বিজয় দিবসের জ্বালা

সিরাজী এম. আর. মোস্তাক: বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস ১৬ই ডিসেম্বরে জাতির উচ্ছসিত আনন্দ উল্লাস শুধুমাত্র ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’ নামক এক মিথ্যা ইস্যুর কারণে মর্মন্তুদ জ্বালা বা জাতীয় জ্বালায় পরিণত হয়েছে। এটি জাতি বিভাজনের ঘৃণ্য চক্রান্তেই প্রবর্তিত হয়েছিল। এর ফলে লাখ লাখ নয় বরং কোটি কোটি ছাত্র, যুবক, শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিক বিজয়ের দিনে অর্ন্তজ্বালায় ভুগছে। লাখ লাখ মেধাবী ছাত্ররা যথেষ্ট যোগ্যতা সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধা কোটাভোগী কতিপয় কম যোগ্যতাসম্পন্ন ছাত্রদের কাছে পরাজিত হয়েছে।

বিজয়ের দিনে এসব পরাজিত ছাত্ররা মর্মজ্বালা ভোগ করছে। একইভাবে লাখ লাখ উচ্চ শিক্ষিত যুবারা এ ভ্রান্ত কোটার কারণে চাকরি বাজারে অযথা বৈষম্যের শিকার হয়েছে। বিগত পাঁচ বছর যাবত শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগের কারণে দেশে বেকারের ঢল সুষ্টি হয়েছে। এ বেকাররা বিজয়ের দিনে অসহনীয় জ্বালা ভোগ করছে। বিজয় দিবসের আনন্দ তাদেরকে কাঁটা ঘাঁয়ে নুনের ছিটার মতো যন্ত্রণা দিচ্ছে। তাদের এ জ্বালা কেউ বোঝার চেষ্টা করছে না। মানবাধিকার কামিশন, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ আর সরকার সবাই অন্ধ ও মূক হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃত হতে হতে তা জ্বালায় রূপ নিয়েছে, তবু কেউ সেদিকে নজর দিচ্ছেনা।

ওরা ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতো সবাই অযথা লাফালাফি করছে। ওরা মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের মর্ম বোঝে না। বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসংখ্যবার উচ্চারণ করেছেন, ‘১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয় অর্জিত হয়েছে। তাদের ত্রিশ লাখ শহীদ হয়েছে এবং দুই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছে। তারা সবাই মুক্তিযোদ্ধা।’ বঙ্গবন্ধুর সে ভাষণ আজ মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছে। মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা ও ৪১ জন বীরাঙ্গণা তালিকাভুক্ত হয়েছে। এ দুই লাখ তালিকাভুক্তরাই এককভাবে যুদ্ধ করেছে। শুধু তারাই স্বাধীনতা ও বিজয় ছিনিয়ে এনেছে।

অন্য কারো কোনো ভূমিকা বা অবদান নেই। খোদ বঙ্গবন্ধুকেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। ‘৭১ এর ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন অমুক্তিযোদ্ধা সাব্যস্ত হয়েছে। হয়তোবা তারা যুদ্ধ করে শহীদ হননি, রাজাকারি করে প্রাণ হারিয়েছেন। শুধুমাত্র উক্ত তালিকাভুক্ত পরিবারই মুক্তিযোদ্ধা কোটাভুক্ত হয়েছে। বিজয়ের আনন্দ শুধু তাদেরই। অন্য কারো নয়। এমন মিথ্যাচারিতা আর ইতিহাস বিকৃতির কারণে শুধুমাত্র জ্ঞানী নাগরিকেরাই আজ বিজয়ের জ্বালা অনুভব করছে। শহীদদের আত্মাগুলো বঞ্চণার দহনে দগ্ধ হচ্ছে। বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মাও একই জ্বালা ভোগ করছেন।

তিনি অস্ফুট স্বরে কান্না করছেন। অলৌকিক স্বরে তিনি জাতিকে আহবান জানাচ্ছেন, ‘তোমরা নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভক্ত করোনা। অতএব, বাংলাদেশে প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা বৈষম্য দূর করা উচিত। ‘৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া উচিত। বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকার সর্বপ্রথমে রাখা উচিত। একইভাবে সকল শহীদ, আত্মত্যাগী, কষ্টভোগী, শরণার্থী এবং যুদ্ধাক্রান্ত নিরীহ বাঙ্গালী সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা উচিত। তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটা সম্পুর্ণ বাতিল করে বর্তমান ষোল কোটি নাগরিক সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তান হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। বিজয়ের আনন্দকে সার্বজনীন করা উচিত। লেখক:- এ্যাডভোকেট, ঢাকা। (মতামতের জন্য সম্পাদক বা পত্রিকা সংশ্লিষ্ট কেউই দায়ী নয়)

This website uses cookies.