সাংবাদিকতা গুপ্তচরবৃত্তি নয়, অপরাধও নয়

কামাল আহমেদ: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যে সংকুচিত হতে হতে একটি বৃত্তের মধ্যে আটকা পড়তে যাচ্ছে, এই আশঙ্কার কথা বেশ কয়েক বছর ধরেই উচ্চারিত হয়ে আসছে।

এখন মন্ত্রিসভায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া অনুমোদিত হওয়ার পর আবার নতুন করে এই আলোচনা শুরু হয়েছে। সাংবাদিকতা এবং লেখালেখির পেশায় যাঁরা আছেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় প্রধানত দুটো ধারা স্পষ্ট হয়েছে।

একটি হচ্ছে, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে এবং ক্ষমতাসীনদের ভাষ্যের বাইরে অন্য কিছু আর প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। যাঁরা এমনটি ভাবছেন, তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক এবং হতাশার ছাপটা স্পষ্ট।

দ্বিতীয় ধারাটি হচ্ছে, রাজনৈতিক আনুগত্যের এবং তাঁরা এখনো বিশ্বাস করেন, সরকার তাঁদের পরামর্শে কান দেবে এবং খসড়াটি শেষ পর্যন্ত বদলে আইনটি গণমাধ্যমবান্ধব হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার প্রভাব যে শুধু গণমাধ্যমের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের অনেকের দণ্ডিত হওয়ার ঘটনায় দেখেছি।

কিন্তু সরকারবিরোধী রাজনীতির দৈন্যদশা এবং নাগরিক সমাজের অগ্রসর অংশের মধ্যে দোদুল্যমানতা অথবা সুবিধাবাদিতার পিছুটানের কারণে কোনো কার্যকর প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। উদ্বেগ যতটুকু দেখা যাচ্ছে তা মূলত গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যেই। যাঁরা শঙ্কিত, তাঁদের আশঙ্কা-সাংবাদিকতা শেষ পর্যন্ত সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পুনর্লিখন এবং সম্পাদনাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

রাষ্ট্র, সমাজ, শিল্প-সাহিত্য, ধর্মীয় ভাবনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবনযাত্রা ইত্যাদি সবকিছুর ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষীয় ভাষ্য কিংবা প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের বিবরণও ক্ষমতাসীনদের বিবেচনায় ক্ষতিকর গণ্য হলে তা-ও প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। সোজা কথায় বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বা তথ্য অধিদপ্তরের ভাষ্য প্রকাশের বৃত্তের মধ্যেই গণমাধ্যম আবদ্ধ হয়ে পড়বে।

নতুন খসড়ার যেসব বিধান শঙ্কার কারণ হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি আইন বা আইসিটি অ্যাক্টের বহুল নিন্দিত ৫৭ ধারার নবরূপে আবির্ভাব। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আগের খসড়াটিতে ১৯ নম্বর ধারায় ৫৭ ধারার সব উপাদানই ধারণ করা হয়েছিল এবং গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তা নিয়ে বিপুল সমালোচনাও ওঠে। কিন্তু সেসব সমালোচনায় সরকারের যে কিছুই যায়-আসে না, এই পরিবর্তিত খসড়ায় তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।

মন্ত্রিসভায় পেশ করা সারসংক্ষেপে কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই বলা হয়েছে যে বিষয়টি একই সঙ্গে দণ্ডবিধির ধারা ৪৯৯ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন ২০০৬-এর ধারা ৫৭-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে ওই ধারা ৫৭-এর উপাদানগুলো বিবেচনাক্রমে পৃথক ৪টি ধারায় (ধারা ২৫,২৮, ২৯ ও ৩১) বিন্যস্ত করা হয়েছে।

অথচ আইনমন্ত্রী এবং তথ্যমন্ত্রীর গত বছরের বক্তব্য-বিবৃতিতে ধারণা তৈরি হয় যে সরকার ৫৭ ধারার কালো দিকগুলো স্বীকার করে নিয়ে তা বাতিলে সম্মত হয়েছে। আর দ্বিতীয় বিধানটি হচ্ছে ধারা ৩২, যাতে বলা হয়েছে ‘যদি কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার কোনো ধরনের অতিগোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে কম্পিউটার গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ।

স্পষ্টতই এই আইন হলে আমলা এবং ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ছাড়া অন্য যে কারও পক্ষেই সরকারি বা আধা সরকারি কোনো দপ্তরে ক্যামেরা, মোবাইল ফোন বা পেনড্রাইভের মতো ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার এখন বিপজ্জনক হয়ে পড়বে। এমনকি ওই দপ্তরের ই-মেইল বা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কাউকে কোনো তথ্য বা নথির কপি পাঠানোও গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

৩২ ধারা বহাল হলে ভেবে দেখুন তো সেই ‘গুনে গুনে ঘুষ’ খাওয়া সরকারি কর্মকর্তার অপকর্মের ছবি তুলতেও তাঁর অনুমতি চাইতে হতো এবং পরে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে জেলের ভাত খেতে হতো।

অতীব ক্ষমতাধর সাংসদের ফারমার্স ব্যাংকের অর্থ লোপাটের তথ্য, খুনের মামলার ভিআইপি আসামিদের হাসপাতালে বিলাসী জীবনযাপন কিংবা হল-মার্কের কেলেঙ্কারি, ক্রেস্টের স্বর্ণের ১২ আনাই মিছে, ভুয়া সনদে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সচিব হওয়ার কেলেঙ্কারির কোনো খবরই তাহলে আলোর মুখ দেখত কি না, সন্দেহ।

যেকোনো অপকীর্তি, অনিয়ম বা বিব্রতকর বিষয় গোপন রাখার তাগিদ অবশ্য আমলাদের চেয়ে রাজনীতিকদের কোনো অংশেই কম নয়। সম্ভবত সে কারণেই সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীও বলতে পেরেছেন যে ‘আপনারা গণমাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন, তাতে তাঁদের মান-ইজ্জত থাকে না। তাঁদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। তাঁরা তো জনপ্রতিনিধি।

এ আইনের বলে এখন হয়তো এমন পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে (ডিজিটাল গুপ্তচর শব্দ নিয়ে বিব্রত সরকার, বাংলা ট্রিবিউন, ৩০ জানুয়ারি ২০১৮)। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়্গ যে শুধু সাংবাদিকতার ওপর নামছে তা নয়, এটি পুরো সমাজেরই মুক্তচিন্তা এবং স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের পথে বাধার সৃষ্টি করবে। তবে সমাজের অন্যান্য অংশের চেয়ে সংবাদমাধ্যমের জন্য চ্যালেঞ্জটা একটু বেশিই।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যাঁরা বিশেষজ্ঞ, তাঁরা অবশ্য সব সময়ই সংকটকে সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। কথাটি অনেকের কাছে ধূর্ত শিকারির মতো সুযোগসন্ধানীর দৃষ্টিভঙ্গি বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আপনি যত বেশি বাধাবিপত্তি মোকাবিলায় সক্ষম হবেন, ততই আপনার যোগ্যতা প্রমাণিত হবে এবং আপনার প্রতি অন্যদের আস্থা বাড়বে।

সুতরাং প্রকৃত সাংবাদিকতার জন্য এটি এমন একটি সুযোগ, যার সদ্ব্যবহার করতে পারলে যোগ্যরা আরও আস্থা অর্জন করবে। সাংবাদিকদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করা বৈশ্বিক সংস্থা, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট, সিপিজে যাকে মুক্ত সাংবাদিকতার শত্রু হিসেবে অভিহিত করেছিল, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের নির্বাচন দেশটির মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ বয়ে এনেছে।

কেননা, ট্রাম্প প্রশাসন যেকোনো বিব্রতকর তথ্য প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তথ্য ফাঁসের উৎস খুঁজে বের করাকেই অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। তথ্য ফাঁসের তদন্ত এবং বিচার তাঁর কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বিব্রতকর তথ্যগুলো ততটা নয়। সেগুলোকে ভুয়া খবর বলে উড়িয়ে দেওয়ার অভ্যাসটা এখন তাঁর ভালোই রপ্ত হয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যম এখন সেটিকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে।

তারা প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন তথ্য ফাঁস করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে নিউইয়র্ক টাইমস এবং ওয়াশিংটন পোস্ট। শুধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসনের কাজ-কারবারের বিষয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য পত্রিকাটি আট কোটি ডলার বরাদ্দের কথা জানিয়েছিল। আর সেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সুফলও পত্রিকাটি পেতে শুরু করেছে, তার কমতে থাকা প্রচারসংখ্যা এখন আবারও বাড়ছে, আয় বৃদ্ধিও ঘটছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে অবশ্য মতপ্রকাশের যে অসীম স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেওয়া আছে, সে রকম কিছু আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠতা এবং জনস্বার্থের নিরিখে সাংবাদিকতা সাধারণত নির্বিঘ্ন এবং ঝুঁকিমুক্ত নয়। পেশাগত ঝুঁকি বা প্রফেশনাল হ্যাজার্ডের শিকার হয়ে বাংলাদেশে গত বছরেও প্রাণ দিতে হয়েছে সাংবাদিক আবদুল হাকিমকে, শারীরিক লাঞ্ছনা এবং মানহানির মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন কতজন, তার তালিকা দিতে গেলে এই নিবন্ধের আকার দ্বিগুণও হয়ে যেতে পারে।

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতিতে এখন সাধারণ নাগরিকেরাও সাংবাদিকতায় অবদান রাখতে সক্ষম। মোবাইল ফোনের ছবি, ভিডিও, ধারণকৃত কথোপকথন এখন হরহামেশাই সংবাদের বিষয় হয়ে উঠছে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় এখন নতুন করে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজন আইনগত লড়াই, নিরাপত্তা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য অর্থের সংস্থান ও প্রস্তুতি। কালাকানুনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এ পথটিতে ঝুঁকিটা একটু বেশিই, কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই। বস্তুনিষ্ঠতাই প্রমাণ করবে সাংবাদিকতা গুপ্তচরবৃত্তি নয়, অপরাধ তো নয়ই। কামাল আহমেদ, সাংবাদিক।

 

This website uses cookies.