পিতা-মাতার ভরণ পোষণ প্রসঙ্গে

545

দিলরুবা শারমিন: কুমিল্লা আদালতে এক বয়স্ক মানুষ বসে আছেন। ঠিক কার কাছে এসেছেন কেউ জানেন না। একটু উপযাচক হয়েই জানতে চাইলাম– কি মামলা আছে? খুব উদাসভাবে আমার দিকে তাকিয়ে তারপর একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললো, নাই। তবে করতে চাই। জানতে চাইলাম কার বিরুদ্ধে?

কে কি ক্ষতি করেছে আপনার? দীরণ-শীরণ সেই হতাশ বয়স্ক মানুষটি আরো জোরে শ্বাস নেবার চেষ্টা করে বললো– আমি। আমার ছেলে-মেয়ে। কথাটা শুনে একটু চুপ করেই থাকলাম নইলে যদি আবার ভাবে “উকিল মামলার গন্ধ পেয়ে লোভে পড়েছে”! কিছুক্ষণ পর তিনিই আমাকে বললেন– সন্তান জন্ম দিয়েছিলাম অনেক আশা করে। লেখাপড়া শিখিয়ে ভুল করেছি। এখন কেউ আমার খোঁজ নেয় না।

পরিচয় দেয় না। এই বয়স্ক মানুষটির ছেলে–মেয়ে–বউ–জামাই–নাতি–পুতি সবই আছে। শুধু কেউ নেই তার! পরে ভদ্রলোক “পিতামাতার ভরণ–পোষণ আইন ২০১৩ (৪৯ নং আইন) এর অধীনে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট এর কাছে মামলা দায়ের করেন। এছাড়া তার আর কোন পথ ছিলো না। ছেলের বউ তাকে সহ্য করতে পারে না।

জামাই তো প্রশ্নই ওঠে না। নাতি–পুতি পরিচয় জানে না তাদের দাদা/নানা কে এই রকম শত সহস্র অভিযোগ– অভিমান আর না পাওয়ার তীব্র ব্যথা–বেদনা–যন্ত্রনা!!! আমরা স্বীকার করি বা নাই করি– আজো আমাদের দেশে ঘরে ঘরে এই রকম অসংখ্য বয়স্ক মানুষ এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তাই হঠাৎ করে কিছু শব্দ আমরা শুনছি “বৃদ্ধাশ্রম “প্রবীন হিতৌষি “বয়স্ক ভাতা”! ভালো। সবই ভালো। খারাপ কেবল হ্যে যাচ্ছে আমাদের না জানা বা অজ্ঞ থাকা।

আমরা জানিই না আমাদের দেশে ২০১৩ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন আমাদের মহান জাতীয় সংসদ পাশ করতে বাধ্য হয়েছে “পিতা–মাতার ভরণ–পোষণ আইন ২০১৩” এটা ২০১৩ সালের ৪৯ নং আইন। যেখানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- ক) “পিতা” অর্থ এমন ব্যক্তি যিনি সন্তানের জনক। (খ) “ভরণ-পোষণ” অর্থ খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গ প্রদান।

(গ) “মাতা” অর্থ এমন ব্যক্তি যিনি সন্তানের গর্ভধারিণী। (ঘ) “সন্তান” অর্থ পিতার ঔরসে এবং মাতার গর্ভে জন্ম নেওয়া সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যা।  আবার এই আইনেই বলে দিচ্ছে যে কিভাবে পিতামাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে:- (১) প্রত্যেক সন্তানকে তাহার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করিতে হইবে। (২) কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকিলে সেইক্ষেত্রে সন্তানগণ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করিয়া তাহাদের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করিবে।

(৩) এই ধারার অধীন পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করিবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার একইসঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করিতে হইবে। (৪) কোন সন্তান তাহার পিতা বা মাতাকে বা উভয়কে তাহার বা ক্ষেত্রমত, তাহাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, কোন বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদা আলাদাভাবে বসবাস করিতে বাধ্য করিবে না।

(৫) প্রত্যেক সন্তান তাহার পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখিবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করিবে। (৬) পিতা বা মাতা কিংবা উভয়, সন্তান হইতে পৃথকভাবে বসবাস করিলে, সেইক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে নিয়মিতভাবে তাহার, বা ক্ষেত্রমত, তাহাদের সহিত সাক্ষাত করিতে হইবে। (৭) কোন পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে, সন্তানদের সহিত বসবাস না করিয়া পৃথকভাবে বসবাস করিলে, সেইক্ষেত্রে উক্ত পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তাহার দৈনন্দিন আয়-রোজগার, বা ক্ষেত্রমত, মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হইতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা, বা ক্ষেত্রমত, উভয়কে নিয়মিত প্রদান করিবে।

কি একটা বাজে অবস্থায় আমরা সকলেই চলে গিয়েছি যে, আমাদের জন্ম দাতা পিতা–মাতা–নানা–নানী–দাদা–দাদী অর্থাৎ পরিবারের ময় মুরুব্বি কে আমরা কিভাবে রাখবো না রাখবো সেই শিক্ষাও আমাদের আজ আইনের মাধ্যমে নিতে হচ্ছে! সেলুকাস!!!! শুধু সেটাই নয় ভাবার সুযোগ নাই এই দায়িত্ব কেবলই একজন নারীর বা পুরুষের সেটা নয়। সন্তান মানে হলো উভয়েই।

এমন কি পিতামাতা না থাকলে নানা–নানী–দাদা–দাদীর প্রতিও এই একই দায়িত্ব অর্পণ করেছে রাষ্ট্র। আইন এর চার ধারায় বলে দিয়েছে “প্রত্যেক সন্তান তাহার:- (ক) পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদীকে; এবং (খ) মাতার অবর্তমানে নানা-নানীকে— ধারা ৩ এ বর্ণিত ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধ্য থাকিবে এবং এই ভরণ পোষণ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ হিসাবে গণ্য হইবে।

অর্থাৎ ময়-মুরুব্বিকে আর বোঝা মনে করার অবকাশ রাখেনি এই আইন। কোনো আইন যখন পাশ হয় তখন তার পাশাপাশি দণ্ডটাও আইন নিশ্চিত করে। এই আইন লঙ্ঘণের দণ্ড হিসাবে বলা হয়েছে:- ৫। (১) কোন সন্তান কর্তৃক ধারা ৩ এর যে কোন উপ-ধারার বিধান কিংবা ধারা ৪ এর বিধান লঙ্ঘন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবে; বা উক্ত অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবে।

(২) কোন সন্তানের স্ত্রী, বা ক্ষেত্রমত, স্বামী কিংবা পুত্র-কন্যা বা অন্য কোন নিকট আত্নীয় ব্যক্তি:- (ক) পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধা প্রদান করিলে; বা (খ) পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে অসহযোগিতা করিলে তিনি উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করিয়াছে গণ্যে উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত দণ্ডে দণ্ডিত হইবে। এই আইনটি লঙ্ঘন করা হলে সেটা হবে আমলযোগ্য অপরাধ তবে এটা জামিন যোগ্য ও আপোষযোগ্য ও বটে। একটি পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে রাখাই এর উদ্দেশ্য।

এই মামলা করতে আমাদের কাউকেই খুব বেশি বেগ পাবার কথা নয়। কারণ ১ম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেই বিচারটি হতে পারে। তবে পিতা/মাতা/দাদা/দাদী/নানা/নানীর কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ না পেলে কোন আদালতই এই অভিযোগ আমলে নিবেন না। এই আইনে অনেক সুযোগ আছে সন্তানকে ছাড় দেয়ার।

যেমন ধরুন অভিযোগ পাবার পর আদালত এটা আপোষ মীমাংসার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে পাঠাতে পারেন বা সমাজের উপযুক্ত কোন ব্যক্তির কাছেও বিষয়টি সমাধানের জন্য পাঠাতে পারেন। সেখানেই বিষয়টির সুরাহা হতে পারে। যা আদালত এর রায় বলেই গণ্য হবে। আইনই বড় কথা নয়।

গুরুত্ব পূরণ বিষয় হলো, আমরা ক্রমশ এক একটি যন্ত্রে পরিণত হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা আসলে যাচ্ছি কোথায়? যেখানেই যাই আমাদেরকে ফিরে আসতেই হবে আবার সেই নীড়ে। কি দরকার আইন পাশ–প্রয়োগ–শুনানি–সাজার? বরং আমরা আবার ফিরে আসি সেখানে যেখানে আমাদের শেকড়! লেখক : আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *