ধর্মীয় অনুসাশন মেনে চললে কমবে নারী নির্যাতন

মুহাম্মদ আবদুল কাহহার: ধর্ষণ একটি শব্দ নয়, একটি অভিশাপও বটে। নৈতিক অবক্ষয়তো বটেই, পশুবৃত্তি চরিত্রের অংশবিশেষ। ধর্ষকের কাছে ধর্ষণের খবর খুব আনন্দের। আর পাঠকের কাছে এ ধরণের সংবাদ অসুন্দর, নিন্দাবাদ, অপকথা, অশ্লীল কথা, অশালীন, ধিক্কার, ভর্ৎসনা, বেদনা, হতাশা ছাড়া কিছুই নয়।

পত্রিকা যতদিন প্রকাশিত হয়, তার মধ্যে এমন একটি দিন পাওয়া যায় না যে, যেখানে নারী নির্যাতনের কোন সংবাদ অনুপস্থিত থাকে। তাই নারী নির্যাতনের একটি পরিসংখ্যান দিয়েই আজকের মূল আলোচনায় যেতে চাই।

গত ১ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘১৪ টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যানুযায়ী ২০১৫ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে গড়ে দিনে ধর্ষণের শিকার হন প্রায় তিনজন নারী।

রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ১০৯২ টি ধর্ষণের ঘটনায় গণধর্ষণের শিকার হন ১৯৯ জন। ধর্ষণের পরে হত্যা ৮৫, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৪২ জনকে। বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা ৩৩৬ জন, রহস্যজনক মৃত্যু ১৬৭ জন, বাল্যবিয়ে ৯৪ জন, নারী ও শিশু হত্যা ৭১৪ জন, হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ৫১ জন, যৌতুকের কারণে নির্যাতন ৩৮৬, যৌতুকের কারণে হত্যা ২০৩, গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার ৭০, নির্যাতন করে হত্যা ৩০, নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা ৩ জন গৃহকর্মী, উত্ত্যক্ত করা হয়েছে ৩৬২ জনকে।

এজন্য আত্মহত্যা করছে ২২ জন, ফতোয়ার শিকার হয়েছেন ২৮ জন, পুিলশি নির্যাতনের শিকার ৩৭, শারিরীক নির্যাতনের শিকার হন ৩০২ জন, অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হন ৩৭ জন, অপহরণের ঘটনা ৯৭, নারী ও শিশু পাচারের শিকার ৬৫জন। এছাড়া যৌনপল্লীতে বিক্রি করা হয়েছে ১৮ জনকে। উপরের চিত্রটি ২০১৫ সালের।

২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছরই নববর্ষের শুরুতে এমন তালিকা প্রকাশিত হয়। নারী নির্য়াতন ও নারী অবমাননা থেমে নেই। প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। এজন্য নারী-পুরুষ, সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসক শ্রেণি-সকলেই কম-বেশি দায়ী।

আসলে তাদের দায়ী বলেই বা লাভ কী? দায়ী ব্যক্তিরা কখনোই তার দায়ভার গ্রহণ করেন না। অপরদিকে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা ততটা উন্নত নয়। ধর্ষকদের উৎসাহিত করার প্রবণতা কারো কারো মাঝে দেখা যায়।

পহেলা বৈশাখে টিএসসিতে নারী শ্লীলতাহানীর পর শাসকশ্রেণীর একজন বললেন, ‘দুষ্টুমী’। আবার কেউ কেই বলেছেন, ‘ফুলে মধু থাকলে ভ্রমর অসবেই’। এমনটিও শোনা গেছে, ‘শরীর থাকলে মাঝে মাঝে জ্বর, ব্যথা, বমি যেমন হবে, শরীর থাকলে মাঝে মাঝে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটবে এটাই স্বাভাবিক।

যে কারণে অপরাধীরা চোখের সামনে ঘুরলেও তারা শাস্তি পাচ্ছেন না। আমরা একটু পেছনের দিকে তাকালে দেখতে পাবো, গত ১ বৈশাখ বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে টিএসসি প্রাঙ্গণে নারী নির্যাতনের ঘটনা যেন অন্যসব ঘটনাকে টপকে গেছে।

কৈ, কেউতো শাস্তির আওতায় আসলো না! বিশ্বব্যাপী দিল্লি বাসে মেডিকেল ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা বিশ্বে আলোড়িত ঘটনার তালিকায় স্থান হয়েছিল। এর পরপরই বাংলাদেশে পূণরাবৃত্তি ঘটেছে। চলন্ত মাইক্রোবাসে গারো মেয়েকে ধর্ষণ করা হলো। এর কিছু দিন পর ভারতে আবারও চলন্ত বাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশে এর পূণরাবৃত্তি ঘটতে পারে, সে আশংঙ্কা থেকেই যায়। সম্প্রতি আমরা জানতে পারলাম, একজন ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে ভিকারুননিসার অভিযুক্ত শিক্ষক পরিমল জয়ধরকে চারবছর পর যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত। একই সাথে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ছয়মাসের কারাদ- দেয়া হয়েছে। এ রায়ে অনেকেই খুশি হলেও আরো বড় ধরণের শাস্তি হলে আরো ভাল হতো, সেটিও বলছেন অনেকে। পরিমলের মতো অন্যরা যদি শাস্তি পেত তাহলে অঘটন হয়তো কিছুটা কমে যেত।

একজন পরিমলকে শাস্তির আওতায় আনতে চারটি বছর পার হয়ে গেল। একটি মামলার রায় পেতে যদি ৪ বছর সময় লেগে যায়, তাহলে অন্যসব মামলার কি হবে। আদালতের এই দীর্ঘসূত্রীতা অতি শ্রীঘ্রই কমিয়ে আনতে হবে। নারী নির্যাতনের মামলার রায় দু’মাসের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও নেই তার বাস্তবায়ন। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে বলে অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতে আগ্রহী নন।

তাই এ বিষয়টি কে গুরুত্বের সাথে আমলে নেয়া উচিত। ধর্ষকের ক্ষণিকের আনন্দ ধর্র্ষীতার কাছে সাড়া জীবনের কান্না। মানুষের চরিত্রের পতন হতে শুরু করলে তখন সে যা ইচ্ছা করতে পারে। তার বিবেক বাধা দেয় না।

সমাজে যত অপরাধ সংঘটিত হয়, তার বৃহৎ অংশই পুলিশের খাতায় নিবন্ধিত হয় না। অভিভাবকরা তার ও পরিবারের নিরাপত্তা ও সম্মানের কথা ভেবেই আইনী লড়াইয়ের দিকে যেতে চান না।

শাসক দলের বড় বড় দায়িত্বে থাকা অভিভাবকরা নারী হলেও নারী নির্যাতনের বিষয়ে দ্রুত কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। নারীদেরর একটি বৃহৎ অংশ মনে করেন, নারী নির্যাতনের যতগুলো ঘটনা ঘটছে তার অধিকাংশই তার নিজের কারণ। অর্থাৎ তাদের ব্যবহার, ছোট ও স্বচ্ছ পোশাক এবং পশুবিত্ত স্বভাবের কারণেই ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে।

একজন মানুষের অঙ্গ-ভঙ্গি ও তার পোশাক অপরকে প্রথমে আকৃষ্ট করে। পোশাক যদি শালীন ও মার্জিত হয় তাহলে অধিকতর হয়রানি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। আমরা এখানেই ব্যর্থ। আমাদের পরিবার ও সন্তানগুলো পশ্চিমা সংস্কৃতি ও পোশাকগুলো পরিধান করায় অভ্যস্ত। ব্যাখ্যার অবকাশ রাখেনা যে, তাদের পোশাকগুলো অর্ধ নগ্ন কিংবা পুরোটাই নগ্নতায় ভরা।

আর বর্তমান প্রজন্ম তাদেরকেই অনুসরণ করছে বলে তাদের উগ্র চলাফেরা, নগ্নতা সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ছে। ইসলামী স্কলারগণ মনে করেন, হিজাব পরিহিত মেয়েরা ধর্ষণ কিংবা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এমন প্রমাণ নেই বলে চলে। যেসব বখাটে তরুণ প্রজন্ম নারীদেরকে উত্ত্যক্ত করে তারাও হিজাব পরিহিতদেরকে সম্মান করে থাকে।

শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে। অবৈধ সম্পর্ক কিংবা বিয়েতে রাজি না হওযায় রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ করার ঘটনা যেমন ঘটে তেমনি এটিও শুনি বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু না, এটা হতে পারে না, হতে দেয়া যায় না। পরীক্ষায় পাশ করতে, সাজেশনের লোভে, ভাল ফলাফলের লোভে কিংবা বাড়ি-গাড়ি টাকার লোভে তোমার সতীত্বকে বিকিয়ে দেয়া কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরণী, যুবক-যুবতী এক কথায় নারী-পুরুষ সবাইকেই অন্যায় থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রত্যেকেই নিজ দায়িত্বে অন্যায় থেকে ফিরে আসলে সমাজে শান্তি বিরাজ করবে। ইসলাম বলে বিয়েকে সহজ করা হলে সমাজ থেকে অন্যায় ও অশ্লীলতা কমে যাবে। অথচ এ বিষয়টি আমাদের নারীবাদী সংগঠনের প্রধান কিংবা দায়িত্বশীলরা বুঝতে চাচ্ছেন না। তারা ইসলামকে সেকেলে বলে এড়িয়ে চলে ভিন্ন পথে নৈতিকতা খুঁজে বেড়ান।

ইসলামী অনুসাশনকে বাদ দিয়ে শান্তি ও সুখি-সম্মৃদ্ধ একটি দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখা অবান্তর। প্রাপ্ত নারী-পুুরুষ উভয়ের জন্যই পর্দা করা আবশ্যক। কেননা, মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আপনি ঈমানদার পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য উত্তম পবিত্রতা রয়েছে। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ এ ব্যাপারে অবগত।

আর ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবয় তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। (সূরা নূর : ৩০)। সর্বোপরি, ধর্ষণসহ সকল প্রকার নারী নির্যাতনে মহান আল্লাহর দেয়া পবিত্র কোরআন অনুযায়ী নারী-পুরুষ উভয়ে পর্দার বিধানসহ ইসলামী অনুশাসন মেনে চললে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্পূর্ণভাবে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দান করুন। লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

This website uses cookies.