যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে কোরিয় উপদ্বীপে

আনিসুর রহমান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বর্তমানে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কোরিয় উপদ্বীপে চলমান উত্তেজনায় আতঙ্কিত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনসহ গোটা বিশ্ব।

বিশেষ করে ওই অঞ্চলের মানুষ  ভয়ানক এক সঙ্কটের মধ্যে বসবাস করছে। উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালালে যুক্তরাষ্ট্র তাতে বাঁধা দিতে কোরিয় উপদ্বীপে রণতরি পাঠালে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

ফলশ্রুতিতে পূর্ব এশিয়ায় তো বটেই এমনকি বিশ্ব স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। পরিস্থিতি এমন যেন, যেকোন মুহূর্তে উত্তর কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দায়িত্ব গ্রহণের সেঞ্চুরি বা শততম দিন পূর্ণ করার পর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উত্তর কোরিয়া প্রসঙ্গে বলেন যে, দেশটি যদি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে সরে না দাঁড়ায় তাহলে তাদের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত বেধে যেতে পারে।

তবে ট্রাম্প বিষয়টিকে কূটনৈতিকভাবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে অভিমত ব্যক্ত করেন। ক্ষমতা গ্রহণের শততম দিনে তিনি উত্তর কোরিয় প্রেসিডেন্টের প্রশংসাও করেছেন। ইলেকট্রনিক মিডিয়া সিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প কিমকে অত্যন্ত চালাক লোক বলে আখ্যায়িত করেছেন। কোরিয় উপদ্বীপে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া দুই দেশই সামরিক মহড়া দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ওই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রণতরির সাথে মহড়ায় অংশ নেয়।

উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে জাপান তার নিরাপত্তার জন্যে হুমকি বলে মনে করে। যুক্তরাষ্ট্র কোরিয় উপদ্বীপে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে একটি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে সচেষ্ট রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই বিমানবাহী রণতরি ‘কার্ল ভিনসেন’ এর নেতৃত্বে একটি ক্ষেপনাস্ত্র সজ্জিত সাবমেরিনসহ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কোরিয় উপদ্বীপে অবস্থান নেওয়া ওই রণতরি থেকে যেকোন মুহূর্তে আক্রমন চালাতে পারে আমেরিকা।

পক্ষান্তরে সম্ভাব্য আক্রমন মোকাবেলায় উত্তর কোরিয়াও পাল্টা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে। উত্তর কোরিয়া বলেছে, মার্কিন বাহিনী আক্রমন চালালে তার পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্যে তারা প্রস্তুত রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যি সত্যিই উত্তর কোরিয়ায় হামলা চালিয়ে বসে তাহলে সেই হামলার তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে উত্তর কোরিয়ার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকা যদি আক্রমন করেই বসে তাহলে অন্তত বিশ^যুদ্ধ না বাঁধলেও এ অঞ্চলকে ঘিরে বড় ধরনের একটি যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠবে। একটি জাতীয় শীর্ষ পত্রিকার খবরে প্রকাশ, উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল-সুংয়ের ১০৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে একটি সামরিক কুচকাওয়াজে ৬০টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করে উত্তর কোরিয়া।

সামরিক মহড়ায় দুটি আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রেরও প্রদর্শনী করা হয়। আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষমতা প্রসঙ্গে উত্তর কোরিয়া বলেছে, পাঁচ হাজার পাঁচশ কিলোমিটার দূরপাল্লার এ ক্ষেপণাস্ত্র দুটি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশ নিজ নিজ  সামরিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে।

পরিস্থিতি যেন সংঘাতপূর্ণ না হয়ে ওঠে তার জন্যে চীন ইতিমধ্যেই দ্বিমুখী প্রস্তাব দিয়েছে। চীন বলেছে উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়াও বন্ধ করতে হবে। আর সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। যার উদ্দেশ্য হবে কোরিয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করা।

চীনের প্রস্তাব বাস্তবে পরিণত হলে কোরিয় উপদ্বীপে উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থার নিরসন ঘটবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া চীনের প্রস্তাবকে মেনে নিলে তো ভালেই হবে কিন্তু তারা আদৌ তা মানবে কী? জাতিসংঘেরইবা এ ব্যাপারে কী করণীয়? শান্তিকামী, সচেতন মানুষ কখনোই চায় না বিশ^ একটি যুদ্ধ বা সংঘাতের দিকে ধাবিত হোক। তাই কোরিয় উপদ্বীপের চলমান পরিস্থিতিতে গোট বিশ্ব উদ্বিগ্ন।

চীন এ অঞ্চলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি। কোরিয় উপদ্বীপে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্যে চীনের ভূমিকা খুব জরুরি। কেননা উত্তর কোরিয়ার একমাত্র কূটনৈতিক মিত্র চীন। চীন বহু বছর ধরে উত্তর কোরিয়াকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আসছে। বিভিন্ন সংকটে সবার আগে চীনকেই পাশে পেয়েছে উত্তর কোরিয়া।

এক তথ্যসূত্রে, উত্তর কোরিয়ায় অন্তত ৩০টি পরমাণু বোমা রয়েছে বলে জানা গেছে। ওই তথ্যে আরও জানা যায়, তিন বছরে এ সংখ্যা দ্বিগুণ করার মতো বোমা তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদানও রয়েছে উত্তর কোরিয়ার কাছে। যা রীতিমত উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি করেছে বিশ্বাবসীর মনে। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এ পর্যন্ত পাঁচ দফা ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে উত্তর কোরিয়া।

যুদ্ধ মানেই ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি! ব্যাপক প্রাণহানি! ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ! যার নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সমালোচনায় করে একটি নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। প্রস্তাবে উল্লেখ্য, উত্তর কোরিয়ার একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এ কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট অঞ্চলসহ সারা বিশ্বে উত্তেজনা তৈরি করছে। তাই দেশটিকে অবিলম্বে এসব পরীক্ষা বন্ধ করতে হবে। প্রস্তাবটি নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে তোলা হলে চীন তাতে সমর্থন দেয়। কিন্তু পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়া প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো দেয়। রাশিয়ার দাবি, আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংকট নিরসনের বিষয়টি প্রস্তাবে যুক্ত করতে হবে।

এদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, কোরিয় উপদ্বীপে উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা থেকে বিরত থাকার জন্যে চীনের আহ্বানকে রাশিয়া সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্রের রণতরিবহর ‘কার্ল ভিনসন’ কোরিয় উপদ্বীপে অবস্থান করায় সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।

ট্রাম্প ফোনে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলার সময় উত্তর কোরিয়ার যুদ্ধমনোভাবাপন্ন মানসিকতার জন্যে দেশটির সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প বলেছেন, কোরিয় উপদ্বীপে উত্তর কোরিয়ার কর্মকান্ড অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। তবে এদিকে কার্ল ভিনসনের নেতৃত্বাধীন বহরের সঙ্গে মহড়ায় অংশ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জাপানের দুটি জাহাজ। যা কিনা এ অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

উত্তর কোরিয়রা যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ও দক্ষিণ কোরিয়াতে হামলা চালানোর হুমকির প্রেক্ষাপটে  ডোনাল্ড ট্রাম্প কোরিয় উপদ্বীপে বিমানবাহী রণতরী কার্ল ভিনসনকে পাঠান।  যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ক্যাথলিক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গভীরভাবে ভেবে দেখার আহ্বান জানান।

সংকট নিরসনে তিনি নরওয়ের সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি আবার আশঙ্কা করছেন যে, বিদ্যমান সংকট থেকে ভয়ানক যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। যুদ্ধ নয়। সকলেই শান্তি চায়। এই মূল্যবোধকে উজ্জীবিত রাখতে হবে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়াকে। তবেই বিশে^ শান্তি বজায় থাকবে। পাশাপাশি পারমাণবিক বোমা তৈরির বিষয়ে সকলকে নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোকে।

উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়কে পারমাণবিক শক্তিমত্তার প্রদর্শন বন্ধ করে বিশে^র উদ্বিগ্ন মানুষদের শান্তির নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন তা না হলে, উত্তর কোরিয়াসহ বিশে^র অগণন মানুষ জীবনের অস্তিত্বের প্রশ্নে শঙ্কিত হবেন। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *