আধুনিকতার চোয়ায় মৃত্যুপথযাত্রী ডাক বিভাগ

45সলিম আহমদ সলু: হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের জনপ্রিয় এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ ডাক বিভাগটি। আধুনিকতা আর ডিজিটালে চোয়ায় প্রায় মৃত্যুপথযাত্রী এই বিভাগটি।

এই ডাক বিভাগটি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রানার নামটি শুনে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই প্রশ্ন করেন এটা কি? রানার নামটি অনেকে শুনছেন কিন্তু এর কাজ কি তা জানেন না।

কারন আজকাল তরুণ প্রজন্ম জানেই না ডাক বিভাগের কাজ কি ছিল? কেননা, তৃতীয় প্রজন্ম ইন্টারনেটের মাধ্যমে ই-মেইল, জি-মেইল ও ফেইসবুকের কল্যাণে চিঠি বা ছবি ও ফাইল আদান-প্রদান করে থাকেন।

ইদানিং মোবাইল থেকেও এমএমএস (ছবি আদান-প্রদানের মাধ্যম), এসএমএস (চিঠি বা বার্তা পাঠানোর মাধ্যম) করে দ্রুত সময়ের মধ্যে ডকুমেন্ট মুর্হুতে সারা পৃথিবীতে পাঠানো যাচ্ছে। হয়ত: সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন ‘ডাক পোস্ট নামে দেশে এক সময় চিঠি-বার্তা আদান- প্রদানের একটি মাধ্যম ছিল বলে ইতিহাসে লেখা থাকবে।

চিঠি আর ডাকঘর এখন কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে। বিভিন্ন কারণে মুখ থুবড়ে পড়া ডাক বিভাগকে গুনতে হচ্ছে লোকসানও। ১০-১৫ বছর আগেও ডাক বিভাগ ছিল সাজানো-গোছানো ছিমছাম। তার সেই সোনালি জীবন এখন কেবলই অতীত। একটা সময় ছিল, যখন ডাকঘরগুলোয় অনেককে ধরনা দিতে হতো।

আর এ প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রায় মৃত অবস্থায় রয়েছে। আগের মতো নেই এর জৌলুস। অথচ আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির দাপটের যুগেও পৃথিবীর বহু দেশে এখনো ডাকঘর নির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থাই প্রধান ভূমিকা পালন করে চলছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ডাকঘরকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাতেই অধিক আস্থা নাগরিকদের।

বাংলাদেশে সমস্যা ভারাক্রান্ত আর জনপ্রিয়তা হারানো ডাক বিভাগ এখন চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে চেষ্টা চালাচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। এক সময়ে চিঠির বোঝা কাঁধে বয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাতভর দৌড়ে মাঠ প্রান্তর পাড়ি দিয়ে তা গন্তব্যে পৌঁছে দিত রানার পদধারী ডাকঘর কর্মীরা।

যা দেশ বিভক্তের কিছু পূর্বে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হয়েছে ঠিক তখন থেকেই বন্ধ হয়ে যায় রানারদের পাঁয়ে হেটে চিঠির বোঝা পৌঁছে দেয়ার কার্যক্রম। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চিঠি ছিল গ্রামবাংলা এমনকি শহুরে জীবনের অংশ।

প্রতিদিনকার জীবনের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল ডাকঘর আর রানার। দূর-দূরান্ত থেকে কত শত আনন্দ বেদনার খবর যে বয়ে নিয়ে আসত চিঠি। প্রিয়জনের চিঠি, সন্তানের চিঠি, মা-বাবার চিঠি কত চিঠির জন্য কত অগণিত মানুষের নিত্য কাটত কত অগণিত অপেক্ষার প্রহর তার কোনো কূলকিনারা নেই।

চিঠির অপেক্ষার তর সইতে না পেরে কখনো কখনো মানুষ চলে যেত ডাকঘরে। দূর দেশে কর্মরত স্বামীর কাছ থেকে পাঠানো টাকা আর চিঠির খবর নিতে সময় হওয়ার আগেই ছেলেকে মা পাঠাতেন ডাকঘরে। চিঠিপত্র বা পন্য সামগ্রী দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌছাতে কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর সেবার সাথে পাল্লা দিয়ে ডাক বিভাগ পেরে না উঠায় এবং ডাক বিভাগের সেবার মান নির্মমুখী হওয়ায় অর্থাৎ চিঠি-পত্র আদান প্রদানে সময়ক্ষেপন হওয়ায় মানুষ ডাক বিভাগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।

তারা কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর উপর নির্ভর করতে শুরু করেন।  প্রযুক্তির ধারাক্রম এখন অজপাড়াগাঁয়েও গেছে। তাই এসএমএস, মেইল আর ফেসবুকে চ্যাটই প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। পরিবারের কেউ দেশের বাইরে কিংবা অন্য কোথাও অবস্থান করলে তার খোঁজ নেওয়া হতো চিঠির মাধ্যমে। তাকে বাড়ির ‘অবস্থা’ জানানোর একমাত্র মাধ্যম ছিল এই চিঠি। তখন মোবাইলের মতো দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না। জনপ্রিয় ছিল চিঠি।

ডাক বিভাগ সুত্র থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালেও দেশে ২৩ কোটি চিঠি লেনদেন হয়েছে। অথচ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সাধারণ চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে ৫ কোটি আর ২০১৪-১৫ সালে হয়েছে ৪ কোটি। এভাবেই প্রতিবছর ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার দিন দিন কমছে।

পুরনো দিনের চিঠি আজও প্রবীন ও মধ্য বয়সীদের জীবন অধ্যায়ের পাতা। একটা সময় ডাকপিয়নেরও কদর ছিল যথেষ্ট। বিশেষ করে প্রেমের চিঠি বিলি করার নানা মজার ঘটনা এখনো অনেকের স্মৃতিতে অমলিন। অনেক ডাকপিয়ন প্রণয়ঘটিত অনেক বিয়ের নীরব সাক্ষী।

পিঠে চিঠির বস্তা নিয়ে ঝুনঝুন ঘণ্টা বাজিয়ে রাতের আঁধারে রানার ছুটত দূরের পথে। এসবই আজ কালের স্বাক্ষী। তুলে নেওয়া হচ্ছে রাস্তার পোস্টবক্স: ডাক বিভাগের প্রতি এখন তেমন আগ্রহ নেই এই প্রজন্মের আধুনিক মানুষের। যতটুকু আছে শুধুই দাফতরিক।  কয়েকটি এলাকা  ঘুরে দেখা যায়, চিঠি রাখার বাক্সের চারপাশে আগাছার রাজত, কোন কোন জায়গায় গড়ে তুলা হয়েছে অবৈধ স্হাপনা।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৮৯৮ সালের ব্রিটিশ পোস্ট অফিস অ্যাক্ট আত্তীকরণ করে ডাক বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে ডাক বিভাগের মূল কাজ ছিল ব্যক্তিগত ও সরকারি চিঠিপত্র বিলিকরণ, পরিবহন ও গ্রহন। পরে যোগ হয় মানি অর্ডার কার্যক্রম। বাংলাদেশের ডাক বিভাগ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবেও এর খ্যাতি কম নয়। তবে সে নাম খ্যাতি এখন অনেকটাই ম্লান। জানা যায়, প্রবাসীদের অর্থ দেশে পৌঁছানো, মোবাইল ফোনে অর্থ স্থানান্তর, পাসপোর্টের আবেদনপত্র ও অর্থ জমা, সঞ্চয়ী হিসেবে অর্থ জমা রাখা, বাজারে প্রাইজবন্ড ছাড়া, অনুমিত আয়কর জমা, মোটরগাড়ি ও টেলিফোন বিল জমা, রাজস্ব স্ট্যাম্প বিক্রি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এসব সেবা চালু হলে কিছূটা হলেও প্রান ফিরে পাবে এই বিভাগটি। ডাক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ডাক বিভাগ থাকবে। ডাক বিভাগের সাথে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের জন্মের পরিচয়। প্রত্যেক নাগরিকের ঠিকানার সাথে জড়িয়ে আছে ডাক বিভাগের নাম। ডাক বিভাগকে বাঁচিয়ে রাখতে সেবামূলক কার্যক্রমের অনেক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত চিঠি হারিয়ে গেলেও বাণিজ্যিক চিঠিসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে গতিশীল করা হবে ডাক বিভাগ।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *