কটনবাড ব্যবহারে কানে সংক্রমণ হতে পারে

ডা.সজল আশফাক: কটনবাডের কথা বললেই চোখে ভেসে ওঠে কান এবং পরম শান্তিতে নিবিষ্টভাবে কান চুলকানোর দৃশ্য। আগে কটনবাডের পরিবর্তে নানা ধরনের উপকরণ ব্যবহার হতো কানে।

কান পরিষ্কারের তাগিদ থেকেই সেগুলো ব্যবহার করা হতো। কটনবাডের আবিষ্কারের পেছনেও সে রকম একটা ঘটনা ছিল।

১৯২৩ সালে পোলিশ বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক লিও গ্রেসটেনজেন দেখলেন তাঁর স্ত্রী টুথপিকের মাথায় অল্প করে তুলো পেঁচিয়ে তা দিয়ে কান পরিষ্কার করতে গিয়ে পারছিলেন না।

এই দৃশ্য তাঁকে সঠিক মাপের কান পরিষ্কারের অবলম্বন হিসেবে কটনবাড তৈরিতে উৎসাহিত করে। ১৯২৬ সালে তিনি তাঁর নিজস্ব প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে কটনবাড তৈরি করে বাজারজাত করেন।

সেই কটনবাডের ব্র্যান্ড নাম দেওয়া হয় বেবি গাইস। পরবর্তী সময় তা ‘কিউ-টিপস’ নামে বাজারে ছাড়া হয়। নতুন ব্র্যান্ডের নামে ইংরেজি ‘কিউ’ অক্ষরটির মাধ্যমে ‘কোয়ালিটি’ বা মানসম্পন্ন এই বক্তব্যকে বোঝানো হয়েছে। প্রথম দিকে এটি শিশুদের কান পরিষ্কার করা এবং পরবর্তীকালে সকলের কান পরিষ্কারের কাজে সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

যদিও সারা বিশ্বে নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞরা কটনবাড ব্যবহারকে বিশেষভাবে নিরুৎসাহিত করছেন, তাতে এর ব্যবহার খুব একটা কমেনি। একমাত্র এটি ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট কানের সমস্যায় চূড়ান্তভাবে ভুক্তভোগীরা ছাড়া বাকিরা আগের মতোই কানে কটনবাড ব্যবহার করে চলেছেন। কটনবাডের ব্যবহার সমাজে এতটাই ব্যাপক যে অনেকে এটি ছাড়া দৈনন্দিন জীবন ভাবতে পারেন না।

যাঁরা কটনবাড ব্যবহার করেন, তাঁদের প্রায় সবাই পরম ভক্তিভরে কাজটি করে থাকেন। প্রথমত তাঁরা মনে করেন, কান পরিষ্কার করা স্বাস্থ্যকর্মেরই একটি অংশ। এটি করার মাধ্যমে তাঁরা নিজেকে স্বাস্থ্য সচেতন হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন। তাঁদের প্রায় সবাই মনে করেন, কান পরিষ্কার করার জন্য কটনবাড খুবই যথার্থ নিরাপদ, জীবাণুমুক্ত ও আধুনিক একটি উপকরণ।

একসময় যেখানে কান চুলকানোর জন্য মুরগির পালক (ক্ষেত্রবিশেষে পবিত্রতার বিবেচনায় কবুতরের পালক), চুলের ক্লিপ, পেন্সিলের মাথা, টুথপিক, পানের বোঁটা, কচুর ডগা ইত্যাদি যা কিছু হাতের কাছে পাওয়া যেত, তাই দিয়ে কান চুলকানো হতো, এখন সেখানে কটনবাডের ব্যবহার যেন বিজ্ঞানের আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এসব নানা কারণে কটনবাড খুবই সমাদৃত ও প্রয়োজনীয় একটি উপকরণ হিসেবে পরিগণিত।

অথচ এই কটনবাড কানে মলম দেওয়ার কাজ ছাড়া আর কোনো ভালো কাজে লাগে বলে মনে হয় না। বরং কটনবাড ব্যবহারে ক্ষতির পরিমাণই বেশি। কানের বিভিন্ন ধরনের অস্বস্তি সৃষ্টি ও ইনফেকশন হওয়ার পেছনে কটনবাডের ভূমিকা রয়েছে। যাঁরা নিয়মিত কটনবাড ব্যবহার করেন, তাঁদের কাছে কান সব সময়েই ভারী ভারী মনে হবে।

এ ছাড়া কান চুলকাবে, কানে ব্যথা করবে বা কান কামড়াচ্ছে ইত্যাদি অভিযোগ সারা বছরই থাকবে, যদি না কান চুলকানো বা কানে কটনবাড ব্যবহার বন্ধ করা হয়। যাঁরা কটনবাড ব্যবহারে অভ্যস্ত, তাঁদের সহজে সেটি ব্যবহার থেকে নিরস্ত করা যায় না। কারণ, কটনবাড ব্যবহারে বহির্কর্ণের ত্বক সামান্য পরিমাণে হলেও ছুলে যায়।

এতে কানে এক ধরনের উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, কান সব সময় সুড়সুড় করে ও চুলকায়। এ অবস্থায় কানে চুলকানির উদ্রেক হয়। তখন অনেকের পক্ষেই কান না চুলকিয়ে থাকা যায় না। এ কারণে একবার কটনবাড ব্যবহারকারী সহজে কটনবাড ব্যবহার ছাড়তে পারে না। এ ছাড়া কটনবাড ব্যবহারে কানে ছত্রাক বা ফাংগাস সংক্রমণ হয়ে থাকে।

কানে ফাংগাস হলে কান খুব চুলকায়, কান দিয়ে কষের মতো ঝরে, কান ব্যথা করে, কান আংশিক বন্ধ হয়ে থাকে। ফাংগাস সংক্রমণের ব্যাপকতা অনুযায়ী উপসর্গের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। কানে ফাংগাস সংক্রমণ তীব্র হয়ে বহির্কর্ণের পথকে প্রদাহযুক্ত করে ফেলে। এটি অত্যন্ত কষ্টকর একটি অবস্থা। এমনটি হলে কানে তীব্র ব্যথা হয়। কান স্পর্শ করলেই ব্যথা লাগে।

একমাত্র ভুক্তভোগীরাই সেই কষ্ট অনুভব করেছেন। কটনবাড ব্যবহারে কানের পর্দা ছিদ্র হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বহির্কর্ণের পথ আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। শিশুরা কটনবাডের ব্যবহার শেখে বড়দের ব্যবহার দেখে। সারা দুনিয়াজুড়ে নাক নাক ও গলা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কান পরিষ্কার করার দরকার নেই।

কাজেই কান পরিষ্কারের জন্য কটনবাড কেন, কোনো উপকরণই অনুমোদন করেন নাক কান গলা বিশেষজ্ঞরা। তাহলে কান কীভাবে পরিষ্কার থাকবে বা কান কীভাবে পরিষ্কার করব? এমন প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, কান নিজে থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়। খাবার গ্রহণ এবং কথা বলার সময় চোয়ালের নড়াচড়ায় বহির্কর্ণের কানের মধ্যকার ওয়াক্স বা খোল বাইরের দিকে আসতে থাকে এবং বেরিয়ে যায়।

কান পরিষ্কারের জন্য কটনবাড ব্যবহার করলে অধিকাংশ ময়লাই কানের ভেতরে চলে যায়। যেটুকু বেরিয়ে আসে, তা খুবই সামান্য। যে ময়লাটুকু কটনবাডের ধাক্কায় ভেতরে চলে যায়, তা আর নিজ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এই বিভিন্ন প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিয়ে সেই ময়লা বের করতে হয়। কটনবাড কান পরিষ্কারের যেন বাণিজ্যিকভাবে বাজারে এলেও এর প্রকৃত ব্যবহার লক্ষ করা যায় ল্যাবরেটরিতে ও কসমেটিকস ব্যবহারের জন্য।

কটনবাডের অন্য নাম কটন সোয়াব। কটন সোয়াবের কাঠিটি লম্বায় প্রায় ছয় ইঞ্চির মতো। এর কাঠিটি তৈরি করা হয় প্রাকৃতিক উপাদানের কোনো শলাকা থেকে। ল্যাবরেটরিতে কোনো কিছু কালচার করার কাজে, ডিএনএ টেস্ট করার জন্য লালার নমুনা সংগ্রহের কাজসহ বিভিন্ন ড্রেসিংয়েও এর ব্যবহার রয়েছে।

এইসব কাজে ব্যবহার করার জন্যই তাতে প্রাকৃতিক উপাদানের তৈরি শলাকা নেওয়া হয়। যাতে করে জীবাণুমুক্ত করার জন্য অটোক্লেভ মেশিনে দিলে সেটি গলে কিংবা নষ্ট হয়ে না যায়। এ কারণে ল্যাবের কাজে ব্যবহৃত ‘কটনবাড’ প্রকৃতপক্ষে কটন সোয়াব হিসেবেই পরিচিত। আর এদিকে অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত কটন বাডের ‘বাড’টি প্লাস্টিকের তৈরি।

এটি দিয়ে গোঁফে কলপ দেওয়া কিংবা মেকআপে বিভিন্ন প্রসাধনী লাগানোর কাজে এটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সময়ের পরীক্ষায় কটনবাডের এসব ব্যবহারই প্রকৃতপক্ষে গ্রহণযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এটি উদ্ভাবিত হয়েছিল, তার বিপরীতে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক যুক্তি রয়েছে। এখন বলা হচ্ছে, কানে কটনবাড ব্যবহার মানেই কানে রোগকে আমন্ত্রণ জানানোর শামিল। লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ।

 

This website uses cookies.