অযোগ্য শাসকদের যাতাকলে বাংলাদেশ : বিজয়ের ৪৪ বছরের সাতকাহন (পর্ব-১)

জাহিদ হাসান: এই বছরের ১৬ ডিসেম্বরে আমরা ৪৫তম বিজয় দিবস উৎযাপন করেছি। আর ৫ বছর পর আমরা ৫০তম অর্থাৎ স্বাধীনতার সূবর্ন জয়ন্তী পালন করব। ৪৪ বছরের অনেক লম্বা সময় পার করে আজ আমরা যেখানে এসে দাড়িয়েছি সেখান থেকে স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশ তথা পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার সাথে আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার যদি একটা আবেগহীন ও বস্তুনিষ্ট পর্যালোচনা ও তুলনা করতে পারি তবেই তা হবে স্বাধীনতার ৪৪ বছরের সত্যিকার মূল্যায়ন।

আত্মোপলব্ধি, আত্মসমালেচনা এবং অতীত ও বর্তমানের যুক্তিসংগত বিচার-বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই একটা জাতি তথা দেশ ভুল-ত্র“টি সংশোধন করে ভবিষ্যত অগ্রগতির জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা গ্রহন করতে পারে। অহমিকা, আবেগ-তাড়িত মনোভাব ও সান্তনামূলক আত্ম-তৃপ্তি বা সন্তুষ্টি নিয়ে আর যাই হউক বাস্তবতাকে উপলব্ধি করা, প্রকৃত সত্যকে উম্মোচন করা ও কাংখিত লক্ষ্যে কখনও পৌছানো যায়না।

স্বাধীনতার আগে নেতারা আমাদেরকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল এই বাংলা (পূর্ব বাংলা)কে “সোনার বাংলায়” পরিনত করবে অর্থাৎ আমরা অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করব, আমরা গনতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করে মানুষের মত প্রকাশের তথা বাক স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করব, মানুষে মানুষে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে একটা শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলব, সকল ধর্ম ও জাতিগোষ্টির সম-অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করব, সামাজিক ন্যয় বিচার প্রতিষ্ঠা করে মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করব, আইণের শাসন প্রতিষ্ঠা করব, বাংলা ভাষা ও বাংগালী সংস্কৃতিকে মনে প্রানে ধারন করে শ্রেষ্ঠ বাংগালী জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে দাড়াব, বাংলার শাশ্বত প্রকৃতি ও রূপকে সংরক্ষন করে এই বাংলাকে সত্যিই প্রকৃত সোনার বাংলায় সাজিয়ে তুলব।

বাংগালী জাতির উল্লেখিত স্বপ্ন, আদর্শ ও লক্ষ্য পূরনে একমাত্র বাধাই ছিল ততকালীন পশ্চিম পাকিস্তান অর্থাৎ পাকিস্তানী শাসক গোষ্টি। তাই তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম শেষে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি যার বয়স এখন ৪৪ বছর। অতএব, আজকের বাংলাদেশকে দেখতে হবে ৪৪ বছরে আমাদের শাসকরা স্বাধীনতাপূর্ব স্বপ্ন, আদর্শ ও লক্ষ্য পূরনে অর্থাৎ বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় পরিনত করার ক্ষেত্রে কতটুকু সফল হয়েছেন।

আর যদি প্রকৃত অর্থে (রাজনৈতিক বুলি হিসেবে নয়) সোনার বাংলায় পরিনত করা সফল হয়ে না থাকেন তবে দেখতে হবে, খুজতে হবে, বুঝতে ও মেনে নিতে হবে তাদের ব্যর্থতা কোথায় এবং কেন? স্বাধীনতার পূর্বে আমাদেরকে বুঝানো হয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তানের মূল অর্থনৈতিক শক্তিই ছিল আমাদের বাংলার প্রধান সম্পদ পাট, চা ও চামড়া।

আমাদেরকে বঞ্চিত করে পাকিস্তানী শাসকরা মূলত এই তিন খাতের আয় দিয়েই পশ্চিম পাকিস্তানকে গড়ে তুলছিল। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকদের কাছ থেকে পূর্ব বাংলাকে মুক্ত করে দীর্ঘ ৪৪ বছরে আমরা আমাদের পাট সম্পদকে (যাকে বলা হত সোনলী আঁশ) ধ্বংশ করেছি, বাংলার পাট চাষীরা এখন মৃতপ্রায়, পাটকে এখন তাদের গলার ফাঁশ বলা হয়, কোন কোন বছর পাট চাষীরা পাটের ন্যয্য মূল্য না পেয়ে মনের দু:খে কষ্টে-উৎপাদিত পাটকে আগুণে পুড়িয়ে ফেলে। অথচ স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৬৯ ৭০ অর্থবছরেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (আজকের বাংলাদেশের) পাটখাতে আয় ছিল ৩০০ কোটি টাকা (যা আজকের মূল্যমানে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশী)।

সারা পৃথিবীতে এখন প্লাস্টিক ও পলিথিনের পন্য ব্যবহারের পরিবর্তে প্রাকৃতিক কাঁচা মালের তৈরী পন্যের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে যেখানে আজ আমাদের নিজস্ব কৃষিজ সম্পদ পাটের চাহিদার সম্ভাবনা ছিল সবচেয়ে উজ্জল। বর্তমানে আমাদের দেশে পাট উৎপাদিত হয় বছরে ৭০-৭৫ লাখ বেল, বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাট রপ্তানী হয়েছে ২০ লাখ ৫৫ হাজার ৪৩২ বেল, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা কমে দাড়িয়েছে ৯ লাখ ২৪ হাজার ২১৫ বেল, অর্থাৎ গত ৪/৫ বছরে পাটের রপ্তানী কমেছে ৫৭%, ফলে অনেক জুট প্রেস বন্ধ হয়ে গেছে, বেকার হয়েছে হাজার হাজার শ্রমিক/কর্মচারী, কি কারণে এখন আবার সরকার পাট রপ্তানী অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত পাট খাতে দূর্নীতি, জাতীয়করনের মত ভুল সিদ্ধান্ত ও অযোগ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজীসহ দেশের বলতে গেলে সব কয়টা পাটকলকেই লোকসান দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এ মাসের ২১ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে প্রকাশ নানা সংকটে পড়ে খুলনা-যশোর শিল্প এলাকার ৩টা জুটমিল বন্ধ হয়ে গেছে, আরো কয়েকটা বন্ধের দাড়প্রান্তে, ফলে কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছে।

আমরা এখন পাটের জন্ম ইতিহাস আবিষ্কার করে বিশ্বে রেকর্ড সৃষ্টি করার প্রচার ও প্রচারনা নিয়ে পুলকিত হচ্ছি, কিন্তু প্রকৃত অর্থে পাট সম্পদের উন্নয়ন ও পাটচাষীর কল্যানের জন্য কার্যকর ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কোন লক্ষন নাই। এইতো গেল পাটের অবস্থা। স্বাধীনতার আগে যেখানে আমাদের এখান থেকে বিদেশে চা রপ্তানী হত, এখন দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য চা আমদানী করা হচ্ছে, চামড়া শিল্পও কোন রকমে টিকে আছে। বাংলাদেশ রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পন্য রপ্তানীর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে মাত্র ১২৮ কোটি ২৮ লাখ মার্কিন ডলার, কিন্তু প্রথম ৫ মাসে তা বিগত অর্থবছরের চেয়ে ১.৮১% কম।

বর্তমান ট্যানারী শিল্পকে ৪৪ বছরেও কোন সরকার ঢাকার হাজারীবাগ থেকে নির্দ্ধারিত স্থান কালিয়াকৈরে স্থানান্তর করে পরিকল্পিত ও আধুনিকভাবে পুন:স্থাপনের কাজটা সমাধা করতে পারেনি। যে পাট, চা ও চামড়ার আয় দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে গড়ে তোলা হচ্ছিল, স্বাধীনতার পর এই তিন খাত আমাদের হাতে আসার পর এই তিন খাতের আয় দিয়েত বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় পরিনত করা যেত।

আসলে বিগত ৪৪ বছরের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে আমাদের শাসকদের তথা যারা দেশ পরিচালনা করছে তাদের এই ক্ষমতা বা যোগ্যতা এমনকি ইচ্ছা ছিল বলেও আমরা বিশ্বাস করতে পারছিনা। স্বাধীনতাপূর্ব ঢাকার আদমজী শিল্পনগরী, ডেমরা শিল্পনগরী, কাঞ্চন শিল্পনগরী, নারায়নগঞ্জের ফতুল্লা/গোদনাইল শিল্প এলাকা এবং খুলনার খালিশপুর শিল্প এলাকা অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যে ছিল মূখর, এখন এসব এলাকা মৃত ও পরিত্যাক্ত। আগে আমাদের চিনি আমদানী করতে হতনা, এখন চিনিকল প্রায় সবই বন্ধ, খুলনা নিউজপ্রিন্টের কাগজই সংবাদপত্রের জন্য পর্যাপ্ত ছিল, এখন তাও প্রায় অচল। এই কি বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে চলা? লেখক:- রিয়াদ, সউদি আরব।

(প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার জন্য প্রথম সকাল ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।)

This website uses cookies.