অরণ্য ঘেরা সিলেটের খাদিমনগর উদ্যান

রোদেলা নীলা: গেল দু’বছরে কম করে হলেও দুবার জাফলং যাওয়া হয়েছে, কিন্তু ওই পথে খাদিমনগর নামক জায়গা আছে তা জানা ছিল না। এবার জাতীয় উদ্যান দেখার ইচ্ছে পোষন করতেই জেনে গেলাম জীববৈচিত্রে ভরপুর খাদিম নগর জাতীয় উদ্যানকে।

রাস্তা অনেকখানি ভালো হলেও বেশ অনেকটা যাবার পর লোকালয় শেষ হয়ে যায়, সেখান থেকে মাটির রাস্তা শুরু। সেখানেই সি এন জি আমাদের নামিয়ে দিল, দু’পাশে চা বাগান আর মাঝে মাটির সরু রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। দু পাশে কেবল বড় বড় গাছ আর প্রজাপতি উড়ে চলেছে। এতো ঘন বন আমি আগে দেখিনি, মনে হচ্ছে ভেতরে ঢুকলে হারিয়ে যাব, তাই বাইরে দাঁড়িয়েই বেশ কিছু ছবি নিলাম।

.বাংলাদেশের যে কয়টি সংরক্ষিত বনাঞ্চল আছে তার মধ্যে খাদিমনগর নবীনতম। ২০০৬সালে এটি জাতীয় উদ্যান বা ন্যাশনাল পার্কের মর্যাদা পায়। এর আয়তন প্রায় ৬৭৮ হেক্টর। তবে সর্বপ্রথম ১৯৫৭ সালে এই বনকে রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা করা হয়েছিল। জানা যায়, সেসময়ে বাঁশবন পরিষ্কার করে এখানে বনায়ন করা হয়েছিল। প্রায়-পাতাঝরা উষ্ণ মণ্ডলীয়চিরসবুজ এই বন দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ, লতাগুল্ম, পাখি আর বন্য প্রাণীদের অভয়াশ্রম।এ বনে বসবাসকারী বন্যপ্রাণীদের আছে ২৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৯ প্রজাতির উভচর, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ২৫ প্রজাতির পাখি। খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানের এসব স্তন্যপায়ী প্রাণীদের উল্লেখযোগ্য হলো মুখপোড়া হনুমান,বানর, বনবিড়াল, ভল্লুক, মায়া হরিণ, লজ্জাবতী বানর, বনরুই, খাটাশ, সজারু, সাদা বুক-কাঠবিড়ালি, খরগোশ, মালায়ান বৃহত্ কাঠবিড়ালি, বাদুর প্রভৃতি।

সরীসৃপের মধ্যে আছেবিভিন্ন জাতের সাপ, অজগর, গুইসাপ, উড়ুক্কু লিজার্ড, বেজি ইত্যাদি। এ ছাড়া নানান পাখ-পাখালির কলকাকলিতে সবসময় মুখরিত থাকে খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান। হলুদ পাহরিয়াল, পাকড়া ধনেশ, বড় র্যাকেট টেইল ফিঙ্গে, লালপিঠ ফুলঝুরি, বেগুনি মৌটুসি, মদনাটিয়া, কালা মথুরা, বাসন্তী লটকন টিয়া, মালয়ি নিশি বক ইত্যাদি।

বনের গাছগাছালির মধ্যেরয়েছে চাঁপালিশ, কদম, জলকড়ই, কড়ই, গর্জন, সিভেট, বাঁশ, মুলিবাঁশ, বুনো সুপারি, ট্রি-ফার্ন ইত্যাদি। সিলেট শহর ছেড়ে জাফলং তামাবিল সড়কের হাতের বাঁ দিকে গেলেই খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানে। চা বাগানের ভেতর দিয়ে চলতে চলতে জঙ্গলের ঘনত্ব দেখে ভই লেগেছে ,আমি আর বেশী দূর যাইনি।সিলেট শহর থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানের দূরত্ব মাত্র ১৫ কিলোমিটার। বাগানে বসে কিছু স্থানীয়দের সাথে কথা বলে দিনে দিনে ফিরে এলাম। প্রধান সড়কে উঠবার আগে হঠাৎ সিএনজি ড্রাইভার বললেন, “এখানে একটা রিসোর্ট আছে, দেখতে পারেন। আমার মাথাতেও আসেনি এমন একটি অরণ্য ঘেরা জায়গায় রিসোর্ট হতে পারে।

কারণ চারদিকে কেবল গাছ ছাড়া আমার চোখে আর কিছু পড়ছিল না। আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি ঘোরাতে বললাম। প্রধান গেইট দিয়ে যখন শুকতারা রিসোর্টে ঢুকছি, তখন মনে হচ্ছিল সবুজ গাছগুলো যেন আমাকে স্বাগত জানাচ্ছে। রিসোর্ট বলতে আমরা বুঝি কোনো একটা জায়গাকে ‘পলিশ’ করে মানুষের থাকার উপযোগী করা।

কিন্তু শুকতারা দেখে বুঝতে পারলাম এখানে কোনো গাছ কাটা হয়নি বা পাহাড়কে কেটে সমান করা হয়নি। বরং ওই পাহাড়কে ব্যবহার করেই দর্শনার্থিদের জন্য বানানো হয়েছে রিসোর্টটি। যাদের পাহাড় বাইতে সমস্যা তারা সহজেই টয় ট্রেন ব্যবহার করে উপরে উঠতে পারবেন। এক পাহাড়ে উঠলে অফিস, রেস্টুরেন্ট, খেলার জায়গা।

আর এক পাহাড়ে উঠলেই থাকার জায়গা। আহা, প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে এমন রিসোর্ট যিনি করেছেন তিনি নিশ্চই ভীষণ পরিবেশবান্ধব হবেন! তিনি যেমনই হোক তার আর্কিটেকচার পরিকল্পনা কিন্তু সাংঘাতিক মনকাড়া। লাইব্রেরিতে পা রেখেই মনে হয়েছে, যদি আজ সারাদিন শুয়ে-বসে পড়তে পারতাম! আবার রেস্টুরেন্টে বসে ভাবছিলাম আহ! কফির পর একটু সাদা ভাত হলে মন্দ হয় না। আর বিলিয়ার্ড খেলতে খেলতে হারিয়ে গিয়েছিলাম কিশোর বেলায়।শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল! শহরের এতো কাছে এমন প্রাকৃতিক শোভা রয়েছে তা সত্যিই ভাবা যায় না।আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে নিজেই ঘুরে আসুন, সিলেট-জাফলং মহাসড়কে ১৪ একর জায়গা নিয়ে বিস্তৃত এই প্রকৃতি নিবাসে। যারা সিলেট যাবেন অবশ্যই সুরমা নদী দেখে আসবেন। মেঘালয় থেকে বেয়ে আসা এই নদীর সাথে পাথরের যে নিবির আলাপ তা নিজ চোখে না শুনলে নয়।

সেই সাথে আছে শারি শারি চাবাগান যেন আকাশ ছুঁয়ে নুয়ে আছে ঘন সবুজ পাহাড়ের গায়ে। ঢাকার কমলাপুর ও ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন ৩টা ট্রেন ছাড়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে আর সময় লাগবে ৭-৮ ঘণ্টা। ট্রেনে গেলে রাত ৯.৫০টার উপবন এক্সপ্রেসে যাওয়াটাই সব চেয়ে ভালো। এছাড়া বাসেও যাওয়া যাবে। বাসে যেতে চাইলে অনেক বাস আছে।

এর মধ্যে শ্যামলি, হানিফ, সোহাগ, ইউনিক, গ্রীন লাইন উল্লেখযোগ্য। ভোর থেকে শুরু করে রাত ১২.৩০টা পর্যন্ত এসব বাস পাবেন। বাসে যেতে সময় লাগবে ৪ থেকে ৪ ঘন্টা ৩০ মিনিট। সিলেটে রয়েছে বিভিন্ন মানের হোটেল, মোটেল, কটেজ। চা বাগানের কাছে থাকতে চাইলে শহর থেকে ক্যাডেট কলেজের রাস্তায় রয়েছে পর্যটন মোটেল।

পরিবারের সবাইকে নিয়ে সিলেট ভ্রমণে আসলে ভ্রমণের আনন্দ আরও অনেকগুণ বেড়ে যাবে। ফাইভস্টার হোটেল রোজভিউ ছাড়াও রয়েছে হোটেল ডালাস, ফরচুন গার্ডেন, পর্যটন মোটেল, হোটেল অনুরাগ, হোটেল সুপ্রিম, হোটেল মেট্রো ইন্টারন্যাশনাল। এছাড়া সিলেটে আপনি আপনার প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী যে কোনো ধরনের হোটেল পাবেন।

এদের মধ্যে কয়েকটি পরিচিত হোটেল হল হোটেল হিল টাউন, গুলশান, দরগা গেইট, সুরমা, কায়কোবাদ ইত্যাদি। আসছে বর্ষা চা–বাগান দেখার উপযুক্ত সময় ।কাঠ ফাটা রোদ্রের তপ্ত জীবন ছেড়ে একটু প্রশান্তি নিতে চলে যেতে পারেন তিন দিনের ছুটি নিয়ে ।নৈসর্গিক সিলেট সুন্দরের ডালা সাজিয়ে আছে আপনার অপেক্ষায়।

1 reply

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *