হাওরবাসীর সামনে কেবলই অন্ধকার?

হাসান হামিদ: এবার ফসল হারিয়ে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার মানুষ যারপরনাই দিশেহারা। এখন আবার মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে কালবৈশাখী। ধান গেলো, মাছ গেলো, এবার ঘরও গেলো। অনেকেই খাবারের আশায় শহরমুখী হচ্ছে।

এ সময় গত রোববার রাতে ঝড়ে সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় তিন হাজার  ঘরবাড়ি ও স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের পর থেকে পুরো জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ  হলেও সবকিছু কবে স্বাভাবিক হবে,  সেটি নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ।

এতোটা অসহায় এর আগে কখনো হয়নি হাওরপাড়ের এই মানুষগুলো। সংবাদ মাধ্যমের বরাতে জেনেছি, গত রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সুনামগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড বেগে ঝড় বয়ে যায়। প্রায় আধা  ঘণ্টা স্থায়ী ঝড়ে মানুষের ঘরবাড়ি, বিভিন্ন স্থাপনা, গাছপালা, বিদ্যুতের লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

উপড়ে গেছে শত শত গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি। অনেকেই কষ্ট করে যে ঘর তৈরি করেছিলেন, সেগুলো এখন সম্পূর্ণ  বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাটে গাছপালা ভেঙে পড়ে আছে। আবার পত্রিকার খবরে দেখলাম, সুনামগঞ্জের পৌর এলাকার মল্লিকপুর খাদ্য গুদামঘাটে ত্রাণবাহী নৌকা ডুবে  ৩৬০ বস্তা ভিজিএফর চাল নষ্ট হয়ে গেছে।

মল্লিকপুর খাদ্যগুদাম থেকে রঙ্গারচর ইউনিয়নে নেওয়ার জন্য ভিজিএফর চাল নৌকায় তোলা হচ্ছিল। এ সময় ঝড়ে ত্রাণবাহী নৌকাটি ডুবে যায়। ত্রাণের ৩৬০ বস্তা (১৮ মেট্রিক টন) চাল বোঝাই ছিলো নৌকাটি। সুনামগঞ্জে কালবৈশাখী ঝড়ে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। গত এক মাস ধরে  মারাত্মক বিপর্যয়  ঘটেছে। খাবারের জন্য হাহাকার করছে হাওরবাসী।

হাওরের এ বিপর্যয় নিয়ে দেশের গণমাধ্যমগুলোর পাশাপাশি বিদেশি গণমাধ্যমগুলো  ফলাও করে সংবাদ প্রকাশ করছে। সরকার এবং স্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সাধ্যের মধ্যে থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। হাত বাড়িয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগও। এত দুঃখ, এত কান্না, তবুও সাড়া মেলেনি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর। কিন্তু কেনো? আমাদের দেশে সাহায্যদাতা প্রধান দেশগুলির অধিকাংশই এখন একটি কনসোর্টিয়ামের সদস্য।

এইড কনসোর্টিয়াম যা দাতাগোষ্ঠী (এইড গ্রুপ) নামে পরিচিত সংস্থাটি বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়ন পর্যালোচনা করতে প্রতিবছর মিলিত হয়। এটি বাংলাদেশের প্রয়োজন বিচার-বিবেচনা করে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে।

এর সদস্যদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, সু্ইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, আইডিএ, এডিবি, ইইউ, ইফাদ, ইউএন সংস্থাসমূহ, ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও এশিয়া ফাউন্ডেশন। দাতাগোষ্ঠীর বাইরের যেসব দেশ বাংলাদেশে সাহায্য দিয়ে থাকে সেগুলির মধ্যে আছে চীন, ভারত, কুয়েত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক ও ওপেক।

বৈদেশিক সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এখন ক্রমাগত প্রতিযোগিতামূলক অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। সাহায্যপ্রার্থী দেশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াতে দাতাগোষ্ঠীগুলি বাজেট করার সময় প্রায়শ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর এই অবস্থা দেখা দিয়েছে। অধিকন্তু, বাংলাদেশে দাতাদের সাহায্য-সহযোগিতা নির্ভর করে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ এবং বৈদেশিক সাহায্যের দক্ষ ব্যবহার করার শর্তের ওপর।

এক্ষেত্রে দাতা দেশগুলির সঙ্গে সমন্বিত সম্পর্ক আর্থিক সাহায্য সহযোগিতার সচল ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে। বৈদেশিক সাহায্য পাওয়া যায় বিচিত্র উপায়ে, যেমন উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঘন ঘন সংলাপমূলক সভার অনুষ্ঠান করে এবং নিয়মিত আন্তঃমন্ত্রণালয় আলাপ-আলোচনা করে। যেসব প্রকল্পে একাধিক উৎস থেকে অর্থসংস্থান হয়, সেগুলি সাধারণত অধিক জটিল এবং সেগুলি একক উৎসের অর্থায়নে গড়ে ওঠা প্রকল্পের চেয়ে আরও বেশি মনোযোগ দাবি করে।

এখন আর মানবতার জন্য সত্যিকার অর্থে তেমন কিছু মিলে না। হাওরে এ অবস্থার পর দেশে কাজ করা দাতা সংস্থাগুলো তো সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা। তারা এখনও হাওরে যায়নি। কবে যাবে সেখানে, কবে ফান্ডের জন্য আবেদন করবে, আর কবেই বা হাওরের মানুষের চুলায় আগুন জ্বলবে।

দাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলে। দারিদ্রতা নিয়ে কথা বলে। এখন তারা কোথায়?  বাল্যবিবাহ নিয়ে কোটি টাকার প্রকল্প হয়; মানুষ না খেতে পেরে হাহাকার করছে, সেটা নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই। পিছিয়ে পড়া নারী সমাজ নিয়ে এতো বক্তৃতা, বিবৃতি; অথচ আজ তারা না খেতে পেরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, সেটা আর এমন কী! লেখক- গবেষক সদস্য, জাতীয় গ্রন্ত্রকেন্দ্র।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *