সিলেটের দুই উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি : বাড়ছে পানিবাহিত রোগ

প্রথম সকাল ডটকম ডেস্ক: কুশিয়ারা নদীর পানি কমলেও বিয়ানীবাজার উপজেলার ৭ এবং ওসমানীনগর উপজেলার  ৮ ইউনিয়নে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার নতুন করে প্লাবিত হয়েছে বিয়ানীবাজার পৌরসভার অধিকাংশ এলাকাসহ ওসমানীনগরের কয়েকটি এলাকা।

বন্যা কবলিত এলাকার মানুষ আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। গবাদি পশুও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন কবলিত এলাকার বাসিন্দারা। বন্যা কবলিত এলাকায় বিভিন্ন ধরণের পানি বাহিত রোগে দেখা দিয়েছে।

এদিকে সিলেটের সাথে বিয়ানীবাজারের সরাসরি সড়ক যোগযোগ প্রায় বন্ধ রয়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানি বিয়ানীবাজারের শেওলার দুই পয়েন্ট কমে বিপদ সীমার ২১ পয়েন্টের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট-বিয়ানীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কের আরও বেশ কিছু অংশ তলিয়ে গেছে।

তলিয়ে গেছে সিলেটের সাথে যোগাযোগের বিকল্প সড়ক বিয়ানীবাজার-চন্দরপুর সড়কের আশি ভাগ অংশ। শুক্রবার বিয়ানীবাজার উপজেলার ৭ ইউনিয়ন ও পৌরসভা পরিদর্শন করেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান খান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মু: আসাদুজ্জামান ও পৌর মেয়র আব্দুস শুকুর।

সরেজমিন বন্যা কবলিত এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দুবাগ, শেওলা, কুড়ারবাজার, মাথিউরা, তিলপাড়া, লাউতা, মুড়িয়া ও বিয়ানীবাজার পৌরসভার ৮০ ভাগ এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এসব ইউনিয়নের রাস্তা-ঘাট তলিয়ে গেছে। বাসা-বাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করা মানুষজন আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। গবাদি পশুগুলো উচু স্থানসহ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে নিয়ে রাখা হচ্ছে।

খাড়াভরা এলাকার বন্যা কবলিত শফিক উদ্দিন বলেন, নদীর পানি তোড়ের ঘর ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রতিবেশির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। বন্যায় ৭ ইউনিয়ন ও পৌররসভার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন দুবাগ, শেওলা, লাউতা ও তিলপাড়া ইউনিয়নের অধিবাসীরা। এদিকে গত বৃহস্পতিবার থেকে সিলেট-বিয়ানীবাজার আঞ্চলিক মহসড়কের যান চলাচল প্রায় বন্ধ ছিল।

দূরপাল্লার বাস ও মাল বোঝাই ট্রাক সীমিত আকারে চলাচল করেছে। সড়কের বেশ কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অটোরিক্সা, মাইক্রো চলাচল করেনি। এতে দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ যাত্রি। সড়কের ডুবে যাওয়া অংশ মানুষজন টেক্ট্রর ও পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে দেখা গেছে। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান খান বলেন, বন্যার পরিস্থিতি দু-একদিনের মধ্যে উন্নতি হবে বলে আমাদের আশা।

এরই মধ্যে নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, সরকারি ত্রাণ সামগ্রি আজকের মধ্যে পৌছে যাবে। আমরা চেষ্টা করবো দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতি গ্রস্থ পরিবারের মধ্যে এসব ত্রাণ পৌছে দেয়ার। তিনি সকলের সহযোগিতায় কামনা করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মু: আসাদুজ্জামান বলেন, বন্যা কবলিত এলাকার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে সাড়ে ১৪ টন ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শীঘ্রই  বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রাসনের কাছে এ ত্রাণ এসে পৌছাবে। পরে বিয়ানীবাজার বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হবে।  এদিকে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়ে গিয়ে ও নদীর ডাইক ভেঙে ওসমানীনগর উপজেলায় কুশিয়ারা তীরবর্তী সাদীপুর, পশ্চিম পৈলনপুর, বুরুঙ্গা, উমরপুর ও উছমানপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা এবং গোয়ালাবাজার, তাজপুর ও দয়ামীর ইউনিয়নের কিছু এলাকা বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে।

পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বন্যা কবলিত এলাকার লক্ষাধিক মানুষ। বন্যা দুর্গত এলাকায় সার্বক্ষনিক মনিটরিং রাখতে ওসমানীনগর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ইউএনও’র কার্যালয়ে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। বন্যা পরিস্থিতি বর্যবেক্ষণে রাখতে কন্ট্রোল রুমের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সিএ রেজাউল আলমকে।

এর সাথে সাথে দুর্গত এলাকা থেকে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ ও বিভিন্ন তথ্য প্রদানের জন্য সর্বসাধারণের জন্য একটি জরুরী মোবাইল নম্বর (০১৯২৯৩৩৬৬২৯) রাখা হয়েছে। উক্ত মোবাইল নম্বরে অথবা ইউএনও মো. মনিরুজ্জামানের সরকারি মোবাইল নম্বরে ফোন করে বন্যা দুর্গত এলাকার যে কোনো তথ্য সরবরাহ সহ শনিবার (১ জুলাই) জনপ্রতিনিধিদের রিপোর্ট করার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বন্যা দূর্গত মানুষের মাঝে উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে উপজেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ৪ হাজার পরিবারকে ৩ মাস ৮ দিনের জন্য প্রতিমাসে ৩০ কেজি চাল ও নগদ ৫০০ টাকা করে বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে উপজেলার প্রায় ২ হাজার পরিবারকে ঈদের ভিজিএফ কার্ড বিতরণ করা হয়।

৬শ’ বন্যার্ত পরিবারের মধ্যে ঈদের আগে ভিজিএফ (ত্রাণ) বিতরণ করা হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার ৩শ’ পরিবারকে ৫ হাজার টাকা করে মোট ১৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। উপজেলার শতাধিক দুস্থদের মাঝে জনপ্রতি নগদ ১ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান, ঈদের আগের দিন ২০০ পরিবারকে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ঈদ উপলক্ষে ত্রাণ (সেমাই, চিনি, দুধ, তেল ও চাল) সহায়তা প্রদান করা হয়।

সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে গত ২৯ জুন ওসমানীনগর উপজেলায় বন্যার্তদের জন্য আরো ৮ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৩৬ হাজার টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে, যা জরুরী ভিত্তিতে বিতরণ করা হবে। ওসমানীনগরে বন্যা কবলিত এলাকাসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ডায়রিয়া, পানিবাহিত চর্ম রোগ, সর্দি-কাশি ও ভাইরাস জাতীয় জ্বরের প্রকোপ দেখা দিয়েছে।

এসব রোগে শিশু ও বৃদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ আক্রান্ত হয়েছেন। রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিদিন সরকারি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো ও প্রাইভেট চিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসা নিতে রোগীরা ভিড় করছেন। উপজেলার বন্যা কবলিত এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, উপজেলার শতভাগ বন্যা কবলিত সাদীপুর ইউপি সহ বন্যা কবলিত ইউপিগুলোতে বেশিরভাগ গভীর নলকুপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে বন্যার পানি পান করে শিশু ও বৃদ্ধ সহ অনেকেই ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়েছেন।

সাদীপুর ইউপির লামা তাজপুর গ্রামের আজির উদ্দিনের শিশু পুত্র তোফায়েল আহমদ (৩), গজিয়া গ্রামের আরশাদ আলীর শিশু পুত্র সাফুয়ান (২), খসরুপুর গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে তানবির (৫), সম্মানপুর গ্রামের তছন মিয়া (৩৫), সুন্দিকলা গ্রামের দিলওয়ার মিয়া (২৭) এবং গজিয়া গ্রামের আলী হোসেন রানার ছেলে ইয়ামিন (৩) ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়।

এদের মধ্যে ইয়ামিনকে তাজপুরের একটি ক্লিনিকে দুইদিন ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এদিকে সাদীপুর ইউপির অন্যান্য গ্রামসহ বন্যা কবলিত বুরুঙ্গা, পশ্চিম পৈলনপুর, উমরপুর, গোয়ালাবাজার, তাজপুর. উছমানপুর ও দয়ামীর ইউপির বন্যা কবলিত মানুষের মধ্যে ভাইরাস জ্বর, সর্দি-কাশি, চর্ম রোগ সহ বিভিন্ন ধরণের ভাইরাস রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে।

সাদীপুর ইউপির গজিয়া গ্রামের বাসিন্দা আলী হোসেন রানা বলেন, বন্যার কারণে বাড়ি-ঘর ও নলকূপ পানিতে ডুবে যাওয়ায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়ে গেছে। আমার ছেলেও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ছিল। তাকে দু’দিন হাসপাতালে রাখতে হয়েছে। বুরুঙ্গা সরকারি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সহকারি চিকিৎসক সাফায়াত হোসেন বলেন, বন্যার পর থেকে ভাইরাস জ্বর, সর্দি-কাশি ও চর্ম রোগ নিয়ে প্রতিদিন অনেকেই আসছেন চিকিৎসা কেন্দ্রে।

গোয়ালাবাজারের চিকিৎসক ইকবাল মাসুদ বলেন, প্রতিদিন আমি যত রোগী দেখি, এর মধ্যে তিন ভাগের এক ভাগই ডায়রিয়া, সর্দি, কাশি, জ্বরসহ বিভিন্ন ভাইরাস রোগে আক্রান্ত। দিন দিন এর তীব্রতা বাড়ছে। ওসমানীনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বন্যা কবলিত এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিভিন্ন ইউপি থেকে মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাচ্ছি।

আমাদের উপজেলা হাসপাতাল না থাকায় চিকিৎসা দিতে সমস্যা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বন্যা কবলিত অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা প্রদানে টিম গঠন করতে বালাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়েছি। ওসমানীনগরের উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে সক্রিয় রাখা হয়েছে।

বন্যা দুর্গত এলাকার ব্যাপারে সার্বক্ষনিক খোঁজ-খবর রাখতে গত বৃহস্পতিবার থেকে আমার কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি। যে কোনো মারাত্মক পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *