্যান্যরা  সদস্যরাএ কাজ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

তাই এ অনিয়েমের প্রেক্ষিতে ৩য় স্থানে থাকা চানপুর গ্রামের বিশ্বজিত দাশের পিতা ব্রজগোপাল দাশ বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক মহোদয় সত্যতা পেয়ে ৯টি বিদ্যালয়ের দপ্তরী নিয়োগ সাময়িক বাতিল করেছেন জেনে ভাবছিলাম আমরা সবাই  সুবিচার পাব।

এখন জানতে পারছি নবীগঞ্জ  উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক সিলেটের দক্ষিন সুরমায় বদলী হলে বর্তমান শিক্ষা কর্মকর্তা জিয়াউল হককে ম্যানেজ করে  নিয়োগ বৈধ করতে করিমপুর গ্রামের গিরীন্দ্র দাশের পুত্র দ্বিজেন দাশের ভুয়া স্কুল সনদ পরিবর্তন করে এখন সুনামগঞ্জের শাল্লা কোন বিদ্যালয় থেকে স্কুল সনদ এনে দাখিল করে নেতৃবৃন্দের পিছনে দৌড়ঝাপ করছেন।

আমি হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নিকট সুবিচার চাই। এ রকম আরো অনেক অভিযোগকারীরা সুবিচার প্রার্থনা করে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার, ও দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবরে আবেদন  প্রেরন করছেন। বিষয়টি নিয়ে নবীগঞ্জে বেশ চাঞ্চলের সৃস্টি হয়েছে।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *