হাওরবাসী আসলে কেমন আছে?

হাসান হামিদ: আমরা হয় রোমান্টিক, না হয় ফ্যান্টাস্টিক। ঝড়-বাদলে আমাদের মন তা তা থই থই করে নেচে ওঠে। বন্যার অপার জলরাশির ফটোগ্রাফিক বিউটি মাত করে রাখে আমাদের। কলকাতার কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় গুজরাটের বন্যা নিয়ে লিখেছিলেন, ‘ইন্দিরা, তখন সেই বন্যার দৃশ্য দেখেও একদিন তোমার মুখ ফস্কে বেরিয়ে যেতে পারে, বাঃ, কী সুন্দর!

(ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) যে লাখো কৃষক আসাম ও মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা হঠাৎ-ঢলের মুখে মুখ ব্যাদান করে আল্লাহ-ভগবান ডাকছেন, তাঁদের আমাদের সুন্দর লাগার কথা নয়।

যাঁরা তিতুমীরের মতো পানিতে বাঁশের কেল্লা বানিয়ে লড়ছেন, তাঁদের নেংটি-পরা কালোকেষ্ট মূর্তি আমাদের ভালো লাগার কথা নয়। চোখের সামনে ঢেউ খেলানো ফসলের মাঠে সাপের ফণার মতো বেনো জল দেখে যাঁদের বুক-চোখ শুকিয়ে যায়, তাঁরা অসংস্কৃত।

চাষার ভূষা বা পোশাকও তো সুন্দর নয়। আমাদের সংস্কৃতি থেকে তাঁরা বাদ, আমাদের আনন্দ ও মঙ্গল থেকে তাঁরা বাদ। তাঁদের জন্য প্রকৃতির লাণত আর আমাদের জন্য অফুরান উৎসব। আহ! বাণিজ্য মন্ত্রী যাই বলুন; এবারে বাজারে সবকিছুর দাম চড়া। কিন্তু হাওরে বাঁধ ভাঙার জন্য দায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু দুর্নীতিপ্রাণ কর্মকর্তা এবং তাঁদের সহযোগী ঠিকাদারদের অসুবিধা হবে না।

অসুবিধা হবে না স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের। সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ২০ শতাংশ ঘুষ দিয়ে সময়মতো বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজ শেষ করা হয়নি। যে কাজে ২০ শতাংশ ঘুষ দিতে হয়, সেখানে ঠিকাদারের দুর্নীতি কত শতাংশ হবে, তা অনুমান করা কঠিন না। গত বছরও ফসল মার গিয়েছিল নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ বিশাল হাওরাঞ্চলে।

এবার তাই কৃষকেরা আগাম দাবি জানিয়ে আসছিলেন, সময়মতো বাঁধের কাজ যেন শেষ করা হয়। যেন বাঁধ নির্মাণে ফাঁকি ও দুর্নীতি না হয়। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতির উন্নয়ন সে কথা শোনেনি। কাজ শেষ হয়নি, বিপুল দুর্নীতি হয়েছে এবং ঢলের মুখে সেই বাঁধ ভেসে গেছে। সেখানে ফসল একটাই হয়, যাকে বলে বোরো ধান। বাকি সময় এলাকাটা ডুবে থাকে নিচে।

সবেধন নীলমণি বোরো মার গেলে কৃষকের আর কিচ্ছু করার থাকে না। বৈশাখে যেভাবে বোনাস দেওয়া হবে সরকারি কর্মচারীদের, সেভাবেই বাম্পার ফলনের জন্য কৃষকদের কোনোবার কি বোনাস দেওয়া হয়? বোনাস বাদ, সরকারি অবহেলায় বাঁধ ভেঙে যাঁদের সর্বনাশ হয়, তাঁরা কি ক্ষতিপূরণের যোগ্য নন? কৃষকের দেশে এমন কৃষকবিরোধী সিস্টেম কে বানাল?

পূরবী তালুকদার লিখছেন, ‘গত বছরও আমাদের ধান চলে গেছে নয়নভাগায়। পাকা ধান যখন পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে তখন তার আর মালিক থাকে না। যে যতটুকু কেটে নিতে পারে সে ধান তার হয়ে যায়। তবে এবার আর নয়নভাগা হয়নি, কারণ ধান যে এখনো কাঁচা। এর একটি ধানও কাটার বা কাজে লাগানোর কোনো উপায় ছিলো না।

বছরের পর বছর ধান তুলতে না পেরে হাওড়ের কৃষকরা চরম বিপর্যস্ত। এই তালিকায় আমার কৃষক বাবাও রয়েছেন। …হতাশা আর চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে প্রতিটি পরিবারের। চালের আড়তগুলোতে ভিড় বাড়ছে, দাম বাড়ার কারণে অনেকে ভাত খাওয়ার চালটুকুও কিনতে পারছে না। সবার একই অবস্থা। আগমনী আর বিদায় আজ মিলেমিশে একাকার, নিজেরা কী খাবেন, আর গোয়ালের গরুগুলোই বা সারাটা বছর কী খাবে? এতোটুকু খড়ওতো নেই।

অনেক পরিবার যার যা আছে তাই নিয়ে শহরে আসার পরিকল্পনা করছে। একটাই কথা, গার্মেন্টসে কাজ করবে, কম হোক আর বেশি হোক, মজুরি পাক বা না পাক চোখের সামনে অন্তত এমন দৃশ্য আর দেখতে হবে না। কোনো কোনো পরিবার পাড়ি জমাচ্ছে সুনামগঞ্জ-ছাতক-চুনারুঘাটে পাথর ভাঙবে বলে। খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেছেন খাদ্যাভাবে না খেয়ে থাকা) হতে পারে, এ কথা তিনি  বিশ্বাস করেন না।

কারণ সরকার সেখানে পর্যাপ্ত ত্রাণ দিচ্ছে। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতা বলছে, হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন। পরিবারে নেমেছে বিষাদের ছায়া। ধান বিক্রির টাকায় চাষাবাদের ঋণ, সারা বছর পরিবারের ব্যয়ভার বহন এখন তাদের পক্ষে দুষ্কর। নিজ এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় কাজের সন্ধানে আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও রাজধানীতে ছুটছেন এলাকার বেশিরভাগ মানুষ।

স্থানীয় খোলাবাজারে বিক্রি হওয়া ওএমএসের চাল নিতে অভাবী মানুষের দীর্ঘ সারি। অনেকেই তিন বেলার পরিবর্তে দুবেলা খাচ্ছেন। কারো কারো ঘরে আবার চাল না থাকায় ভাতের পরিবর্তে শুধু রুটি খাচ্ছেন। এমন চিত্রই উঠে এসেছে হাওরকেন্দ্রিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর জোট হাওর অ্যাডভোকেসি প্লাটফর্মের (হ্যাপ) সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদনে।

হ্যাপের প্রতিবেদনে বলা হয়, উপদ্রুত এলাকার শিশুরা পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না। কিশোরী ও গর্ভবতী নারীদের ভাগ্যেও জুটছে না কোনো পুষ্টিকর খাবার। শুধু তা-ই নয়, খাদ্যাভাবে ওইসব এলাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় কমে গেছে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় উপস্থিতির হার কমেছে ছেলেদের।

তাই বিদ্যালয়গুলোয় দুপুরের খাবার সরবরাহের দাবি ওই এলাকার মানুষের। কারণ তারা চান না তাদের ছেলেমেয়েরা পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়ছে। আমি বিশেষজ্ঞ নই। তবে হাওরের সমস্যার নিশ্চয় সমাধান পাওয়া যাবে। পাহাড়ি ঢলে পানি ধুনো নদীতে পড়লে সেটার মোড় ঘুড়িয়ে মেঘনায় ফিরিয়ে দিলে মনে হয় হাওর এলাকা আর ডুববে না।

আড়াই-তিন কোটি মানুষের জন্য খুব দ্রুত এই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে কেয়ার ও কনসার্ন নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গ্রামগুলোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের কাছে দাবি হচ্ছে, আইন থাকুক বা না থাকুক এলাকাটিকে দুর্গত হিসেবে ঘোষণা করা, কৃষিঋণসহ সবকিছু দেওয়া। আর যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় সেগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জনপ্রতিনিধিদের সুনজরে রেখে পরিকল্পিত বাস্তবায়ন করা উচিত।

কারণ এর পরের বন্যায়ও এমন ক্ষতি হলে হাওরবাসীর পক্ষে মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে। আমি হাওরের মানুষ। আমার কথা হচ্ছে হোয়াংহো নদী এক সময় ছিল চীনের দুঃখ। সেটাকে নিয়ন্ত্রণে এনে আশীর্বাদে পরিণত করা হয়েছে।

সেই সূত্র ধরে বলতে হয়, হাওরের পানি, মৎস্যসম্পদ এবং ফসল যে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারও সমাধান আছে। আমাদের হাওর সারা দেশের এক-তৃতীয়াংশ ধান, মিঠাপানির মাছের প্রায় অর্ধেক অংশ জোগান দেয়। তাই হাওরবাসীর দুঃখের সমাধান জাতীয় প্রয়োজনেই করতে হবে। (লেখক- গবেষক ও কবি)।

This website uses cookies.