নরসিংদীতে কাল বৈশাখী ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ৮ কোটি টাকা

প্রথম সকাল ডটকম (নরসিংদী): বুধবার সন্ধায় নরসিংদীর উপড় দিয়ে বয়ে যাওয়া কাল বৈশাখী ঝড়ে শুধুমাত্র কলা বাগানেরই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকার। এছাড়া সবজির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টাকার মতো।

নরসিংদী সদর উপজেলা কৃষি অফিস এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নরসিংদীর শীলমান্দি, সেখেরচর ও পাঁচদোনা এলাকায়, পলাশ উপজেলার চলনা, মালিতা, খানেপুর এলাকায় বুধবার সন্ধায় এক প্রলয়ংকরী কাল বৈশাখী ঝড় বয়ে যায়।

বৃহস্পতিবার শীলমান্দী এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে চোখে পড়ে ক্ষতিগ্রস্থ কলাবাগানগুলো। এ সময় কথা হয় কলাচাষী আমিনুল হকের সাথে। তিনি জানালেন, ১০ বছর ধরে তিনি কলা চাষ করে সংসার চালান। মাঝে টাকা পয়সার অভাবে ৪ বছর কলাচাষ থেকে বিরত থাকেন।

আশা সমিতি থেকে ৪৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে গত বছর থেকে আবার কলাচাষ শুরু করেন। তিনি এ বছর ১ বিঘা জমিতে কলাচাষ করেছেন। খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকার মতো। গাছে কলা ধরেছে বিক্রিও শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে ২৩ শতাংশ জমির কলাবাগান এক পাইকারের কাছে বিক্রি হয়েছে ৭২ হজার টাকায়। ৩০ হাজার টাকা নিয়ে সমিতির কিছু ঋণ, সার ও কীট নাশকের দোকানের বাকী পরিশোধ করেছেন।

এখন সমিতির, বাকিতে নেয়া সারের দোকানের ও কীটনাশক দোকানের আরো কিছু টাকা বাকি রয়ে গেছে। অপর দিকে পাইকারের দেয়া টাকাও ফেরত দিতে হবে। ঠিক এ ধরণের এক মুহূর্তে তিনি কী করবেন কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। কলাচাষী বললেন, ‘৩ মেয়ে এক ছেলে, সবাই লেখাপড়া করে। তাদের লেখাপড়ার খরচ জোগাবো না মুখে ভাত তুলে দেবো।

এগুলো কীভাবে যে চালাবো তা ভেবে পাচ্ছিনা। আমি একাই দিন রাত এই কলাবাগানেই সময় কাটাতাম। এই জমিটুকুও আমার নিজের নয়। ১১ হাজার টাকায় এক বছরের জন্য বন্ধক নিয়েছি। এই অবস্থায় সরকার যদি আমাদের কোনো প্রকার সহায়তা না করে তাহলে আমার ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করে পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না’।

শুধু আমিনুলই নয় তার মতো কলাচাষে আরো ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন শীলমান্দি এলাকার আয়েছ আলী মুন্সী, জাকির হোসেন, আবু কালাম, মনির হোসেন, ইসমাইল, হুমায়ুন, বাছেদ মিয়া, চাঁন মিয়া, আশনু, কিরন সরকার, সাজাহান সরকারসহ প্রায় ৪শ ৫০ জন কৃষক। তাদের অধিকাংশ কৃষকের একই অবস্থা। কেউ সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে আবার কেউ বা ধার দেনা করেই কলাচাষ করেছেন।

বাগান বিক্রি করেও টাকা পরিশোধ করবেন। এভাবেই মূলত হয়ে থাকে এখানকার কলাচাষের পদ্ধতিটা। নরসিংদী সদর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী এ বছর শুধুমাত্র শীলমান্দিতে কলাচাষ হয়েছে ১০০ হেক্টর।

তার মধ্যে ৪৫০ জন কৃষকের ৪০ হেক্টর কলাবাগান সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। শেখের চর এলাকায় চাষ হয়েছে ২৫ হেক্টর জমিতে, তার মধ্যে ৭০ জন কৃষকের ৫ হেক্টর জমির কলাবাগান সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এবং পাঁচদোনা এলাকায় কলাচাষ হয়েছে ৭৫ হেক্টর জমিতে।

তারমধ্যে ১২৫ জন কৃষকের ১৮ হেক্টর জমির কলাবাগান সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়া নরসিংদী সদরে বিভিন্ন প্রকারের সবজির মধ্যে ৭০ জন কৃষকের প্রায় ৭ হেক্টর জমির সবজি সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এই হিসেবে কলায় ক্ষতি হয়েছে ৬ কোটি ৪২ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং সবজিতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টাকার মতো।

অপরদিকে পলাশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, পলাশে ১০ হেক্টর সাগরকলার বাগান সম্পূর্নরূপে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টাকার মতো। এছাড়া আংশিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫০ হেক্টর কলাবাগান। পলাশে ইতোমধ্যে ধান কাটা শুরু হয়েছে, তারমধ্যেও ঝড়ে প্রায় ৫০ হেক্টর জমির ধান মাটিতে লুটে পড়েছে; যা আর বৃষ্টি না হলে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

পলাশ উপজেলায় কাল বৈশাখী ঝড়ে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবারহ বন্ধ রয়েছে। উপজেলার ৪ টি ইউনিয়ন ও ঘোড়াশাল পৌরসভার গুচ্ছগ্রামে ঝড়ে কাঁচা ঘর-বাড়ি ভেঙে গেছে। কাল বৈশাখী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ রুহুল আমিন, মনির হোসেন, জয়নাল মিয়া ও কাসেম মিয়ার বাড়ির টিনের চাল ও বেড়া উড়ে গেছে।

কৃষি অধিদপ্তরের নরসিংদীর উপ পরিচালক মো: লতাফত হোসেন ঢাকায় প্রশিক্ষণরত থাকাতে তার পক্ষে তথ্য প্রদান করেন জেলা কৃষি অফিসের অফিস সহকারী কাউসার আলম। অপরদিকে নরসিংদী সদর কৃষি কর্মকর্তা মো: আব্দুল হাইও ঢাকায় প্রশিক্ষণরত থাকায় কথা বলেন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মহুয়া শারমীন মুনমুন।

জেলা কৃষি অধিদপ্তরের অফিস সহকারী কাউসার জানান, নরসিংদী জেলার মধ্যে নরসিংদী সদর ও পলাশ উপজেলায়ই বেশী ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া বেলাব উপজেলার কিছু কিছু স্থানে শিলা বৃষ্টি হলেও কৃষির তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি তাই কেউ রিপোর্টও পাঠায়নি। সরেজমিনে দেখা গেছে, কাল বৈশাখীর ঝড়ে ছোট বড় প্রায় শতাধিক গাছ ও ১০/১২ টি বসত ঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

This website uses cookies.