মিথিলার মৃত্যু : পাপ ছুড়ে মৃত্যুকে আড়াল

সাবিনা শারমিন: মেলানিয়া ট্রাম্প পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর দেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও বর্তমান ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্ত্রী। তিনি একজন সাবেক পেশাজীবী মডেল ছিলেন। ট্রাম্পের সূত্রে সঙ্গত কারণেই আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের গণমানুষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্ত্রীর সাবেক পেশার বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। তাই বলে এ কথা বলা যাচ্ছে না যে, মডেল ছিলেন বলে তিনি ফার্স্ট লেডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে অপারগ হবেন।

কিংবা পেশা হিসেবে মডেলিং সম্মানজনক নয় বলে ফার্স্ট লেডি হিসেবে তিনি বেমানান। জ্যাকলিন মিথিলা নামের একজন পেশাজীবী মডেল ও নৃত্যশিল্পীর কথিত আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ এবং পেশার সম্মান নিয়ে কয়েকটি বিষয়ের চিন্তা সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করার জন্য এ লেখা।

আমাদের সমাজে মানুষের প্রয়োজনে যেসব কাজ প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে, সেগুলোই একসময় পেশায় পরিণত হয়। সে দৃষ্টিকোণে বিবেচনা করলে মডেলিং পেশা, ওই ধরনের অনেক পেশা হতে উত্তম, যে পেশার অপ্রয়োজনীয় দূষিত এবং বৈষম্যমূলক বয়ান শুনে শুনে নিবরাস-রোহানদের মতো কিশোররা নারীর প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা আর বিদ্বেষ নিয়ে মাত্র ছয় মাসেই সাংঘাতিক জঙ্গি হয়ে ওঠে। মডেলিং বা সিনেমায় গান-নাচ প্রভৃতি, এ ধরনের পেশা মিথিলারা নিজ দায়িত্বে এবং পছন্দে জীবিকার প্রয়োজনে বেছে নিয়েছেন।

এখানে অন্যের গাত্রদাহের কারণ আদৌ গণনাযোগ্য নয়। তা ছাড়া যাঁদের গাত্রদাহ আছে, তাঁরা নিশ্চয়ই পৃথিবীর অন্য অনেকের কাছে নিন্দনীয় যে পেশাগুলো বলবত আছে, সেগুলোকে পৃথিবী থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে পারবেন না। পৃথিবীর কথিত সবচেয়ে ঘৃণিত পেশাটি পুরুষের প্রয়োজনেই এখনো সমাজে টিকে আছে এবং থাকবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের শিক্ষামন্ত্রী স্মৃতি ইরানিও একসময় পণ্যের মডেল এবং নাট্যশিল্পী ছিলেন।

একসময় তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে নারীদের সৌন্দর্যের সামগ্রী বিক্রি করে বেড়াতেন। কথা হচ্ছে, জীবিকার প্রয়োজনে তাঁরা প্রথম জীবনে যে ধরনের পেশা বেছে নিয়েছিলেন, তা কোনোভাবেই অসম্মানজনক হতে পারে না; বরং একজন খেটে খাওয়া নারী, ঘরে বসে থাকা ননি খাওয়া নারীর চেয়ে উত্তম। তাই যদি হয়, তাহলে আমাদের দেশে একজন নরসুন্দরের মেয়ে যদি মডেল ও নৃত্যশিল্পী হয়ে নিজ পরিশ্রমে উপার্জন করেন, তাহলে আমাদের দেশের পুরুষদের গাত্রদাহ হওয়ার কি কোনো কারণ থাকতে পারে? পাপ শুধু নারীর জন্যই নির্ধারিত, এ ধরনের সাধারণীকরণ কতটা যুক্তিযুক্ত?

ধরে নিচ্ছি, তাঁরা আমাদের সমাজে পাপ করে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু আপনি নিজে কেন সেই পাপের ভোক্তা? মিথিলাদের কাছে আপনাদের নির্ভর করতে হচ্ছে কেন? সেখানে গিয়ে অধঃপতিত হওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে কেন? এ ধরনের নারীরা পুরুষদের অধঃপতিত করার যোগ্যতা রাখেন কীভাবে? এদের লাখ লাখ অনুসারীর মধ্যে কতজন নারী আর কতজন পুরুষ? সমাজে এদের চাহিদা কারা সৃষ্টি করেছেন? সমাজের সব স্বামীপুরুষ স্ত্রীব্রতা পতি হয়ে গেলে এমনিতেই এরা টিকে থাকবে না।

ছোটবেলা শিখেছিলাম ‘পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়’। ভোক্তা না থাকলে মিথিলাদের আর পাপের দায় নিতে হতো না। মডেলিং এবং নৃত্য ছাড়া ভোক্তারা যাকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করছেন, সে পাপ প্রসঙ্গেই এ কথা বলা। এ কথাটি হয়তো অনেকেরই অজানা যে, সৌদি আরব থেকে অসংখ্য নারী প্রতিবছর হারিয়ে যায়। তাদের আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই এই আমরা যে ধরনের পেশাকে নেতিবাচক পেশা হিসেবে গণ্য করি, সে পেশাটিও সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন রয়েছে।

তাই পাপ-পুণ্যর কথা আমি কারে বা সুধাই? কোনটি পাপ, কোনটি পুণ্য সেটি না হয় যাঁরা পাপ করছেন, তাঁরাই বুঝে নেবেন। কারণ, সমাজ তাঁদের বসে বসে ভাতা দেবে না। তা ছাড়া যার যার পাপের ভাগি তো তাঁরা নিজেরাই হবেন। আর যেসব পুরুষ সমাজের পুরুষদের অধঃপতিত হওয়ার জন্য এদের দায়ী করছেন, তাঁদের নৈতিক ও চারিত্রিক অবস্থান এতটাই ঠুনকো এবং স্পর্শকাতর হবে কেন যে এহেন নারীদের দেখলেই তাঁদের নৈতিক অবস্থান থেকে স্খলিত হয়ে যেতে হবে?

সমাজের প্রয়োজনে সৃষ্ট পেশা অনেকটাই নির্ভর করে সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি সমাজের প্রয়োজনীয়তা ও স্থিতিশীলতার ওপর। পরিতাপের বিষয়, আমরা এতটাই নিষ্ঠুর ও নির্মম যে মিথিলার আত্মহত্যার কারণ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে তাঁর শরীরের ওপর আক্রোশে ঘৃণা ছড়াচ্ছি। অনেক নারীবাদীকেও দেখলাম, তাঁর মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে তাঁর পেশার দিকে এবং শরীরের দিকে কাদা ছুড়ে দিতে। আর পুরুষরা তাঁকে পাপী হিসেবে ট্রিট করে তাঁর আত্মহত্যা বিষয়টিকে বৈধতা দিয়ে দিচ্ছেন।

কেউ কেউ যদি মনে করেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তাঁর আত্মমর্যাদার বিষয়টি প্রাধান্য না দিয়ে সীমা লঙ্ঘন করেছেন, তারপরও তাঁর এই কথিত সুইসাইড আসলেই সুইসাইড কি না, তা ক্ষতিয়ে না দেখলে এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে আগামীকাল। স্বামী হওয়ার দাবিতে বল প্রয়োগ করে মিথিলার পাসওয়ার্ড নিয়ে এবং তা ব্যবহার করে কেউ হত্যাকে আত্মহত্যা বলে স্ট্যাটাস দিয়েছেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা সময়ের দাবি। আমাদের সমাজে এখন আত্মহত্যার দুর্ঘটনা ধারাবাহিক নাটকের মতো হয়ে গেছে।

কথিত আত্মহত্যার তালিকা হয়তো কয়েক দিন পর এতটাই দীর্ঘ হয়ে যেতে পারে যে এ লাইনে আসতে ও আলোচনায় ফোকাস হতে তারকাদের লাইনে দাঁড়াতে হবে। এসব তারকা শিক্ষিত, আত্মনির্ভরশীল, পরিচিত অবস্থান এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতা গড়ে তুলতে সক্ষম হলেও সামাজিক মূল্যবোধ ও নারীর প্রতি বৈষম্যের কারণে এখনো তাঁরা চেতনাগতভাবে পুরুষতন্ত্রের দেয়াল ভেঙে নিজেদের মুক্ত করতে পারেননি।

ভারতে এই তালিকায় রয়েছেন সিল্ক স্মিতা, দিব্যা ভারতী, জিয়া খান, বাংলা নাটক ‘বালিকা বধূর’ নায়িকা প্রত্যুশা ব্যানার্জি, বাংলাদেশের মিতা নূর এবং সবশেষে সাবিরা হোসেন। মিথিলা হয়তো জানতেন না, যা তিনি যা ভালোবাসা ভেবেছেন, তা আসলে ভালোবাসা ছিল না। ছিল সুন্দর শরীর উপভোগের একচ্ছত্র চুক্তি। আমাদের দেশে হতভাগ্য নারী নিজেরাই নিজের শরীর মন উপভোগ করতে পারে না।

তাঁরা জানেন না তাঁর শরীরটি সবচেয়ে আগে একান্তই তাঁর নিজের। কিন্তু তাঁকে শেখানো হয়েছে তাঁর শরীর-মনের মালিক তিনি নিজে নন। নারীর জীবন সৃষ্টি হয়েছে পুরুষের শান্তি তৃপ্তির জন্য, তাই সমাজ-সংস্কৃতি থেকে সুবিধা পাওয়া পুরুষরা, কখনো স্বামীরা উল্লাসে সে শরীর হত্যা করে নির্দ্বিধায়। নির্ভয়ে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে ঝুলিয়ে দেয় সিলিং ফ্যানের সঙ্গে।

আসলে সময় এসেছে সবকিছু ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলার। কারণ তারুণ্যের এই ক্ষয় আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। নারীদের আত্মহত্যার বিষয়ে সতর্কতা ও সচেতনতামূলক শিক্ষা দিতে হবে। ভালোবাসা, বিয়ে-সংসার, শ্বশুরবাড়ি বিষয়ে প্রয়োজনে বিবাহ-পূর্ববর্তী সময়ে প্রশিক্ষণ কাউন্সেলিং এবং নির্দেশনা গ্রহণ করা খুব বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

ফলে এ ধরনের সচেতনতা ও সতর্কতা নারীর নৈতিকতা গঠনে ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সাহায্য করবে। নারীদের বুঝতে হবে, আসলে বিয়ের আগের ভালোবাসা আর বিয়ের পর বাস্তব জীবনের বোঝাপড়া অনেক জটিল বিষয়। তাঁদের অনুভব করতে হবে, যে সম্পর্ক ভালোবাসার প্রলোভন নিয়ে হাতছানি দেয়, সে ভালোবাসায় প্রতিশ্রুতি আর সম্পর্কের পরস্পরের অনুভূতিকে সম্মান করার মূল ভিত্তিটি সুদৃঢ় কি না।

যেখানে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকে না, সেখানে এমন ঘটনা ঘটবে মহামারীর মতো। নারীকে বুঝতে হবে শুধু শারীরিকভাবে নারী হলেও মানসিকভাবে চারদিকে শুধুই পুরুষ। ঘরে ঘরে নারীর অবয়বে শাশুড়ি-ননদরা ঘুরে বেড়ায় পুরুষতান্ত্রিক চেতনায়। মিথিলার কথিত সুইসাইডের মূল কারণ হিসেবে অনেকে পেশাজীবনের ব্যর্থতাকেই ধরে নিয়েছেন।

ভারতের অভিনেত্রী সিল্ক স্মীতার মতো হতাশা থেকেই এ ঘটনা ঘটেছে, হুট করে এ ধরনের সিদ্ধান্তে চলে আসা অযৌক্তিক। এখানে মঞ্চস্থ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনেকভাবেই হতে পারে। প্রকৃত কারণ না খুঁজে তাঁর পেশাকে বা জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে গালির ন্যায় কুৎসিত মন্তব্য ছুড়ে দেওয়া নির্মমতা। জীবন থাকতে যার এত কদর, মুহূর্তে তাঁর শরীর শব হয়ে গেলে মানুষ নামের প্রকৃত শকুনের চেহারাই আসলে উন্মুক্ত হয়ে প্রতিভাত হলো।

পাপ করেছে বলে মরেছে, খুব ভালো হয়েছে, এমন কথাও একজন মানবিক মানুষ হয়ে বলা নির্মমতা। কোনটি পাপ আর কোনটি পুণ্য, সেটি নির্ধারণ করার আমি বা আপনি কেউ নই। শুনেছি মিথিলা কয়েক মাস আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। পেশা পালনের পরও হয়তো স্বামী-সংসার নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন। যে স্বপ্ন বিয়ের পর কঠিন নির্মমতা আর বাস্তবতায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে।

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ ভুলে গেছেন, কয়েক মাস আগেই একজন পুরুষ বদরুল খাদিজাকে কীভাবে কুপিয়েছিল। আমাদের দেশের পুরুষগুলো সমাজ থেকে এই প্রশ্রয় নিয়ে বড় হয় যে, বিয়ের পর স্বামীর হাতে স্ত্রীর নিয়ন্ত্রণের চাবি থাকবে। আসলে খুব দুঃসময় পার করছে আমাদের নারীরা। তাই শিক্ষার গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের আত্মমর্যাদা ও আত্মরক্ষার কৌশল শিখতে হবে।

পুরুষের ভালোবাসা চেয়ে ব্যর্থ হওয়া অথবা তাঁদের চোখে ধোয়া তুলসী পাতা হওয়ার জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া জীবনের অপচয় মাত্র এবং পুরুষতন্ত্রের হাত শক্তিশালী করারই নামান্তর। এই মেয়েগুলো বাইরে স্বাবলম্বী হয়েও ভালোবাসার ভীত ভালোভাবে না বুঝেই ভালোবাসা পাওয়ার জন্য অন্ধের মতো ঝাঁপ দেয় নদীতে। মেয়েটি শেখেনি অন্যের জন্য নয়, আগে নিজের জন্য বাঁচতে শিখতে হয়। পেশা পালনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাপনে আত্মমর্যাদাও লালন করতে হয়।

এত আধুনিক একটি মেয়েটি কি বুঝত না যে আত্মহত্যা করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধুই তাঁর নিজের বাবা-মা? কারো কি মনে হচ্ছে না যে মেয়েটিকে তীব্র ঘৃণা আর অপবাদ ছুড়ে না দিয়ে খুব সন্তর্পণে একবার সবার ভাবা উচিত একটি জীবন কেন অন্যের ভালোবাসার অভাবে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে? মেয়েটির মৃতদেহের ওপর কলঙ্ক না ছুড়ে দিয়ে এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করাই এখন মুখ্য নয় কি? লেখক : নারী ও শিশু অধিকারকর্মী।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *