রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশনের নামে হান্নানের দুর্বৃত্তায়ন : কোটি কোটি টাকা লোপাট

কাইয়ুম উল্লাস : রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশন সিলেটের আলোচিত-সমালোচিত একটি প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু রাগীব-রাবেয়া ফাউন্ডেশনের রেজিস্ট্রেশন বা কোনো অনুমোদন নাই।

তবে, ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা রাগীব আলী কারান্তরীণ হওয়ার আগ পর্যন্ত এ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রাগীব আলী, রাগীব আলীর ছেলে, দৌহিত্র এবং বংশানুক্রমে পুরুষ সদস্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন।

কোনো সাজাপ্রাপ্ত ব্যাক্তি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান থাকতে পারবেন না। রাগীব আলী ও তার ছেলে জেলে থাকার কারণে কৌশলে তাদেরকে ফাউন্ডেশন থেকে বাদ দেয়া হয়। ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন রাগীব আলীর নিকট আত্মীয় আব্দুল হান্নান।

প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আব্দুল হান্নান চেয়ারম্যান হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। বৈধ চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে সাধারণত এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে সরকারের হস্তক্ষেপে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রয়েছে। রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশনের অধীনে অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লিডিং ইউনিভিার্সিটির অনারারি ট্রেজারারের পদটিও ইতোমধ্যে কুক্ষিগত করেছেন আব্দুল হান্নান।

এর আগে এই পদ অলংকৃত করেছিলেন রাগীব আলী নিজেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে অনারারি ট্রেজারারের কোনো পদ নেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেজারার নিয়োগ চ্যান্সেলরের অনুমোদন ছাড়া বেআইনি এবং অপরাধ। ১৯৯২ সালের (সংশোধিত ২০১০) সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৩৩ ধারার উপধারা (২) অনুযায়ী  চ্যান্সেলর (রাষ্ট্রপতি) ট্রেজারার পদে নিয়োগ দেবেন।

ট্রেজারার নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে বোর্ড অব ট্রাস্ট্রিজ রাষ্ট্রপতির কাছে ৩ জন ব্যাক্তির নাম প্রস্তাব করে সুপারিশ পাঠাবেন। বোর্ড অব ট্রাস্ট্রিজের সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর একজনকে ৪ বৎসরের জন্য নিয়োগ দেবেন। ট্রেজারার পদের জন্য মনোনীত কর্মকতাকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিসহ ১৫ বৎসরের অধ্যাপনা, প্রশাসনিক বা আর্থিক ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

এ ছাড়া ২৫ এর (১) উপধারা অনুযায়ী একটি অর্থ কমিটি থাকবে। কমিটির মেয়াদ হবে ৩ বৎসর। মূলত এই কমিটি আর্থিক সকল বিষয় তদারক করার কথা থাকলেও কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তথাকথিত অনারারি ট্রেজারার হিসেবে আব্দুল হান্নান ক্ষমতাসীন দলের কিছুসংখ্যক ঊর্ধ্বতন নেতার মদদে সকল ধরনের আর্থিক অপকর্ম করে যাচ্ছেন।

জানা গেছে, গত বছর রাগিব আলী দেশের বাইরে যাওয়ার সময় ভাতিজা আবদুল হান্নানকে রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশনের সাময়িক দায়িত্ব দেওয়া হয়। লিখিতপত্রে দেশে না ফেরা পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীকালে গত বছরের ২৪ নভেম্বর ভারত থেকে দেশে ফেরার পথে সীমান্ত এলাকায় পুলিশের হাতে আটক হন রাগীব আলী।

পরদিন আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। চা বাগানের দখল সংক্রান্ত মামলায় তার ১৪ বছরের কারাদন্ড হয়। কারাগারে থাকলেও নিয়ম অনুযায়ী রাগীব আলীই রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। তবে, রাগীব আলী কারাগারে থাকার সুযোগ নিয়ে আবদুল হান্নান ফাউন্ডেশনে স্থায়ী অবস্থান নেন।

একে একে লিডিং ইউনিভার্সিটি, রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাগীব রাবেয়া স্পোর্টস একাডেমি, রাগীব রাবেয়া নার্সিং ইনস্টিটিউট, সিলেটের ডাক পত্রিকাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বনে যান। শুধু কর্ণধারই নয়, লিডিং ইউনিভার্সিটির অনারারি ট্রেজারার পদ দখলে নেন। এ পদে থেকে তিনি আর্থিক সব হিসেব কুক্ষিগত করে নেন। কোনো ধরনের বৈধতা না থাকলেও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব থেকে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন।

সাউথ ইস্ট ব্যাংক লালদিঘিরপার প্রধান শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপকের যোগসাজশে শুধু লিডিং ইউনিভার্সিটির হিসাব থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। এরপর রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ নিয়ন্ত্রণ নিতেও অপতৎপরতা চালান আবদুল হান্নান। তার  মনোনীত একজন ব্যক্তিকে অধ্যক্ষ পদে জোর করে নিয়োগ দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়।

এ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয় কলেজের অভ্যন্তরে। শিক্ষক-ছাত্র-কর্মচারীদের প্রতিরোধের মুখে হান্নানের মনোনীত অধ্যক্ষ ফিরে যেতে বাধ্য হন। গত ১০ আগস্ট কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়  কর্নেল (অব.) গিয়াস উদ্দিনকে। কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশনের কথিত চেয়ারম্যান এই নিয়োগ প্রদান করেন।

কিন্তু কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শিক্ষক, ছাত্র-কর্মচারী সমন্বয়ে একটি সভার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কলেজে কর্মরত শিক্ষকদের বাইরে বহিরাগত কাউকে অধ্যক্ষ হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না। ছাত্র-শিক্ষকদের প্রতিরোধের মুখে আবদুল হান্নানের আস্থাভাজন অধ্যক্ষ ফিরে যেতে বাধ্য হন। গত ১৮ জুলাই ফাউন্ডেশন ও গভর্নিং বডির এক বৈঠকে অধ্যক্ষ সংক্রান্ত অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত হয়, পূর্বের অধ্যক্ষ আবদুল জলিলের স্থানে আপাতত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করবেন আবেদ হোসেন।

দু মাসের মধ্যে ফাউন্ডেশন তাকে স্থায়ী নিয়োগ দেবে। সে অনুসারে আবেদ হোসেন দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সাবেক অধ্যক্ষ আবদুল জলিল এ ব্যাপারে জালালাবাদ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এবং জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনারসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে আবদুল হান্নানের অবৈধ কার্যকলাপ খতিয়ে দেখার আবেদন করেন।

রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে আবদুল হান্নানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। লিডিং ইউনিভার্সিটির উপাচার্য কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ইউনিভিার্সিটির সার্বিক বিষয়ে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার আলী আক্কাসকে প্রধান করে ৩  সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।

রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশনের আওতাধীন বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার পাঁয়তারা চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্নীতি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন এবং রাগীব আলীর অনুপস্থিতিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তদারকি প্রয়োজন বলে সচেতন মহল মনে করেন। সূত্র : দৈনিক সবুজ সিলেট

This website uses cookies.