চাঁদ দেখে রোজা শুরু ও শেষ করার বিধান

প্রথম সকাল ডটকম ডেস্ক: শাবান মাসের ঊনত্রিশ তারিখের সন্ধ্যাবেলায় রমজানের চাঁদ তালাশ করা মুসলমানগণের উপর ওয়াজিব। যদি চাঁদ দেখা যায় তবে পরবর্তী দিন রোজা রাখবে। আকশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে যদি চাঁদ দেখা না যায়, তবে শাবান মাসকে ত্রিশদিন গণনা করবে বা পূর্ণ করবে। (ফতওয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খন্ড)।

এ ব্যাপারে বুখারী ও মুসলিম শরীফে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, চাঁদ দেখে রোজা রাখবে এবং চাঁদ দেখে রোজা শেষ করবে।

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় যদি চাঁদ তোমাদের দৃষ্টিগোচর না হয় তবে শাবান মাসকে ত্রিশদিন পূর্ণ করবে। (মারাকিল ফালহ, পৃষ্ঠা- ৫৫)।

এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (রমজানের) চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোজা রাখবে না এবং (শাওয়ালের) চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোজা রাখা বন্ধ করবে না। (সহিহ মুসলিম ১/৩৪৭) । অন্য হাদিসে আছে, (শাবানের ২৯ দিন পূর্ণ করার পর) তোমরা যদি রমজানের চাঁদ না দেখ তাহলে শাবান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করবে।

(মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, হাদিস নং ৭৩০১)। চাঁদ না দেখা গেলে এ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জ্যোতির্বিদের গণনাভিত্তিক অভিমত গৃহীত হবে না। এটি বিশুদ্ধতম সিদ্ধান্ত। (মারাকিল ফালহ, পৃষ্ঠা-৫৬১)। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন বা কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলে রমজানের চাঁদ দেখার ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য এক ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। তবে শর্ত হলো, সাক্ষ্যদানকারী যেন সত্যবাদী, ধর্মভীরু ও প্রাপ্তব্যয়স্ক মুসলমান হয়।

যদিও বা সে নারী হোক কিংবা পুরুষ হোক। (মারাকিল ফালহ, পৃষ্ঠা- ৫৫)। এক ব্যক্তির সাক্ষ্যের উপর অন্য এক ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদান করলে তার সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য হবে। তারা উভয়ে পুরুষ হোক কিংবা নারী।

(ফতওয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-১৯৯-২০২)। রমজানের চাঁদ দেখার সাক্ষ্য প্রদানকালে শাহাদাত (সাক্ষ্যদান) শব্দটির উচ্চারণ শর্ত নয়। অনুরূপভাবে চাঁদ দেখার দাবি করা এবং এ ব্যাপারে কাজির হুকুম প্রদান করাও শর্ত নয়। যে ব্যক্তি চাঁদ দেখেছে তার নিকট চাঁদ দেখার ব্যাখ্যা তলব করার প্রয়োজন নেই। একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি যখন রমজানের চাঁদ দেখবে তখন তার উপর জরুরি হবে এ রাতেই চাঁদ দেখার সাক্ষ্য প্রদান করা।

সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। (কাযীখান, হাশিয়ায়ে আমগীরী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২০৫)। যদি গ্রামাঞ্চলে কোনো নির্ভরযোগ্য লোক চাঁদ দেখে তবে গ্রামের মসজিদে সে চাঁদ দেখার সাক্ষ্য প্রদান করবে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের উপর তার কথা মতো রোজা রাখা ওয়াজিব। কোনো ব্যক্তি একা রমজানের চাঁদ দেকে সাক্ষ্য প্রদান করলে, তার সাক্ষ্য যদি গৃহীত না হয় তবুও তার উপর রোজা রাখা ওয়াজিব হবে। কাফফারা ওয়াজিব হবে না।

চাঁদ দেখার পর যার সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যাত হয়েছে সে লোকটির ত্রিশটি রোজা পূর্ণ হয়ে গেলেও যদি শাওয়ালের চাঁদ দেখা না যায় তবে সে একা রোজা রাখা পরিহার করবে না। বরং সকলের সাথে রোজা রাখবে ও ঈদ করবে। আকাশ যদি পরিষ্কার থাকে, তবে চাঁদ দেখার ব্যাপারে এমন সংখ্যক লোকের সাক্ষ্য প্রদান আবশ্যক হবে যাদের সংবাদের সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত ধরণা লাভ করা যায়।

তাদের সংখ্যা কত হবে এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। (বেহেশতি জেওর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২)। এই হুকুম রমজান, শাওয়াল ও জিলহজ্জের চাঁদের ব্যাপারেও প্রযোজ্য হবে। শাওয়ালের চাঁদ রমযানের উনত্রিশতম দিনের সন্ধ্যায় তালাশ করবে। শাওয়ালের চাঁদ দেখার সময় যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয় কিংবা কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে তবে চাঁদ দেখার ব্যাপারে দুইজন নির্ভরযোগ্য পুরুষ অথবা একজন পুরুষ এবং দুইজন নারীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা যাবে। সাক্ষীদানের সময় ‘শাহাদত’ শব্দের উচ্চারণ করা শর্ত।

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকা অবস্থায় যদি এমন একটি গ্রামে দুইজন লোক শাওয়ালের চাঁদ দেখার সংবাদ দেয়, যেখানে কোনো শাসন এবং কাজী নেই, তবে সেখানকার লোকজনের রোজা রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে। আর আকাশ যদি পরিষ্কার থাকে তবে দু‘চারজনের সাক্ষ্যে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হবে না। অবশ্য যদি এত বেশি লোক চাঁদ দেখার প্রমাণ দেয় যে, যাদের সাক্ষ্য সত্য বলে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে তবে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হবে।

ঈদুল আজাহার চাঁদের হুকুম ঈদুল ফিতরের চাঁদের অনুরূপ। অন্যান্য চাঁদের ব্যাপারেও হুকুম অনুরূপ। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকা অবস্থায় যদি দুইজন লোক রমজানের চাঁদ দেখার সাক্ষী  প্রদান করে, আর কাজি বা প্রশাসক তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ত্রিশটি রোজা রাখার পরও যদি শাওয়ালের চাঁদ দেখা না যায় তবে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকুক অথবা পরিষ্কার থাকুক, সহিহ মতে উভয় অবস্থাতেই রোজা রাখা বন্দ করবে।

(ফতওয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-২০৭)। চাঁদের উদয়স্থলের বিভিন্নতার কোনো মূল্য নেই। সুতারং এক অঞ্চলের লোকজন যদি রমজানের চাঁদ দেখে, তাহলে অন্য অঞ্চলের অধিবাসীদের উপর রোজা রাখা সম্পর্কে ফয়সালা এই যে, যদি তা গ্রহণ করার ফলে মাসে ২৮ বা ৩১ দিনের হয়ে যায় তবে তা গ্রহণ করা যাবে না।

যে সকল স্থানে চাঁদ একদিনে উদিত হওয়া সম্ভব সেখানে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সে এলাকার সব লোকের তা অনুসরণ করতে হবে, তবে এমন দূরাঞ্চলের বাসিন্দাদের উপর তা প্রযোজ্য হবে না সেখানে সেদিন চাঁদ দেখা বাস্তবিকপক্ষে সম্ভব নয়। (ফতওয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২০৭)। একদল যদি এ কথার সাক্ষ্য দান করে যে, অমুক শহারের কাজির কাছে দুই ব্যক্তি অমুক রাতে চাঁদ দেখার সাক্ষ্য প্রদান করায় কাজি তাদের সাক্ষ্যের উপর চাঁদ দেখার ফয়সালা দান করেছেন।

তাহলে ফয়সালা গ্রহণযোগ্য হবে। কোনো শহরবাসী রমজানের চাঁদ না দেখে রোজা রাখতে আরম্ভ করে এবং ২৮ দিন রোজা রাখার পর শাওয়ালের চাঁদ দেখতে পায় তাহলে তার হুকুম হলো, যদি তারা শাবানের চাঁদ ত্রিশ দিন গণনা করার পরও রমজানের চাঁদ দেখতে না পায় তবে তারা একটি রোজা কাজা করবে। শুধুমাত্র তারযন্ত্রের সংবাদ গ্রহণযোগ্য নয়।

কিন্তু বিভিন্ন উপায়ে যদি তারযন্ত্রের সংবাদের সত্যতা প্রমাণিত হয় তবে সে মতে আমল করা জায়েজ আছে। (বেহেশতি জেওর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৫-১৭)। রমজানের চাঁদ দেখার ব্যাপারে চিঠিপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশনের সংবাদ এ শর্তে গ্রহণযোগ্য হয় যে, সংবাদদাতার লেখা অথবা কণ্ঠস্বর পূর্ণভাবে চেনা যায়। সংবাদদাতা লোকটি নির্ভরযোগ্য হতে হবে এবং সে নিজে চাঁদ দেখেছে বলে ঘোষণা করতে হবে। অমুক স্থানে চাঁদ দেখা গিয়েছে অথবা রোজা রাখা হয়েছে এরূপ অস্পষ্ট সংবাদের কোনো মূল্য নেই।

হ্যাঁ, রেডিও, টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ ইত্যাদি সংবাদ মাধ্যমে যদি এমন কোনো নির্দিষ্ট সংস্থার অধীনে থাকে যে,  এসব মাধ্যম দ্বারা কোনো ব্যক্তি নির্ভরযোগ্য (আদিল) মুসলমানের অনুমতি ছাড়া সংবাদ প্রচার করতে পারে না। তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে। শাবানের ঊনত্রিশতম দিবসে আকাশে মেঘ বা কুয়াশার কারণে যদি চাঁদ দেখা না যায় তবে পরবর্তী দিন শাবানের ত্রিশ তারিখ, না রমজানের প্রথম তারিখ এরূপ সিদ্ধান্তহীনতাকে সন্দেহের দিন বলে।

(ফতওয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২০৭)। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে রোজা শুরুর জন্য এমন একজন ব্যক্তির চাঁদ দেখাই যথেষ্ট হবে, যার দ্বীনদার হওয়া প্রমাণিত কিংবা অন্তত বাহ্যিকভাবে দ্বীনদার। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘একজন মরুবাসী ব্যক্তি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট (রমজানের) চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিল।

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি এ কথার সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন সকলকে রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।

(মুসতাদরাকে হাকিম- ১/৪২৪)। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও গবেষক আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর ভাষ্য- এক শহরের চাঁদ দেখা অন্য সকল শহরবাসীদের জন্য গ্রহণীয় হবে। ঐ শহরগুলোর সঙ্গে চাঁদ দেখা শহরের যত দূরত্বই হোক না কেন। এমনকি সর্ব পশ্চিমের চাঁদ দেখার সংবাদ সর্ব পূর্বের মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে পৌঁছালে ঐ দিনই তাদের উপর রোজা রাখা ফরজ হবে। (বেহেশতী জেওর, খন্ড-১১, পৃষ্ঠা-৫১০)।

This website uses cookies.