ভোটের হাওয়া নড়াইল-১ : আওয়ামী লীগ আসনটি ধরে রাখতে চায়, বিএনপির নিরব প্রস্তুতি

শরিফুল ইসলাম লোহাগড়া (নড়াইল): আওয়ামী লীগের দূর্গ হিসাবে খ্যাত নড়াইল-১ (সদরের আংশিক ও কালিয়া উপজেলা) আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে।

আওয়ামী লীগ নেতারা দলীয় মনোনয়ন  লাভের আশায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নিজ নিজ সংসদীয় আসনের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, চেয়ারম্যান, মেম্বর, বিশিষ্ট ব্যক্তি তথা সাধারন মানুষের সাথে মত বিনিময় শুরু করেছেন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন,মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস, বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছাসহ জনগনকে অভিনন্দন জানানো পোষ্টার, ব্যানার, ফেস্টুন শোভা পাচ্ছে নড়াইলের প্রত্যন্ত অঞ্চল,সড়ক-মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায়,হাটবাজার,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে এবং শহরের অলিতে-গলিতে।

তবে এখনও পর্যন্ত বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নির্বাচনী এলাকায় প্রত্যক্ষভাবে সরব নন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,প্রকাশ্যে না হলেও  বিএনপির নেতৃবৃন্দ ভেতরে ভেতরে দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের কমপক্ষে ১০জন নেতা দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করলেও বিএনপি ও তাদের শরীক দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থীর সংখ্যা ৩-৪ জন।

এ আসনের বর্তমান এমপি হচ্ছেন আওয়ামীলীগ দলীয় কবিরুল হক মুক্তি। আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আসনটি ধরে রাখতে চায়। নড়াইল সদর উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন এবং কালিয়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও কালিয়া পৌরসভা নিয়ে নড়াইল-১ আসন গঠিত।এ আসনে মোট  ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ৪০ হাজার ১৪ জন।এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১লাখ ১৮ হাজার ৬শ’৮৯ জন এবং মহিলা ভোটার ১লাখ ২১হাজার ৩শ’২৫ জন।

দেশ স্বাধীনের পর থেকেই  এ আসনে আওয়ামীলীগের শক্ত অবস্থান রয়েছে। ১৯৭৩ সালের প্র্রথম সংসদ নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আওয়ামী লীগ নেতা এখলাস উদ্দিন বিশ্বাস জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের ৭ম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীলীগের প্রার্থী ধীরেন্দ্রনাথ সাহা বিজয়ী হন। ২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজে প্রার্থী হয়ে এ আসন থেকে বিজয়ী হন।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে কবিরুল হক মুক্তি জয়লাভ করেন। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কবিরুল হক মুক্তি জয়ী হন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তির জনপ্রিয়তায় কিছুটা হলেও ভাটা পড়তে থাকে।

আগামি সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-১ আসন থেকে আওয়ামীলীগ দলীয় প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে  তারা হলেন-আওয়ামীলীগ নেতা লেঃ কমান্ডার ওমর আলী (অবঃ) বি এন, বর্তমান এমপি কবিরুল হক মুক্তি, আওয়ামী লীগ নেত্রী, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি, বাক্ষনবাড়িয়ার মেয়ে নড়াইলের পূত্রবধূ অ্যাডভোকেট ফজিলাতুন নেছা বাপ্পি, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোল্যা ইমদাদুল হক, জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি মো.শাহীদুল ইসলাম, যুবলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক কাজী সারোয়ার হোসেন।এছাড়া নড়াইল জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক নিজাম উদ্দিন খান নিলুর সমর্থকরা এমপি প্রার্থী হিসেবে নিজাম উদ্দিন খান নিলুকে দেখতে চাই মর্মে ব্যানার ফেষ্টুনে লিখে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টাঙিয়েছেন।

আওয়ামীলীগ দলীয় ত্যাগী নেতা কর্মীরা জানান,এলাকায় প্রচার-প্রচারণাসহ আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দৌঁড়ে এগিয়ে রয়েছেন লেঃ কমান্ডার ওমর আলী (অবঃ)। কালিয়া উপজেলার নড়াগাতি থানাধীন বাঐসোনা গ্রামের কৃতিসন্তান ওমর আলী এমপি হিসেবে দলীয় মনোনয়ন চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে বলেন,আওয়ামীলীগ সমর্থক থাকার কারণে নৌবাহিনীর কমিশন অফিসার লেফটেন্ট্যান্ট কমান্ডার হিসেবে কর্মরত অবস্থায় আমাকে বিএনপি সরকার ১৯৯৫ সালের ১৭নভেম্বর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়।

ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সক্রিয়  কর্মী ওমর আলী আরো জানান,দলকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসার কারণে চাকুরীরত অবস্থায় ১৯৯৫ সালের ১৩ অক্টোবর ভোররাতে নড়াইল জেলা আওয়ামীলীগের তৎকালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট আলী করিমের বাসা হতে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে টেলিফোনে কথা বলি।

আওয়ামীলীগের সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ থাকার কারণে ১৯৯৫ সালের ১৫ অক্টোবর আমাকে খুলনা থেকে গ্রেফতার করে ঢাকায় এনে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা শারিরিক ও মানসিক নির্যাতন করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে।ঐ সময়কার নির্যাতনে আমার বাম পা ও বাম হাত অনেকদিন যাবত অবশ ছিল এবং বর্তমানে সে হাত-পা শুকিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।

জিজ্ঞাসাবাদে  রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যকলাপের কোন সংশ্লিষ্টতা না পেলেও আওয়ামীলীগ সমর্থক থাকার কারণে আমাকে ১৪বছরের চাকুরীর মাথায় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় বিএনপি সরকার।ওমর আলী জানান,নৌ বাহিনী হতে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পর দলকে সুসংগঠিত করার কাজে নিজেকে মনোনিবেশ করি। চট্টগ্রামের হযরত মঈন উদ্দিন আল হাছানী আল মাইজভান্ডারীর প্রেরণা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় লেঃ জেনারেল নুর উদ্দিন খানসহ প্রায় ২০ জন জৈষ্ঠ্য সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি ১৯৯৬ ইং সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করে এবং এই যোগদানের সার্বিক সমন্বয়কারীর মূল ভূমিকায় ছিলেন তিনি।

এছাড়া কক্সবাজার-৪ আসনের বর্তমান এমপি আব্দুর রহমান বদিও তার প্রচেষ্টায় এবং সমন্বয়ে ১৯৯৬ইং সালের মার্চ মাসে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। বর্তমানে কালিয়া তথা নড়াইল-১ আসনের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক,ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন ওমর আলী।মাদ্রাসা,মসজিদ,গরীব রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়,অসহায়,দরিদ্রদের সহযোগিতার পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সামাজিক কাজ ও মন্দিরে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছেন তিনি।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে দেশমাতৃকা রক্ষায় মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকরেন তিনি। নড়াইল ও আশপাশের এলাকা শত্রুমুক্তকারী বীর যোদ্ধা লেঃ কমান্ডার ওমর আলী (অবঃ)  জনগনের দোয়া-অর্শিবাদ ও ভালোবাসা নিয়ে দলীয় প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হয়ে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সব শ্রেণী পেশার মানুষের সেবা করতে চান।

এমপি কবিরুল হক মুক্তি বলেন, আমার দীর্ঘ ৯ বছরের ক্ষমতাকালীন সময়ে সংসদীয় এলাকার রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।বিভিন্ন স্থানের নদী ও খালের উপর নির্মিত হয়েছে ব্রীজ। মধুমতি ও নবগঙ্গা নদীর ভাঙ্গন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা করা, ভরাট হওয়া কয়েকটি খাল পূনঃখনন করা, ৯০ ভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় তার আমলে। স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দিরের উন্নয়নে দেয়া অনুদানতো রয়েছেই।

তিনি বলেন,নড়াইল আওয়ামী লীগের সাথে আমার পরিবারের সম্পর্ক দলের শুরু থেকে। দলের নেতা-কর্মীদের সুবিধা-অসুবিধা দেখি।তাদের বিপদ-আপদে পাশে থাকি। আগামি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোল্যা ইমদাদুল হক বলেন,এ আসনে মনোনয়ন চাইব।

তবে দলের বাইরে অবস্থান করব না। ফজিলাতুন নেছা বাপ্পি এমপি বলেন, আমি নারীর ক্ষমতায়নের বিশ্বাসী। নারীকে মূলধারায় না আনলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সে লক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। এর সাথে নড়াইলের সার্বিক উন্নয়নের সাথে সংযোগ ঘটাতে নড়াইলবাসির সাথে আছি। সবকিছুর উর্ধে থেকে ২০২১ সালে মধ্যবিত্ত আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশ এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়তে চাই।

জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি (আম্বিয়া-প্রধান) শরীফ নূরুল আম্বিয়া এ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী। ওয়ার্কার্স পার্টিরও এ আসনের দিকে নজর রয়েছে। ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক কমরেড বিমল বিশ্বাস এবারও মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান। কালিয়া উপজেলা জাসদের (ইনু)  সভাপতি আকতার হোসেন রাঙ্গাও মনোনয়ন প্রত্যাশী।

নড়াইলে বিএনপির কর্মকান্ড প্রায় ৫ বছর ধরে স্থবির এবং নেতা-কর্মীরাও নিস্ক্রিয়।এ আসনে বিএনপির কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়নের জন্য কেন্দ্রে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। তারা হলেন,জেলা বিএনপি’র সভাপতি বিশ^াস জাহাঙ্গীর আলম, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ডা.শফিকুল হায়দার পারভেজ, খুলনা মহানগর বিএনপি’র সিনিয়র সহ-সভাপতি সাহারুজ্জামান মর্তুজা।

জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ডা.শফিকুল হায়দার পারভেজ বলেন,বিএনপি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নড়াইল-১ আসনের এমপি নির্বাচিত হলে অবহেলিত কালিয়া তথা গোটা জেলার সার্বিক উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করবো।দলমত সবশ্রেণীর মানুষের কাছে পরিচ্ছন্ন মানুষ হিসেবে পরিচিতি ডা: পারভেজ মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে অনেকটা আশাবাদী।

বিএনপি নেতা সাহারুজ্জামান মর্তুজা বলেন, এলাকার জনগনের সাথে তার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। এ আসন থেকে মনোনয়ন পেলে জয়ী হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী হিসেবে জেলা কমিটির সদস্য সচিব মিল্টন মোল্যা,কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বিপ্লব বিশ্বাসের নাম শোনা যাচ্ছে।অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন তাদের দলীয় প্রার্থী হিসেবে হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ খবিরুদ্দিনের নাম ঘোষনা করেছে।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *