“বাঙ্গালির জীবনে বাংলা নববর্ষ ও কিছুকথা”

উত্তম কুমার পাল হিমেল: নববর্ষ হল নতুন একটি বছরের শুরু। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশেই নববর্ষ উদযাপিত হয়। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন্ সময়ে নববর্ষ উদযাপন করা হয়। ইউরোপ অঞ্চলে  ইরেংজী বছরের হিসেবে, আরব অঞ্চলে আরবি বছরের হিসেবে নববর্ষ, পালিত হয়ে থাকে।

সেই রোপ আমাদের বাংলাদেশে ও পালিত হয় বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। আর এই বাংলা নববর্ষ শুরু হয় বৈশাখ মাসের প্রথম দিন থেকে। এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি উৎসবের দিন।

পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে ১লা বৈশাখকে বিভিন্ন উৎসবের মাধ্যমে বরন করে নেওয়া হয় বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন হিসাবে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্রই এই উৎসবের জোয়ার বয়ে যায়। বাংলা নববর্ষ একটি সার্বজনীন উৎসবের দিন। এটি কোন নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসব নয়।

হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ইত্যাদি যে ধর্মেরই লোক হোক না কেন, এদেশে যাদের জন্ম, বাংলা ভাষায় যারা কথা বলে, বাংলা নববর্ষ তাদের সকলেরই প্রানের উৎসব। তাই বাংলাদেশের ন্যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও জাকজমকের সাথে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়। বাংলাদেশে ব্যবসা-বানিজ্যে যারা দেশীয় লেনদেন ও বেচাকেনার হিসাব নিকাশ রাখেন,বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে তারা পালন করেন ”শুভ হালখাতা” উৎসব।

বৈশাখের শুরুতেই পুরোনো হিসাব চুকিয়ে মিষ্টি মুখের মাধ্যমে নতুন হিসাব চালু করা হয়। ড. মুহাম্মদ এনামুল হক তার ”বাংলা নববর্ষ” প্রবন্ধে লিখেছেন” হালখাতার অনুস্টান পয়লা বৈশাখের একটি সার্বজনীন আচরনীয় রীতি। শুভ হালখাতা নতুন বাংলা বছরের হিসাব পাকাপাকিভাবে টুকে রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের নতুন খাতা খোলার এক আনুষ্টানিক উদ্যোগ।

এতে তাদের কাজ কারবারের লেনদেন,বাকি-বকেয়া,উসুল-আদায় সবকিছুর হিসাব-নিকাশ লিখে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।নানা লেনদেনে সারা বছর যারা তাদের সাথে জড়িত থাকেন অথাৎ যারা তাদের নিয়মিত গ্রাহক, পৃষ্টপোষক ও শুভানুধ্যায়ী তাদেরকে পত্রযোগে বা লোক মারফত নিমন্ত্রন দিয়ে দোকানে একত্রিত করে সাধ্যমত মিষ্টিও জলযোগে আপ্যায়িত করা হয়।

এ অনুস্টানে সামাজিকতা, লৌকিকতা, সম্প্রীতিও সৌজন্যের দিক একান্তভাবে গুরুত্বপূর্ন। নববর্ষ উপলক্ষ্যে বৈশাখী মেলা আরো একটি সার্বজনীন অনুস্টান। বৈশাখের শুরু থেকে প্রায় সারামাস ব্যাপী দেশের বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে। মেলার নাচ, গান, সার্কাস, নাগরদোলা ইত্যাদি মেলাগুলোকে আনন্দময় করে তোলার প্রধান উৎস।

জমিদারী আমলে নববর্ষের আরো একটি সার্বজনীন অনুষ্টান ছিল ”পুন্যাহ”। এ অনুষ্টানের মাধ্যমে জমিদার ও প্রজার মধ্যে দুরুত্ব কমে আসতো এবং প্রজারা আপ্যায়িত হতো জমিদার বাড়ীতে। জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির পর এই অনুস্টানও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাঙ্গালীর ব্যক্তি জীবন এবং জাতীয় জীবনে নববর্ষের প্রভাব অপরিসীম। ব্যবসায়-বানিজ্যে,কৃষি ও জীবন যাত্রায়,সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে নববর্ষ মিশে আছে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে।

বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। তাই আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, লোকাচার, উৎসব পার্বন কৃষিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। কৃষি নির্ভর এ দেশের মানুষ বৈশাখ মাসকেই তাদের ফসল তোলার মাস বলে গ্রহন করেছে। এই প্রভাব শুরু হয়েছিল সম্রাট আকবরের শাসনামলের সূচনায়, বাংলা নববর্ষ প্রবর্তনের পর থেকে।

বাংলা সনের উৎপত্তি সম্পর্কে ড. আশরাফ সিদ্দিকী তার শুভ নববর্ষ গ্রন্থে লিখেছেন, হিজরী চান্দ্র বৎসরের হিসাবে প্রতি বছর এগার দিন এগিয়ে যায় বলে সম্রাট আকবর চান্দ্র হিসাবকে সৌর বৎসরের গননায় রুপান্তরিত করেন। অথাৎ হিজরী ৯৬৩ সন থেকেই বাংলা সনের উৎপত্তি হয়েছে। বাংলা সনের উৎপত্তির সাথে সাথেই বাংলা নববর্ষ এতটা জাকজমকভাবে পালিত না হলেও বর্তমানে এই বাংলা নববর্ষ বাঙ্গালীদের মাঝে মহাসমারোহে পালিত হচ্ছে।

এছাড়া বাংলা ভাষা বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২ শতাধিক দেশে আন্তজার্তিক মর্যাদায় ভাষাদিবস হিসাবে পালিত হওয়ায় বাংলার পরিচিতি এখন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। বর্তমান সময়ে নববর্ষ উপলক্ষ্যে বৈশাখী মেলার সাথে নতুন সংযোজন হয়েছে বইমেলা। বাংলা একাডেমীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসে এই বইমেলা। বই পিপাসুরা নববর্ষের এই শুভদিনে একে অন্যের ও প্রিয়জনের মধ্যে উপহার হিসাবে বই আদান প্রদান করে থাকেন।

দেশ বরেন্য শিল্পীরা ও সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আয়োজন করেন বাংলা বর্ষবরন সংগীতানুষ্ঠান। যেখানে গানের মধ্যদিয়ে আবহমান বাংলার বিভিন্ন কৃষ্টিও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব বাংলা বর্ষবরনে সকল শ্রেনীপেশার মানুষ একসাথে মিলিত হয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে তখন সমসুরে সবাই গেয়ে উঠুন হিংসা,বিদ্বেষ ভুলে এসো সবাই বাংলার জয়গান গাই। লেখক:- প্রভাষক।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *