কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?

হাসান হামিদ: মহীশুরের সুলতান হায়দার আলী বেড়াতে বের হয়েছেন। হঠাৎ একটি বুড়ী এসে তাঁর পায়ে পড়ল এবং ফুঁসে কেঁদে উঠল। হায়দার আলী বুড়ীকে তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হয়েছে, মা?’ বুড়ী বলল, ‘আমাকে অসহায় পেয়ে জাহাঁপনার কোতওয়াল আগা মুহম্মদ আমার মেয়েকে অপহরণ করেছে।

হায়দর আলীর চক্ষু জ্বলে উঠল; তিনি বললেন, ‘আগা মুহম্মদ এখন তার দেশের বাড়ীতে, তবে কি তোমার মেয়েকে সেখানে নিয়ে গিয়েছে?’ বুড়ী বলল, ‘হুজুর, তাই’। হায়দার আলী তখনই প্রাসাদে ফিরে অনুসন্ধান শুরু করলেন। দেখলেন, অভিযোগ সত্য। তিনি হুকুম দিলেন, ‘জল্লাদ, এক্ষুণি আগা মুহম্মদকে দুইশ বেত মারবে; আর একদল সৈন্য গিয়ে মেয়েটাকে উদ্ধার করে আনবে’।

বেত মারা হল। সৈন্যদল ফিরে আসল; তাদের সঙ্গে বুড়ীর মেয়ে আর হাতে আগা মুহম্মদের মাথা। অপরাধীকে শাস্তি প্রদান করা প্রকৃত শাসকের কাজ । অপরাধ করলে সে যেই হোক না কেন, তাকে ক্ষমা করা যাবে না। ন্যায়-বিচার প্রকৃত শাসকের একটি মহৎ গুণ। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমার ফারুক (রা.) তার নিজ পুত্রকে মদ্যপানের অপরাধে শাস্তি প্রদান করেছিলেন; সেকথা আমরা সবাই জানি।

আবার তিনিই গরীবদের রাতের আধারে খাদ্য পৌঁছে দিতেন। আমাদের যারা বিচার বিভাগের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন, সকলের উচিত সবার প্রতি ন্যায় বিচার করা। আজকাল দেশব্যাপী যারা সহিংসতা চালাচ্ছে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় না করানোর মূল কারণ রাজনৈতিক। রাষ্ট্র চাইলে দ্রুত যে কোনো মামলার নিষ্পত্তি করতে পারে।

এর প্রমাণ হিসেবে বলব, সিলেটের শেখ সামিউল আলম রাজন ও খুলনার রাকিব হত্যা মামলার বিচারের প্রসঙ্গ। তবে রাজনৈতিক হত্যার বিচার এর ব্যতিক্রম। আবার জটিল হত্যা মামলায় এত দ্রুত বিচার করতে গেলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। সেটা ভিন্ন কথা।

কিন্তু যে হত্যাকাণ্ডের ছবি সারা দুনিয়ার মানুষ দেখেছে, খবরে পড়েছে, তাদের সর্বোচ্চ সাজা না দেওয়ার কারণ কী? আর এই যদি হয় বিচার বিভাগের অবস্থা, তাহলে অপরাধ বাড়বে হু হু করে। শুয়োয়ের বাচ্চার যখন দাঁত ওঠে তখন বাপের শরীরে কামড় দিয়ে ধার পরীক্ষা করে।

আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের যদি প্রশ্রয় দেয়া হয়, সেটার ভবিষ্যৎ মূল্য এ দলকেই দিতে হবে! আমরা না হয় এসব ভুলে যাবো। ভুলে যাবো যে বিশ্বজিৎ দাস নামে কেউ বিনা অপরাধে খুন হয়েছিলো। কিন্তু তার পরিবারের চোখের জল শুকাবে কোনোদিন?

পাঁচ বছর ধরে তারা কাঁদছেন। ন্যায়বিচার হয়তো তাদের সে শোকে কিছুটা হলেও প্রলেপ দিতে পারতো। কিন্তু হয়নি। হাইকোর্টের রায়ের পর হতাশ হয়েছে গোটা বাংলাদেশ। বিশ্বজিৎ দাস সামান্য একজন দর্জি দোকানের কর্মচারি ছিলেন। জীবিকার খোঁজে ঢাকায় আসা অতি সাধারণ ঘরের ছেলে।

রাজনীতির সাথে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু সেই বিশ্বজিতকেই জীবন দিতে হয়েছিল রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতায়। বিএনপি-জামায়াত জোটের অবরোধ কর্মসূচি চলার সময় ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে দিনে দুপুরে খুন হন বিশ্বজিৎ দাস।

অসংখ্য মানুষ আর ক্যামেরার সামনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা কুপিয়ে খুন করে বিশ্বজিতকে। শুরুতে সবার শঙ্কা ছিল, যেহেতু অভিযুক্তরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, তাই বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার বিচার হবে না।

২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর বিচারিক আদালত ২১ আসামীর মধ্যে ৮ জনের ফাঁসি এবং ১৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এ রায়ে তখন সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। কিন্তু হাইকোর্টের রায়ে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া ৮ জনের মধ্যে মাত্র ২ জনের দণ্ড বহাল আছে, ৪ জনকে ফাঁসি কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়া হয়েছে।

আর ২ জন পেয়েছে বেকসুর খালাস। শত শত মানুষ যা নিজের চোখে দেখলো, টেলিভিশনে দেশে-বিদেশের কোটি মানুষ যা দেখলো; আর আদালত দেখলো না। টেলিভিশন আর পত্রিকায় ছাপা ছবি দেখলে যে কেউ খুনীদের চিহ্নিত করতে পারবেন। কিন্তু আদালতের চোখ বাধা, তারা সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া বিচার করতে পারেন না।

পত্রিকা মারফত জেনেছি, রায়ের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেছেন, বিশ্বজিতের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে যে একটি গুরুতর আঘাতের কথা উল্লেখ আছে, এর সঙ্গে সাক্ষ্য, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ভিডিও ফুটেজ এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় আদালতের কাছে ওই প্রতিবেদন দুটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে।

আমরা সাধারণ জনগণ বুঝি না, নিম্ন আদালতের রায়ের সাথে উচ্চ আদালতের রায়ের এত ফারাক হলো কী করে? হাইকোর্টের রায়ের পরও অবশ্য সব শেষ হয়ে যায়নি। আপিল করার সুযোগ আছে। আইনের শাসন নিশ্চিত করার স্বার্থেই দোষীদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে হবে। খুন করার দৃশ্য আর যাদের ছবি সারা বাংলাদেশের মানুষ দেখেছেন; তারা যদি আইনের ফাঁক গলে ছাড় পেয়ে যায়; তাহলে আইন-আদালত সম্পর্কে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে।

বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাবে। আইনের শাসন বাস্তবায়ন করার স্বার্থেই ছাত্রলীগ হোক আর যেই হোক অপরাধীরা যেন সাজা পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।আমরা সেটার অপেক্ষায় থাকলাম, আমরা বিশ্বাস করি; ন্যায়বিচার হবে।

আর যদি এমন না হয়, তবে ভুলে যাবো সব। সাধারণ মানুষ সবসময় শান্তি চায়, বেদনা নয়। ভাজা মাছ উল্টে খেতে পারা স্বপ্নবান তরুণ ভুলে যাবে সমুদ্রের গল্প। কিন্তু যে ইতিহাস তাতে রচনা হবে, তার দায় কে নেবে?

(লেখক- গবেষক ও সদস্য, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র)

This website uses cookies.