রাজধানীর দক্ষিণ মনিপুরে সেলিম দম্পতির জাল মুদ্রার কারখানা

প্রথম সকাল ডটকম: রাজধানীর মিরপুর এলাকার দক্ষিণ মনিপুরের ৩২২/এ নাম্বারের বাসাটি হঠাৎ করেই ঘিরে ফেলে র‍্যাব। বাসার গলিতে একসঙ্গে জড়ো হয়ে যায় র‍্যাবের কয়েকটি গাড়ি। হঠাৎ র‌্যাবের গাড়ি ও বাড়িটি ঘিরে ফেলায় আশপাশের মানুষজন কিছুটা শঙ্কা-ভয়ের মধ্যেও দেখছিলেন কী হচ্ছে। র‍্যাবের একটি দল তখন প্রবেশ করে ওই বাসার ষষ্ঠ তলায়। আর বাসার নিচে অবস্থান করতে থাকেন র‍্যাবের অন্য দলের সদস্যরা। বিকেলে শুরু হওয়া অভিযান চলে রাত পর্যন্ত।

পরে জানা যায়, ওই বাসার ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাটে ভারতীয় জাল মুদ্রা তৈরি কারখানার সন্ধান পেয়েছে র‍্যাব। সেই কারখানা থেকে ৫২ লাখ জাল রুপি ও পাঁচ লাখ বাংলাদেশি টাকা এবং রুপি তৈরির সরঞ্জামও উদ্ধার করেছে র‌্যাব। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন মো. সেলিম নামের এক ব্যক্তি। তবে পুরো পরিবারকে নিয়ে থাকেন না তিনি।

তার স্ত্রী ও একজন কাজের মেয়েই শুধু থাকেন সে বাসায়। সেলিমের দুই সন্তান থাকেন গ্রামের বাড়ি। তারা সেখানেই পড়াশোনা করে। সেলিম ও তার স্ত্রী ঢাকায় জীবনযাপন করেন। কিন্তু তাদের সন্তানদের কাছে না রেখে কেন গ্রামে রেখেছেন, সেটা নিয়ে অনেক দিন থেকেই সন্দেহ করে আসছিলেন ওই বাসার কেয়ারটেকার, অন্য ভাড়াটিয়া এবং এলাকাবাসীরা। ফ্যামিলি বাসায় জাল মুদ্রার কারখানা, সেটা কেউ টেরই পায়নি।

দক্ষিণ মনিপুরের ৩২২/এ নাম্বার বাসার দারোয়ান মো. লেলিন মিয়া জানান, ‘ছয় তলার এই বাড়িটিতে মোট ২০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। আর এসব ফ্ল্যাটের মালিক মোট ১৫ জন ব্যক্তি। তাদের অনেকেই সেখানে থাকেন না। তাই তাদের ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দেওয়া আছে। সম্পূর্ণ বিল্ডিংয়ে শুধু ফ্যামিলি বসবাস করে, এখানে কোনো ব্যাচেলর ভাড়া দেওয়া হয়নি।

ষষ্ঠ তলার ওই ফ্ল্যাটের মালিকের নাম জসীম উদ্দিন। তিনি প্রায় দু’বছর ধরে এখানে আসেন না। তার ফ্ল্যাটটি প্রায় তিন বছর আগে সেলিমের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। আর সেলিম প্রতি মাসে ভাড়ার টাকা পৌঁছে দিত। লেলিন মিয়া আরো জানান, সেলিমের ফ্ল্যাট ভাড়া ছিল ১২ হাজার টাকা। সব বিল মিলিয়ে মোট প্রায় ১৫ হাজার টাকা তার ফ্ল্যাটের ভাড়া আসত।

ওই ফ্ল্যাটের মধ্যে তিনটি বেড রুম, একটি ড্রইং রুম ও একটি ডাইনিং রুম রয়েছে। কিন্তু রহস্যের বিষয় হচ্ছে, এত বড় ফ্ল্যাটে তারা শুধু স্বামী-স্ত্রী বসবাস করতেন। আর সঙ্গে থাকত তাদের একটি কাজের মেয়ে। সেলিমের এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে। তারা ঢাকায় থাকে না। তাদের গ্রামে রেখে পড়াশোনা করান বলে জানিয়েছেন সেলিম।

তবে মাঝেমধ্যে তারা ঢাকায় এসে দু-চার দিন থেকে চলে যেত। লেলিন বলেন, ‘বাপ-মায়ে হয়তো ভাবছে, অবৈধ কাম করে, পুলিশের ঝামেলা হলে যেন ছেলে-মেয়েকে না জড়ানো হয়। আর ফ্যামিলি বাসার মধ্যে এতদিন ধরে এই কারখানা আছে, সেটা কেউই কোনোদিন টেরই পায় নাই। জালমুদ্রা তৈরিতে সেলিমকে সাহায্য করতেন স্ত্রী।

ওই বাসার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা জাহানারা বেগম নামের এক নারী জানান, সেলিমের স্ত্রী বাসা থেকে তেমন বের হতেন না। আর বের হলেও অন্য কারো সঙ্গে তেমন কথা বলতেন না তিনি। সব সময় বাসার মধ্যেই থাকতেন। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলেও উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যেতেন। এসব দেখেই অনেকে একটু অন্য রকমভাবে দেখত তাকে।

জাহানারা বলেন, ‘স্বামীর সঙ্গে বইসা সারা দিন জাল টাকা বানাইত, তাই তো বেশি কথাও কইত না। কারো সঙ্গে মিশতও না। ওই বাসার পঞ্চম তলার এক ভাড়াটিয়া নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, ‘এই বাসায় প্রায় পাঁচ বছর ধরে ভাড়া থাকি আমরা। তাই বাসাটির অন্যান্য ফ্ল্যাটের মহিলাদের বেশ ভালো করেই চিনি।

তবে সেলিমের স্ত্রীকে গত তিন বছরে মাত্র দুই-তিনবার দেখেছি। দরজার সামনে কাউকে দেখলে তিনি দরজা বন্ধ করে দিতেন। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো তিনি একটু বেশি অহংকারী, তাই এমন করেন। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি কেন তিনি ফ্ল্যাটে কাউকে ঢুকতেও দিতেন না বা কাউকে তার বাসাতে বেড়াতেও ডাকতেন না।যেভাবে কারখানার সন্ধান মিলল ও ৮ জন গ্রেফতার হলো: ভারতীয় জাল মুদ্রা তৈরির এই কারখানার সন্ধান পাওয়া এবং গ্রেফতার অভিযান সম্পর্কে র‍্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান  জানান, ভারতীয় জাল মুদ্রা তৈরি করে এই চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন থেকে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় তা বিক্রি করে আসছিল।

সম্প্রতি এই চক্রের মো. শাহিন, আবু সাইদ ও আল-আমিনকে সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরপর তাদের দেওয়া তথ্যমতে ঢাকা থেকে মো. সেলিম মিয়া, মো. বশীর ও খসরু নামের আরও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারা যায় যে, সেলিমের বাসায় রয়েছে তাদের জাল মুদ্রার কারখানা।

এরপরে গতকাল ৮ এপ্রিল বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ওই বাসায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় বাসার ভেতরে অবস্থান করা সেলিমে স্ত্রী ও কাজের মেয়েকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন মো. রমিছা বেগম ও মোছা রানু খাতুন। মুফতি মাহমুদ আরও জানান, তাদের সব ঘর তল্লাশি করে ৫২ লাখ জাল ভারতীয় রুপি ও পাঁচ লাখ টাকা পাওয়া যায়।

এ সময় মুদ্রা তৈরির সরঞ্জাম যেমন ল্যাপটপ, প্রিন্টার, আঠা, বোর্ড ইত্যাদি উদ্ধার করা হয়। নিখুঁতভাবে তৈরি হতো জাল মুদ্রা। ভারতীয় ৫০০ ও দুই হাজার নোটগুলো তারা এমন নিখুঁতভাবে তৈরি করত যে তা দেখে চিনতে পারেন না ভারতীয়রাও। তারা অনেক দামি কাগজ ও কালির ব্যবহার করত এই জাল মুদ্রা বানানোর কাজে।

আর রুপির ওপরে বসানো লেবেলটাও লাগাত নিখুঁতভাবে। তাই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় এই জাল মুদ্রাগুলো বিক্রি করা সহজ হতো তাদের। এ সম্পর্কে মুফতি মাহমুদ বলেন, ‘এই চক্র জাল মুদ্রা তৈরি করে দেশের, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের যেসব সীমান্ত এলাকা আছে, সেখানে বিক্রি করত। আর এ জন্য চক্রের সদস্যরা প্রতি এক লাখ রুপি দিয়ে পেত বাংলদেশি ১০-১৫ হাজার টাকা। তবে এই টাকা তারা অনেক সময় নগদে পেত। আবার অনেক সময় সীমান্ত এলাকার বাজারের নানা রকম পণ্যের মাধ্যমে টাকার মূল্য বিনিমিয় করা হতো।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *