বাংলা ভাষা দূষণে মিডিয়া কতটুকু দায়ী?

মমিনুল ইসলাম মোল্লা: বাংলাদেশের রেডিও ও টেলিভিশন নাটক ,বিজ্ঞাপন,অন্যান্য  অনুষ্ঠান এবং চলচ্চিত্রের মাধ্যমে  বাংলা ভাষা বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে টিভি নাটকের ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অপ্রচলিত বাংলা ব্যবহার করা গেলেও কোন কোন নাট্যকার সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য নাটকের পাত্র-পাত্রীর মুখে অশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ তুলে দেন।

তরূণ-তরূণীরা এগুলো চর্চা করতে করতে ভুল বাংলা শেখে। মিডিয়াতে বাংলা ভাষার সাথে বিদেশি ভাষার মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। এ ব্যাপারে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, বাংলার সাথে অন্যান্য ভাষার মিশ্রণ নতুন কোন ঘটনা নয়। ”ভাষায় মিশ্রণ দোষের কিছু না হলেও এ মিশ্রণ যদি আমাদের ভাষাটিকে দূষিত করে তাহলে সেদিকে সকলের খেয়াল রাখা উচিত।

বাংলাদেশের বেসরকারি চ্যানেলগুলো ভারতে দেখার ব্যবস্থা না থাকলেও আমরা ভারতের বহু চ্যানেল দেখতে পাই। এগুলোর অধিকাংশই হিন্দি ভাষায়। এগুলোর মধ্যে ডোরেমন নামের কার্টুন চ্যানেলটি বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। এগুলোর মাধ্যমে বাচ্চারা হিন্দি শিখছে। বন্ধু-বান্ধবের সাথে হিন্দিতে মতবিনিময় করছে। হিন্দি শেখা দোষের কিছু নয়।

তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন-আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি তারপর ইংরেজি ভাষার পত্তন। আগে বাংলা ভাষা না শিখে কোমলমতি শিশুরা অন্য ভাষা শিখলে শুধু আপত্তি নয় বিপত্তিও ঘটতে পারে। মিডিয়ায় হিন্দি ভাষার প্রভাব সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর বলেন এভাবে চলতে থাকলে আমাদের শিশুরা বাংলা ভাষার ধ্বনি বিন্যাস ও উচ্চারণই ভুলে যাবে।

বাংলা ভাষার গৌরবকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হবে। হিন্দি ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাও আমাদের মাতৃভাষাকে দূষিত করছে। বিশেষ করে বেসরকারি রেডিও এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এর জন্য দায়ী। এছাড়া মোবাইল কোম্পানীগুলো ইংরেজি অক্ষরে বাংলায় মেসেজ পাঠায়। এত ভাষা বিকৃত হচ্ছে। আমরাও অনেকে বাংলিশে মেসেজ পাঠাই।

শুধু বাংলা ভাষা নয় অন্যান্য ভাষাও ইংরেজির কারণে  বিকৃত হচ্ছে। অনসন্ধানে দেখা গেছে-ইংরেজির সাথে চায়না মিলে চিংলিশ, পাঞ্জাবি মিলে পাংলিশ, সিঙ্গাপুরিয়ান মিলে সিঙ্গালিশ, স্প্যানিশ মিলে স্পাংলিশ, এবং ভিয়েতনামী মিলে ভিংলিশে পরিনত হচ্ছে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত প্রমিত বাংলা অনুসরণ করা। তবে এর পাশাপাশি আমাদের আঞ্চলিক ভাষার প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

ভাষাবিদগণ বলেন প্রতি ১৮ কিলোমিটার পর পর ভাষার পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। সে হিসেবে একটি জেলায় কয়েকধরণের আঞ্চলিক ভাষা থকেতে পারে। এ ভাষাগুলো বিকাশে মিডিয়া গুরুত্বপূণ   ভূমিকা রাখতে পারে। কেউ কেউ বেশ জোর দিয়ে বলছেন- রেডিও, টিভি, ও সংবাদপত্রে কিংবা টকশোগুলোতে মুখের ভাষা ব্যবহার করার জন্য। মুখের ভাষায় সংবাদপত্র পাঠ, অথবা আঞ্চচলিক ভাষায় কোন সম্পাদকীয় লেখার কথা কি ভাবা যায়? ধরা যাক আমাদের শব্দটিকোন কোন যায়গায় মোগো, আমগো, আমরার, ইত্যাদি বলা হয়।

মিডিয়া কোনটি নেবে? এক অঞ্চলের ভাষা ব্যবহার করলে অন্য অঞ্চলের লোকেরা কি মনে করবে? বাংলা বিশ্বের ৪র্থ বৃহত্তম ভাষা। এ ভাষা জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষাও হতে পারে। সিয়েরালিয়ন সহ বহু দেশে বাংলা এখন দ্বিতীয় ভাষা। তাই এ ভাষার কৃত্রিমতা রক্ষা করতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে মুখের ভাষা ও লেখার ভাষা এক নয়, কোন এলাকার শিক্ষিত মানুষের আঞ্চলিক ভাষা, অশিক্ষিত মানুষের আঞ্চলিক ভাষা এক নয়, আবার পুরুষের ভাষা ওমহিলাদের ব্যবহৃত ভাষার মধ্যেও সূক্ষ্ণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

কলকাতার এক সেমিনারে কবি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেন-সংবাদপত্রের ভাষা হওয়া উচিত সহজ-সরল। তাই কুম্বিরাশ্রু না লিখে আমাদের লিখা উচিত মায়াকান্না শব্দটি। তাহলে সবাই বুঝতে পারবে। সংবদপত্রের ভাষা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। ১৮১৭/১৮ সালে প্রথম বাংলা পত্রিকা দিকদর্শন কিংবা সমাচার দর্পনে যে বাংলা ব্যবহার করা হয়েছিল তা ১৮৩৩ সালের সাপ্তাহিক পত্রিকা সংবাদ প্রভাকর, ১৯৩৯ সালের বাংলা দৈনিক সংবাদ প্রভাকরেরর ভাষা আর আজকের “কালের কণ্ঠের” ভাষা এক নয়।

বাংলা সংবাদপত্রে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট বিভিন্ন ধরণের দিক নির্দেশনা প্রদান করে। এ প্রতিষ্ঠানটি প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষার উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়। এ ব্যপারে পত্র-পত্রিকাগুলোকে দিক নির্দেশনা দেয়। “উচ্ছেদ অভিযান টিমের উপস্থিতিতে দোকানীদের অবৈধ দোকান সরানোর চেষ্টা করতে দেখা গেলেও টিম চলে যাবার পরক্ষণেই পূর্বাবস্থা দেখা গেছে।(দৈনিক ব্রাহ্মনবাড়িয়া)। এ ও পরিবর্তে যদি লিখা হতো টিমের উপস্থিতিকালে অবৈধ দোকান সরানোতে দোকানীদের ব্যস্তভাব দেখা গেলেও টিম চলে যাওয়ামাত্রই পূর্বাবস্থা দেখা গেছে। এভাবে লিখলে পাঠক আরো সহজে বুঝতে পারতো।

”যে কথা বল্লেন পাঠকরা নিজেরাই ( প্রথম আলো ২০০৪), এটি লেখা যেত- যে কথা বল্লেন পাঠক নিজেরাই, ১০ জন ছাত্র বহিষ্কার সিদ্ধান্ত নিয়েছে (দৈনিক খবর ১৯.০৯.৮৭)। এখানে বিভক্তির ব্যবহারজনিত ভুল লক্ষনীয়। অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারকে সরানো যাবেনা, প্রধানমন্ত্রী, (ইত্তেফাক ১১.৪.২০০৮) এটি হওয়া উচিত ছিল “নির্বাচিত সরকারকে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সরানো যাবে না। কিন্তু তার আগে দেশজুড়ে ই চলছে একুশে কেন্দ্রিক অনুষ্ঠান। দিন দিনই বাড়ছে এই অনুষ্ঠান।

সোমবার হরতালের দিনও অনুষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। শহীদ মিানার বাংলা একাডেমী সব যায়গাতেই হয়েছে অনুষ্ঠান। শহীদ মিানারকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ( জনকণ্ঠ, ১৫.২.০৫) সংবাদের ইনট্রোতে ৭ বার অনুষ্ঠান শব্দবন্দটি দৃষ্টিকটু ও পঠন কষ্টসাধ্য। বিরাম চিহ্নের ভুলগুলোও লক্ষণীয়।“ মেয়েরা স্বাধীন; তবে সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। “(দৈনিক বাংলা-২১.৮.৮৭) এটি হতে পারতো মেয়েরা স্বাধীন হলেও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। বর্তমানে প্রায় সকল পত্রিকায়ই দৈনিক কিংবা সাপ্তাহিক হিসেবে বিনোদন পাতা প্রকাশিত হয়।

বিনোদন পাতার জন্য আলাদা পাঠক রয়েছেন। তারা নিজের ছেলে-মেয়ে বউয়ের খোঁজ-খবর সঠিকভাবে না রাখলেও কোন তারকা কাকে বিয়ে করেছেন কার কতটি ছেলে-মেয়ে, কোন তারকার ঘর ভাঙ্গছে, কোন তারাকা নতুন করে সংসার করছেন? কোন তারাকা টাকি মাছের শুটকি ভর্তা পছন্দ করেন, আবার কে ভুনা খিছুরি রাঁধতে ভালভাসেন তা সবকিছুই তাদের নখ দর্পনে থাকে। বিনোদন পাতার সাংবাদিকগণ পাঠকদের মন -মেজাজ বুঝে নায়ক-নাইকাদের খবরাখবর পরিবেশন করেন।

তবে মনে রাখতে হবে পাঠকদের খুশি করতে গিয়ে ভাষার অমর্যাদা করা যাবে না। অর্থাৎ সস্তা জনপ্রিতার জন্য  চটকদার ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। সুকুমার সেন বলেন সাধারণ পাঠকের উপযোগী সংবাদ ও সরস কাহিনী পরিশনের দ্বারা সাময়িকপত্রে বাঙ্গালা গদ্যের পঙ্গুত্ব ঘুচাইয়া ইহাকে প্রতিদিনের কাজকর্মের উপযোগী এবং সর্বসাধারণের উপভোগ্য রস সৃষ্টির বাহন করিয়া তোলে।

বর্তমানে সংবাদপত্রে সাধু ভাষার ব্যবহার উঠে গেছে ঢাকার ইত্তেফাক দীর্ঘদিন এবং কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক আমোদ ৫০ বছর সাধু ভাষা ব্যবহার করে  বর্তমানে চলিত ভাষার মিছিলে শামিল হয়েছে। আমরা যারা বড় হয়ে গেছি,  ভাষার ক্ষেত্রে আমরা ভাল মন্দ বিচার করে তা গ্রহণ বা বর্জণ করতে পারি। কিন্তু শিশু-কিশোররা বুঝে-না বুঝে ভাষাকে বিকৃত করছে। তাই ভাষার বিকৃতি ও অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা,  মিডিয়া থেকে শুরু করে সরকার, রাষ্ট্র, সকলের দায়িত্ব।

এ ব্যাপারে ( বিশেষ কওে বাংলিশ বন্ধে) বাংলাদেশের সংবিধানেও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। তারপরও ভাষার প্রতি আমরা যতœশীল নই। শুধু মাত্র ফেব্রুয়ারি এলেই বাংলা ভাষার প্রতি একধরণের টান অনুভভ করি , পরবর্তীততে আবার বেমালুম ভুলে যাই। ফলে ভাষার জন্য মায়া কান্না কোন কাজে আসছে না। ভাষাকে প্রকৃতভাবে ভালবাসলেই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা হবে। লেখক: প্রভাষক, ক্যাম্পেনার সিডিএলজি এবং সহকারী সম্পাদক, dristanta.com ০১৭১১-৭১৩২৫৭ কুমিল্লা, email: maminmollah@yahoo.com

This website uses cookies.