কুমারী এক রানীর গল্প

হাসান হামিদ: ইংল্যান্ডের রানী প্রথম এলিজাবেথ তাঁর প্রথম আইন সভার অধিবেশনে যে স্মরণীয় উক্তিটি করেছিলেন, সম্ভবত সেটাই ছিল তাঁর জীবনের আন্তরিকতার ছোঁয়ায় রাঙানো প্রথম ও শেষ বক্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার প্রজাদের শুভেচ্ছা ও ভালবাসা ভিন্ন আমার কাছে পৃথিবীর কোন বিছুই মূল্যবান নয়।

যদিও টিউডরদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল অসংখ্য মানুষকে, আর সেই রক্তস্নাত পিচ্ছিল পথ ধরে তিনি আরোহণ করেছেন সিংহাসনে; তবুও কিন্তু তিনি তাদের ভালবাসা অর্জনে সমর্থ হয়েছিলেন।

তাঁর রাজত্বের শেষ দিকের দুঃখময়, বিবর্ণ দিনগুলোতেও যখন তাঁকে চিত্রিত করা হয়েছে শয়তানিতে ভরা ঝগড়াটে এক রক্তবর্ণ  স্ত্রীলোক হিসেবে! তিনি লালায়িত ছিলেন যুব-সম্প্রদায়ের ভালবাসার জন্য; যদিও এর জন্য উচ্চ-পদস্থ বা সাধারণ, কোন ব্যক্তিকেই বঞ্চিত করতে বা বিপদে ফেলতে তাঁর হাত এতটুকু কাঁপেনি।

পৃথিবীর সচচেয়ে কাঙ্খিত মহিলা এই এলিজাবেথ  প্রেমাসক্তিতে ছিলেন উদ্দাম, বল্গাহারা, নির্মম, নিষ্ঠুর। একটুকরো নিখাদ ভালবাসার জন্য তিন পারতেন না এমন কোন কাজই পৃথিবীতে ছিল না। সিংহাসনে যখন তিনি বসেন তখন তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ; পূর্ণ যৌবনবতী, অসম্ভব সুন্দরী, প্রচন্ড বুদ্ধিমতী এবং ভাবপ্রকাশহীন চতুর ও কুটিল এক মহিলা।

তাঁর জন্মের বৈধতা নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন উঠতে পারে, কাগজে অ্যারগণের ক্যাথারিনের বিবাহকে সত্যাসত্যকে ঘিরে অনেক শ্লেষোক্তি থাকতে পারে, কিন্তু কেউ কখনোই এটা অস্বীকার করতে পারবে না যে, এলিজাবেথ ছিলেন রাজা অষ্টম হেনরীর কন্যা। তাই তাঁর কেশদামে লালচে-সোনালি ত্বকে সজীবতা ও মসৃণতার ছোঁয়া লাগা ছাড়া জন্মসূত্রে তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে লাভ করেছিলেন তার তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি, কূটনৈতিক দক্ষতা, প্রচন্ড ঔদ্ধত্য,  সৌজন্যহীন অহংভাব,  চুড়ান্ত বিবেকহীনতা এবং শিক্ষানুরাগ।

আর অ্যানবেলিনের মেয়ে হিসেবে এই সব বৈশিষ্ট এবং গুণের সঙ্গে তিনি যোগ করেছিলেন নারীসুলভ সমস্ত রকমের চাতুর্য ও কৌশল। এলিজাবেথ সম্পর্কে স্পেনের রাষ্টদূত তার নিজস্ব তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা লিখে জানিয়েছিলেন ফিলিপকে- ‘শত সহস্র নারকীয় জীবের সমাহার হল এই মহিলা।

এলিজাবেথ জন্মগ্রহণ করেন ১৫৩৩ সালে; কিন্তু তাঁর পিতা অষ্টম হেনরি তাকে খুশি মনে নিতে পারেননি; কেননা তিনি চেয়েছিলেন যে কোন পুরুষ বংশধর এসে বহন করুক ঐতিহ্যশালী এই টিউডর বংশের ধারা; বিশেষতঃ অজস্র বাধা আর প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে তিনি যেখানে অ্যানবোলিমকে রাণী করেছিলেন সেখানে সামন্য প্রতিদান হিসেবে সেও তো তাকে একটা পুত্রসন্তান উপহার দিতে পারত।

এলিজাবেথ যদি কন্যসন্তান না হয়ে পুত্রসন্তান হতেন তো অ্যানবোলিনকে হয়তো তিন বছরের শিশুকে ফেলে রেখে ফাসি কাষ্ঠে তার উচ্চকাঙ্খী জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাতে হত না। শিশু হিসেবে একাকীত্ব, তীতি, বেদনা এবং দুঃখ সম্বন্ধে এলিজাবেথেরে অভিজ্ঞা আর পাঁচটি শিশু থেকে ছিল অনেক বেশি। খুব ছোট্ট বয়স থেকে হঠাৎ মৃত্যুজনিত ভয় ছিল তাঁর চিরসাথি এবং নিজের জন্মের কলঙ্ক ছিল কায়র-ছায়ার মতো সর্বদা সম্মুখে লম্ববান। তাঁর ছোটবেলার বেশির ভাগ সময়টাই কেটেছে প্রকৃতপক্ষে বন্দিদশায়।

তবু ভালো গৃহশিক্ষক, প্রচুর পুস্তক এবং ছোট্ট বৈমাত্রিয় ভাই এডায়ার্ডেয়ের সাহচর্যে তিনি কিছুটা তৃপ্তিলাভ করেছিলেন। সর্বোপরি, রাজার অ্যাসচাস এবং ব্যলডাসেয়ারের অভিভাবকত্বে ‘হ্যাটফিলড হাউসে’ কাটানো শান্ত দিনগুলো ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মতিগুলোর অন্যতম। এরপর ১৫৪৭ সালে অষ্টম হেনরি মারা গেলেন এবং সিংহাসনে বসলেন দশ বছরের বালক ৬ষ্ঠ এডোয়ার্ড, সঙ্গে অভিভাবক হিসেবে থাকলেন তার মামা ডিউক অব সমারসেট। কিছুদিনের মধ্যে দিকচক্রবালে ঘনিয়ে এল চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের কালো মেঘ।

সমারসেট ক্ষমতালোভী হলেও সেরকম ধুর্ত ছিলেন না। তাই অষ্টম হেনরির উইল অনুযায়ী উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর পরেই ছিল অ্যারগনের ক্যাথারিণের কন্যা মেরি টিউডারের নাম এবং সবশেষে ছিল এলিজাবেথের নাম। তবে, এদের দুজনের কাছেই ভয়াবহ বিপদস্বরূপ ছিল ফ্রান্সের দাঁফের স্ত্রী ও অষ্টম হেনরির বড় বোন মার্গারেটের নাতনী এবং স্কটল্যান্ডের সিংহাসনের ভবিষ্যৎ দাবিদার মেরি ষ্টুয়ার্ট।

আসলে, ইংল্যান্ডের সিংহাসনের ওপরও মেরি ষ্টুয়াটের দাবি ওই দুই টিউডর যুবরাণীর চেয়ে অনেক বেশি ও জোরালো ছিল; কিন্তু মেরি টিউডের মতো তার ক্যাথলিক ঘেঁষা মনোভাব তাকে ইংল্যান্ডের জনগণের সহানুভুতি থেকে বঞ্চিত করেছিল এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তার ফ্রান্সের রাণী হওয়, যা তার ইংল্যাডেশ্বরী হওয়ার পক্ষেও অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল।

এই পরিস্থিতি যেমন ঘোরালো হয়ে উঠল তার ফলে জন্ম নিল  পারস্পরিক সন্দেহ, কুটিল ষড়যন্ত্র এবং নোংরা চক্রান্ত ও তার পাল্টা চক্রান্ত। একদিকে ষোল বছর পূর্ণ হবার আগেই মারা গেলেন ষষ্ঠ এডোয়ার্ড এবং সঙ্গ সঙ্গে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠবার চেষ্টা করল লেডি জেন গ্রেই। অবশ্য সে প্রচেষ্ট অঙ্কুরেই বিনিষ্ট করা হল; তবে এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সঙ্গে এলিজাবেথের যোগসাজসের খবর যথেষ্ট যুক্তি সহকারে সমর্থিত হল।

তাঁর এই সৎ বোনকে মেরি তৎক্ষণাৎ পাঠিয়ে দিলেন দুর্গের অন্তরীণ এবং বিশ্বসঘাতকতা ও গুপ্তচরবৃত্তির যে অবধারিত শাস্তি মৃত্যু-সেটা এলিজাবেথ এড়াতে পারল কেবলমাত্র স্পেনের ফিলিপ ও তার বাবার হস্তক্ষেপের জন্য। পরবর্তীকালে যখন ফিলিপ ও এলিজাবেথের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী খন্ডযুযদ্ধ শুরু হয়েছিল তখন ফিলিপ এটা স্মরণ করিয় দিতে ভোলেননি যে তারই জন্য এলিজাবেথ আজ জীবিত।

আর, জীবন ফিরে পেয়ে সে কিনা তার জীবনদাতারই জীবন নিতে উদ্যোত। যাই হোক, ‘নিষ্ঠুর মেরির’ রাজত্বের পাঁচটা যন্ত্রণাময় বছর এলিজাবেথ কাটালেন লর্ড সেমুরের রাজসংসারে। এই সেমুর হলেন অষ্টম হেনরির শেষ রানী ক্যাথরিন পারের দ্বিতীয় স্বামী, বযসে যিনি তার স্ত্রীর থেকে অনেক ছোট ছিলেন। এলিজাবেথ অবশ্য তাঁর বিমাতা ক্যাথরিনের নতুন স্বমীর বেশ প্রিয় পাত্রীই হয়ে উঠেছিলেন।

কারণ, পঞ্চদশবর্ষীয়া রাজকুমারীর হৃদয়ে সুখের যে ঢেউ সুদর্শন সেমু তুলেছিলেন তাঁর যৌবনের তটে, তাই ১৫৪৮ সাথে ক্যাথরিন মারা যেতেই সেমুন এলিজাবেথের কাছে সরাসরি প্রস্তাব করলেন। সেমুর-এলিজাবেথ সম্পর্কের প্রকৃত চেহারা হয়তো আমরা কোনদিনই জানতে পারব না, কিন্তু যে লোকনিন্দা ও কলঙ্কের আবর্তে তিনি নিজেকে এবং এলিজাবেথকে ডুবিয়েছিলেন তাতে যুগ্ন মৃতুদন্ড প্রায় অবধারিত ছিল। কারণ, সেমুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল রাজদ্রোহিতার; তিনি চেয়েছিলেন এলিজাবেথকে বিয়ে করে ইংল্যান্ডের সিংহাসন অধিকার করতে।

শেষপর্যন্ত একদর দুঁদে উকিলের প্রাণন্তকর জেরায় জেরবার হয়ে এলিজাবেথ তাঁর নির্দোষিতা প্রকাশ্যে ঘোষনা করার পার তাঁরা দুজনে তাদের শির ও সম্মান কোনোক্রমে বাঁচালেন। এদিকে প্রোটেষ্টান্ট শহীদদের রক্তে ইংল্যান্ডের আকাশ-বাতাস রীতিমোতো উত্তপ্ত। প্রেমের জোয়ারে অবগাহন করে থাকলেও এলিজাবেথ কিন্তু স্বচ্ছ, তীক্ষ্ন, কঠিন ও নীরব দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে যাচ্ছেন তার সৎ বোন মেরির একটার পার একটা ভুল ও অন্যায় পদক্ষেপ। অবশেষে ১৫৫৮ সালে করুণ ব্যর্থতার প্রতিমূর্তি এই নিঃসন্তানা এবং ঘৃণিতা মেরিকে মৃত্যু এসে মুক্তি দিয়ে গেল।

সমগ্র ইংল্যান্ড আনন্দের আর খুশির কলতানে মুখরিত হয়ে উঠল-তবে সে খুশি ও আনন্দ এলিজাবেথ এর সিংহাসন আরোহণের জন্য ততটা নয় যতটা মেরির মৃত্যুর জন্য। যে বছরে মেরি মারা গেল, সেই বছরেই নভেম্বর মাসেই মাঝামাঝি নাগাদ এলিজাবেথ ইংল্যান্ডের রাণী হলেন, আর এমন একটা সময়ে তিনি সে দেশের হাল ধরলেন যখন ইংল্যান্ড ধুকছে মারাত্মক মহামারীর কবলে পড়ে এবং সংঘাতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে ফ্রান্সে রক্তক্ষয়ী ও অর্থক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে।

মেরির পাঁচ বছরের ওই রাজত্বকালে দেশটা একেবারে ধ্বংসের গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছিল-তার সম্মান ও মর্যদা ভুলুন্ঠিত হয়ে ছিল, মুদ্রার মূল্যমান হ্রাস পেয়েছিল এবং দেশবাসীরা ধর্মীয় মতদ্বৈধতায় জর্জরিত ছিল। অনেকে নাকি এই মত পোষণ করে যে, এলিজাবাথের রাজ্যভিষেকে যে খুশির রোশনাই আর আনন্দের বন্যা বয়েছিল সেটা দেশবাসীর কাছে প্রায় অপরিচিত নতুন এক রাণীকে বরণ করার জন্য নয়, বরং তাঁর বোনের স্বস্তিদায়ক মৃত্যুকে স্বগত জানাবার জন্য।

লালচে-সোনালি কোকঁড়ান চুল, ম্লান মুখ, তীক্ষ্ন লীল চোখ এবং দুধসাদা লম্বা হাত সব মিলিয়ে এলিজাবেথকে সত্যিই রাজ-নন্দিনী বলে মনে হত এবং এর জন্য মনে মনে তাঁর একটা অহংকারও ছিল। এহেন যুবতী রানীর কুমারীত্ব আবার কূটনৈতিক মহলে দারুণ কৌতুহল ও আগ্রহের সঞ্চার করেছিল। অতএব ধান্দাবাদ রাস্ট্রদুত গুপ্তচরের দল ইউরোপের বিভিন্ন রাজকুমার ও রাজভ্রাতার জন্য কোটনাগিরি শুরু করে দিল।

সিংহাসনে আরোহণ করেই এলিজাবেথ তাঁর মন্ত্রীসভার অনুমোদন নিয়ে গঠন করলেন সেরা এক উপদেষ্টামন্ডলী; এবং এক্ষেত্রেও তিনি প্রতিভার ছাপ রাখলেন। তবে তাঁদের উপদেশ ও মতামতের উপর যে তিনি চলতেন তা কিন্তু নয়; তিনি বরং তাদের সুচিন্তিত পরামর্শের সঙ্গ মিশ্রণ ঘটাতো তাঁর ব্যক্তিগত বৃদ্ধি ও চিন্তা-ভাবনা এবং সিদ্ধান্ত যেটি নিতেন, সেটি ছির তাঁর সম্পূর্ণ নিজস্ব উইলিয়াম সেসিল ছিলেন তাঁর প্রধানমন্ত্রী এবং ওই পদেই আমৃত্যু তিনি বিশ্বস্ততার সঙ্গে রাণীর সেবা করে গেছেন।

চল্লিশ বছর ধরে। এক ঐতিহাসিক লিখেছিলেন-‘তিনি ছিলেন এমনই একজন মহিলার অনুগত এবং উপযুক্ত এক কর্মচারী, এমনই একজন মহিলার যার ডান হাত কখনই  জানতে পারত না তার বাম হাত কি করতে যাচ্ছে। এরপর, প্রধানমন্ত্রী ও নতুন মন্ত্রীসভাকে নিয়ে এলিজাবেথ তাঁর দেশের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে ব্রতী হলেন। প্রথম কয়েকটা বছরে প্রচন্ড ব্যয়-সংকোচ করে এবং ব্যাপক হারে কর বিসিয়ে তিনি দেশকে ঋণমুক্ত করলেন।

ফ্রান্সের সাথে যখন তাঁর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, সেই সময় ফ্রান্সের বন্দর শহর ক্যালেই যাতে তাঁর হস্তগত না হয় তাঁর জন্য তোষামোদ করে ও ভয় দেখিয়ে তাঁর উপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন স্পেনের রাজকুমার ফিলিপ; তাকেও তিনি কৌশলে বাগে আনতে সচেষ্ট হলেন; কিন্তু শেষ চাল হিসেবে যখন ফিলিপ তাঁর কাছে বিয়ের প্রস্তব রাখলেন এবং উল্টোদিকে আবার ইংল্যান্ডের ক্যাথলিকদের ক্ষয়িষ্ঞু ক্ষমতার দিকেও শঙ্খিত নেত্রে চেয়ে থাকলেন এলিজাবেথ তখন খানিকটা দোটানার মধ্যে পড়ে গেলেন।

তারপর আলাপ আলোচনায় ক্যালেকেই বিক্রি করে দিলেন এবং সেই সঙ্গে একেবারে নাকচ করে দিলেন ফিলিপের প্রস্তাব। ওই মাসেই ‘চার্চ অব ইংল্যান্ড’ তার অস্তিত্ব লাভ করল। এলিজাবেথের বিরুদ্ধে বরাবরই একটা অভিযোগ ছিল যে তিনি ছিলেন এক মোহিনী নারী। আপাতবিরোধীভাবে এটা যেমন সঠিক, তেমনি বেঠিকও। শোনা গেছে, তাঁর বৃত্তের ধারে কাছে যে যুবকই এসেছে, পাগলের মতো ঝাপিয়ে পড়ে তিনি তার যৌবনরস পান করেছেন।

সম্ভবতঃ এসেক্স এর সঙ্গেই তাঁর প্রেম যথেষ্ট গভীরতা লাভ করেছিল; কিন্তু স্পেনের ফিলিপ, তাঁর সম্পর্কিত ভাই ডন জন এবং অষ্ট্রিয়ার আর্কডিউক চার্লস, আনজাউয়ের হেনরি কিংবা তার ভাই ফ্রান্সিস-এদের সকলের সঙ্গেই তাঁর সলাজ সম্পর্ক ছিল ঠান্ড রাজনীতি সঞ্জাত। তাঁর এই নিস্পৃহ এবং শীতল আবরণ কিন্তু তাঁর পরিকল্পিত সাফল্যেরই অঙ্গীভূত। দুঃসাহস ও যৌবনের আগুনে উত্তপ্ত এবং বিত্ত ও ভোগের লালসায় উত্তেজিত একটা দেশে তিনি চোখ ঝলসানো ব্যক্তিত্ব, যাকে ধরা যায় কিন্তু বেঁধে রাখা যায় না, যার স্পর্শে জাগে শিহরণ কিন্তু তা দেয় না কোনা নির্ভরতা।

জাঁকজমক, আড়ম্বর ও যে কোন বিলাসিতার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র আসক্তি। রাজকীয় কোন অনুষ্ঠান বা শোভাযাত্রা, যা বর্ণঢ্যতায় ও জৌলুষে সাধারণ মানুষের চোখকে ধাঁধিয়ে দেয় এবং তাদেরকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দেয় তার জন্য তিনি স্বয়ং পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। অন্যদিকে আপামর জনসাধারণের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন উৎসাহ ও প্রেরণার এক জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি-যাকে আদর্শ করে অসংখ্যা সাহসী, মেধাবী, এনকি বিবেক-বুদ্ধিহীন মানুষও বেরিয়ে পড়েছিল স্থলে, জলে ও রণাঙ্গনে কিছু একটা করে দেখবার নেশায় মত্ত বা পাগল।

তবে ধর্মীয় মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে তিনি মোটেই প্রশ্রয় দিতেন না। কারণ, তাঁর এটা ভালোভাবেই জানা ছিল যে ইংল্যান্ডে পূর্ণ ধর্মান্তরিত করার জন্য স্পেন থেকে যে বিশেষ সম্প্রাদায়ের ধর্ম প্রচারকদের পাঠানো হয়েছিল, তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল তাঁর দেশে বিদ্রোহ ও রাজদ্রোহের বীজ বপন করা। ওদিকে ওই ধর্মসংস্কারকদের অন্ধ বিশ্বাসের প্রতি অকপট ও অবিচল আস্থা নিয়ে থাকায় এবং সমগ্র ইংল্যান্ডের ক্যাথলিক ভাবধারার প্রতি সহানুভূতি পোষণ করায় তাঁর সিংহাসনের গায়ে তিনি অনুভব করলেন মৃদু তরঙ্গাঘাত।

অতএব, এলিজাবেথ ক্যাথলিকদের অযথা হয়রান এবং তাদের উপর নির্যাতন করতে শুরু করে দিলেন। কিন্তু গ্রনির বক্তব্য ছিল অন্য রকম। তার মতে, ‘এলিজাবেথই হলেন প্রথম ইংরেজ শাসক যিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ধর্মীয় নির্যতনের অভিযোগ তাঁর শাসন ব্যবস্থার উপর একটা বিরাট কলঙ্ক স্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে তাই শুধু মাত্র ধর্মীয় মতদ্বৈধতার কারণে কোন মানুষকে হত্যা করার চেষ্টাকে তিনি সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছিলেন। তবে ক্যাথলিকদের ধর্মবিশ্বাসের উপর তাঁর সহানুভুতি থাকলেও, ‘চার্চ অফ ইংল্যান্ড’ ছিল তাঁর নিজের দেশের ধর্মকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করাবার জন্য।

তিনি তো তাকে একটু উঁচুতে তুলে ধরবেন; কারণ এই ধর্মের উপর তাঁর দুর্বলতা অনেক বেশি; আর সেই জন্যই ১৫৬৮ খৃষ্টাব্দে ল্যওংসাইডের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে স্কটল্যান্ডের রাণী মেরি যখন সীমান্তে পেরিয়ে তাঁর দেশে আশ্রয় ভিক্ষা করলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা পেলেন-তবে তা কারাগারে। তার মানে এই নয় যে এলিজাবেথ তার সৎ-বোনকে ঘৃণা করতেন; আসলে, একজন ক্যাথলিকের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক প্রোটস্টান্টের বিরাগভাজন তিনি হতে চাননি। অতএব মেরির স্থান হল কারাগারে-দীর্ঘ আঠারো বছর তাকে এক দুর্গ থেকে আরেক দুর্গে স্থানান্তরিত হতে হল। ইতোমধ্যে এলিজাবেথও সুচতুরভাবে জনসাধারণের বিশ্বাসকে কাজে লাগাতেন।

ইংল্যান্ডবাসীদের ধারণা ছিল যে মেরি স্পেনের সঙ্গে পঁচিশ বছরের জন্য যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছেন তার প্রকৃত উদ্দেশ্য হল ইংল্যান্ডের সিংহাসন করায়ত্ত করা। তাঁর এও মনে হল যে ভদ্রতার সীমা লঙ্খন করেও ফিলিপ যদি তাঁকে একবার মুঠোর মধ্যে ভরতে পারে, তাহলে ইংল্যান্ডের সিংহাসনের উপর মেরির দাবি অনেকটা জোরদার হবে এবং সেই সঙ্গে ত্বরান্বিতও হবে ইঙ্গ-ফরাসি চুক্তি আর ঠিক এই জিনিসটাই শেষ পর্যন্ত ফিলিপ চেয়েছিলেন।

অন্যদিকে মেরিরর আঠারো বছরের বন্দিদশায় এলিজাবেথকে সিংহাসনচ্যুত করা জন্য একের পার এক ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা হয়ে যাচ্ছিল। আর এলিজাবেথও এই সময়টায় গুপ্তহাত্যার ভয়ে আতঙ্কে সিটেয়ে থাকতেন, এর ফলে তাঁর টেবেলকে তিনি স্বাভাবিকভাবে উপভোগ্য করতে পারেননি। তবু তিনি মেরিকে প্রাণদন্ড দেননি।

অবশেষে আর একট জঘন্য ষড়যন্ত্রের খবরে ভীত ও ক্ষিপ্ত হয়ে ১৫৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে মেরি সম্পর্কিত সমস্ত দায়দায়িত্ব তিনি অর্পণ করলেন মেরিই জিম্মাদার পলিটের উপর এবং সে সম্পর্কিত হুকুমনামায় তাঁর সই ও সীলমোহর দেবার ব্যাপারে বলির পশু করলেন তাঁর নিজস্ব সচিব ডেভিডসনকে। ঠিক তার পরের বছরেই স্প্যানিজ জাহাজের উপর ইংরেজ অভিযানকারীদের দুর্ব্যহারে রীতিমতো কুপিত হয়ে ফিলিপ তার রণতরীর বহরকে পাঠালেন নেদারল্যান্ডস এবং আমেরিকায় যেখানে শত্রুপক্ষ ব্যাপকভাবে তার স্বার্থক্ষুন্ন করে যাচ্ছিল।

ওদিকে শত্রুপক্ষ এই হঠাৎ আক্রমণেল জন্য প্রস্তুত ছিল না; তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে যুদ্ধাস্ত্র বা গোলাবারুদ, কোনটারই মজুত ছিল না। খারাপ কিছু একটা যাতে না ঘটে যায় তার জন্য এলিজাবেথকেও লন্ডন তাগ করে চলে যেতে বলা হয়। নৈরাশ্যবাদীরা, প্রমাদ শুণলেন যে হানাদারদের মদদে এই সুযোগে দেশের অভ্যন্তরে ক্যাথলিকরাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।

কিন্তু না তাঁর সাধের ইংল্যান্ড-যে ইংল্যান্ডকে একটা আদর্শের জন্য বলি প্রদত্ত আপামর জনসাধারণের নিষ্ঠাকে সম্বল করে তিনি নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন-উপযুক্ত মূহুর্তে তাঁকে নিরাশ করল না। তাই টিলাবেরিতে এক সমাবেশে তাঁর সৈন্যবাহিনীর উদ্দেশ্য তিনি বললেন, ‘আমার প্রিয় এবং বিশ্বস্ত দেশবাসীর প্রতি একতিল সন্দেহ বা অবিশ্বাস নিয়ে আমি বেঁচে থাকতে চাই না। আমি জানি আমি একজন নারী; তাই শরীরগত কারণে আমি ক্ষীণ ও দুর্বল হতে পারি, কিন্তু হৃদয়টা আমার রাজার মতো।

এটা ভাবতে আমার রীতিমতো দুঃখ ও ঘেন্ন হয় যে পারমা অথবা স্পেন কিংবা ইউরোপের কোন যুবরাজ আমার রাজ্যের সীমান্তে এসে নিঃশ্বাস ফেলে যাচ্ছে।’ তার বক্তব্যের সমর্থনে সৈন্যদের মধ্য থেকে যে হর্ষধ্বনি উঠল তা মিলিয়ে যাবার আগেই হঠাৎ এক দুত ডেক থেকে ছুটতে ছুটতে তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হল এবং জানাল যে তার বিশ্বাস ব্যর্থ হয়নি। কারণ, ঈশ্বরের সহায়তায় ইংরেজরা স্পেনীয় আরমাডাদের হঠিয়ে দিয়েছে। সানন্দে তিনি তাই ঘোষন করলেন, ‘দখুন ঈশ্বর শুধু সৎ এবং সাহসীদেরই সাহায্য করেন।

তাই তাঁর দৈব বায়ুর সাহায্যে তিনি আমাদের শত্রপক্ষকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাই তাঁর সোনালি রাজত্বের গৌরবময় দিন হিসেবে গণ্য করা হয় ১৫৮৮ খ্রিষ্টব্দের এই ১৭ নভেম্ব তারিখটিকে। কারণ দেশের প্রধান হিসেবে তিন অত্যন্ত সুচারুভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে তাঁর কর্তব্যই শুধু সম্পাদন করেননি তিল তিল করে সে দেশকে তিনি নিজের হাতে গড়েছেন এবং তাকে সম্মানের ও গৌরবের সর্ব্বোচ্চ চুড়ায় নিয়ে গেছেন, চরম বিপর্যয় ও ধ্বংসের হাত থেকে সেই দেশকে তিনি সর্বশক্তি দিয়ে তৃপ্ত মরালীর মতো খুশি মনে ঘুরে বেড়িয়েছে, আর তিনি নিজে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছেন তাঁ প্রিয় দেশবাসীর অন্তর থেকে।

শেষে, সম্পুর্ণ একাকী এবং ভগ্নমনা অবস্থায় তিনি পেতে চাইলেন একটু প্রেমের উষ্ঞ পরশ; কিন্তু সেখানেও তিনি প্রত্যাখ্যাত হলেন। কারণ, সুদর্শন, তরুণ ও স্বেচ্ছাচারী নাইট এসেক্স যে এলিজাবেথকে জানতেন, তিনি ছিলেন অহংকারী এবং তেজী এক মহিলা এবং রাজানুগ্রহের প্রতিও তই তাঁর চিল চরম এক অবজ্ঞা ও ঘৃণা। তিনি অপেক্ষ করেছিলেন সময়ের করাল থাবায় ক্ষত-বিক্ষত কুৎসিৎ ও বিগত যৌবনা এক নারীকে দেখার জন্য।

সময়ের চাপে তিনি শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে নুইয়ে পড়লেও এসেক্স-এর ধারণা ছিল যে ওই টিউডর অগ্নিশিখা যতই স্তিমিত অবস্থায় থাকুক না কেন তাকে (এসেক্স) গিলে খাবার পক্ষে তা তখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। তাঁর আশঙ্কা একদিন সত্যে পরিণত হল। ১৬০১ সালের ২৫ ফেরুয়ারি সেই এসেক্সকে ফাঁসিকাষ্ঠে গ্রাণ দিতে হল; তার মৃত্যুর সাথে এলিজাবেথের হৃদয়ের মৃতু ঘটল। অংহকার যেমন ছিল এলিজাবেথর জীবনের চালিকাশক্তি, তেমনি তা ছিল তাঁর প্রেমের দাহিকাশক্তিও।

অহংকার ছিল তাঁর জীবনে উত্থান, তার জীবনের পতনও। তাই জীবনের প্রান্তসীমায় পৌছেও মাঝে মাঝে দেখা গেছে পরন্ত সূর্যের দীপ্ত কিরণ-গমগম করে বেজে উঠছে তাঁর উচ্চকিত হাসির সুরেলা অনুরণন, শোনা গেছে চাঁছাছোলা ভাষায় স্পষ্টাপষ্টি বক্তৃতা যা রাষ্টদূতদের অনুপ্রাণিত করেছিল সত্য কথা বলতে এবং রুক্ষ নাবিকদের উদ্বুদ্ধ করেছিল কাব্য রচনা করতে।

কিন্তু এসবই ছিল নিভে যাওয়ার আগে প্রদীপের দেদীপ্যমান শিখার মতো হঠাৎ এক উজ্জ্বল বিচ্ছুরণ। ১৬০৩ সালের ২৪ মার্চ এসেক্সয়ের মৃত্যুর ঠিক দুবছর পরেই ইংল্যান্ডে রাণী প্রথম এলিজাবেথের জীবনদীপ চিরতরে নির্বাপিত হয়ে গেল। ফ্যারাওদের পিরামিডের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল তা স্মৃতিসৌধ আর সেই স্মৃতিসৌধ ছিল তাঁর স্বদেশ, যাকে তিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে জগৎসভায় সবশ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়েছিলেন।

কারোর কোন উপদেশ কেমন করে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে তার কৌশল আয়ত্ব করে এবং অচিরেই তড়িঘড়ি কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে না ফেলে, আগামী কাল সম্ভবতঃ ভালো কিছু ঘটতে পারে সেই আশায় সেই কাজকে ফেলে না রাখা-এই নীতিতে বিশ্বাস করে এবং ঝুঁকি নিয়ে তিনি স্পেন ও পর্তূগালের সমুদ্রোপকুলে খবরদারি করার প্রবণতাকে চিরদিনের মতো কমিয়ে দিয়েছিলেন; ক্যাথিলিকদের বিরুদ্ধে লুথারের সমর্থকদের লেলিয়ে দিয়ে নিজের দেশে স্থাপন করিছিলেন্ চার্চ অফ ইংল্যান্ড, এযাবৎ পৃথিবী যা দেখেনি এবং অদুর ভবিষ্যতে দেখবে বলে মনেও হয় না সেই সব কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, সৈনিক, আবিস্কারক, বিজ্ঞানী প্রভৃতি উজ্জ্বল জ্যোতিস্ক সম্প্রাদায়ের কাজে তেনি আলোকদায়িনী সূর্যের মতো সাক্ষাৎ অনুপ্রেরণার প্রতিমূর্তি।

এলিজাবেথ সারাজীবন কুমারীই রয়ে গেছিলেন। শোনা যায় তার নাকি কিছু একটা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছিল। তবে তা ঘটনা বা রটনা যাই হোক না কোন ঐতিহাসিকদের কথাটা বিশ্বাস করাই যুক্তিযুক্ত এবং তা শ্রেয়ও-বিয়ে তিনি করেননি ঠিকিই, কিন্তু ভালো তিনি বেসেছিলেন এবং তা গভীরভাবে ও আন্তরিকভাবে। আর সেই ভালবাসার, প্রেমের পাত্রটি ছিল তার অতি আদরের স্বদেশ-ইংল্যাল্ড। [মাইকেল এইচ. হার্ট অবলম্বনে]

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *