সাপাহারে ঐতিহ্যবাহী জবাই বিল হতে পারে একটি মনোরম পর্যটন কেন্দ্র

44

আব্দুর রাজ্জাক (নওগাঁ) প্রতিনিধি: সাপাহার উপজেলায় আনন্দ বিনোদনের জন্য তেমন কোন উল্লেখযোগ্য স্পট নেই। আছে  প্রাকৃতিক মাছে ভরপুর প্রায় ১হাজার একর জলার  এক বিশাল ঐতিহ্যবাহী বিল। বিলটির ঐতিহাসিক আদিনাম হলো দামুর মাহিল বিল।

শিরন্টি ইউপির জবাই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা এ বিলের নামকরণ হয়েছে ঐতিহ্যবাহী জবাই বিল নামে। প্রাকৃতিক মাছে ভরপুর থাকে এই বিল। বিলে পাওয়া যায় বিশাল বিশাল বোয়াল, গজার, শৌল, চিতল, আইড়, বাইম মাছ এছাড়াও পাবদা, পুটি, টেংরা, খলিশা, চাপিলা, গাগরসহ প্রভৃতি মাছ। বর্ষা এলেই প্রাকৃতিক  মাছে ভরে ওঠে এই বিল।

সরকারী হিসাব অনুযায়ী বিলের আয়তন ৯শ ৯৯একর, তবে বর্ষকালে এর আয়তন বেড়ে প্রায় ৩ হাজার একরে দাঁড়ায়। ঐতিহ্যবাহী এই বিলের জলসীমা দক্ষিনের পোরশা উপজেলার সীমানা পেরিয়ে চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলা এবং উত্তরে সাপাহার উপজেলার শেষ প্রান্ত ও ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার তপন থানার সীমান্ত পর্যন্ত বিশাল জলরাশি দ্বারা বি¯তৃত। দৃষ্টি চলে না এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত। বিলের মুল অংশ টুকু সাপাহার উপজেলার মধ্যে রয়েছে।

জনশ্রুতি রয়েছে শীতকালে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই বিলে এসে আশ্রয় নিত। সে সময়ে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সৌখিন পাখি শিকারীরা এই বিলে পাখি শিকার করতে আসত। দেশের মানুষের নিকট সে দিক দিয়ে এ বিলের ঐতিহ্য অতি সুপ্রাচীন। ১৯৯৬ সালের পূর্বে দেশে জাল যার জলা তার নীতি সরকারী ভাবে ঘোষনা করায় এলাকার জনসাধারণ ইচ্ছেনুযায়ী  ওই বিল হতে মাছ শিকার করত। এর পর ১৯৯৯সালে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার বিলপাড়ের অসহায় মৎসজীবীদের  উন্নয়নের কথা চিন্তা করে ৩ কোটি ৫৫লাখ টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ মৎস্য প্রকল্প হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষনা দেন।

সে অনুযায়ী এলাকার প্রায় দেড় হাজার মৎস্যজীবীর একটি তালিকা তৈরী করে ২০০০ সালের ১১সেপ্টম্বর প্রাথমিক ভাবে ১৯লক্ষ  ৫০হাজার টাকার বিভিন্নœ প্রজাতির পোনামাছ অবমুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে আবারও সরকার পরিবর্তনের ফলে ২০০১সালের ২১ সেপ্টম্বর সরকারী ভাবে দ্বিতীয় পর্যায়ে বিলে পোনামাছ ছাড়ার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। ফলে ওই বিলে মৎস্যচাষ প্রকল্পটি তখনকার মত ভেস্তে গিয়ে পুনরায় জাল যার জলা তার নীতিতে চলতে থাকে।

পরবর্তীতে আবারো সরকার বদল হলে মৎস্যজীবীদের উন্নয়নে দ্বিতীয় বারের মত  প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়। এ সময় নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর সহ স্থানীয় সংসদ সদস্য সাধন চন্দ্র মজুমদার আনুষ্ঠানিক ভাবে আবারো বিলে ২০লক্ষ টাকার ৫লক্ষ  পিস পোনা মাছ দ্বিতীয় বারের মত বিলে অবমুক্ত করেন। সে সাথে বিল হতে যাতে কোন মাছ চুরি না হয় সে জন্য উপজেলা মৎস্য বিভাগকে যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহনের নির্দেশ প্রদান করেন। পুর্বের ওই তালিকা সংশোধন করে বর্তমানে বিল পাড়ের ৭৯৯জন মৎস্যজীবীদের নিয়ে ২০বছর মেয়াদী মৎস্য প্রকল্প চলছে।

এলাকার মৎস্যজীবীরা সারা বছর বিলে মাছ চাষ করে বছরে কয়েক বার বিল হতে মৎস্য আহরণ করে মাছ বিক্রির ৫%শতাংশ টাকা তাদের যৌথ একাউন্টে জমা রাখেন। বর্তমানে তাদের যৌথ একাউন্টে জমাকৃত টাকার পরিমান প্রায় ২১লক্ষ টাকা বলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাম্মী শারমীন জানিয়েছে। এভাবেই জবাই বিল প্রকল্পের মৎস্যজীবীরা এখন বিলে মাছ চাষ ও প্রকৃতিতে পাওয়া মাছের উপর নির্ভর করে তাদের জীবন যাপন করছে। এক সময় ১২মাস বিলে পানি থাকত। নল খাগড়া,পদ্ম, সিঙ্গরা, কচুরী পানার সাথে মিলে মিশে প্রাকৃতিক মাছে বিলটি পরিপূর্ন ছিল । বর্তমানে বিল এলাকায় গেলে মনেই হবে না যে এটি একটি ঐতিহ্যবাহী বিল।

সংস্কার অভাবে হাজার হাজার বছরের পুরোনো এই বিলে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা কাদা বালি ও পাহাড় থেকে নামা মাটির ধ্বসে বিলটি এখন পরিপূর্ন হয়ে গেছে। কালের আবর্তনে কোথায় হারিয়ে গেছে সেই কাঁটা যুক্ত কচুরী পানা, হারিয়ে গেছে সেই বিশাল ওজনের বোয়াল, চিতল, সৌল মাছ, হারিয়ে গেছে প্রকৃতিতে পাওয়া সেই পাবদা পুটি, টেংরা খলিসা। মাত্র কয়েক মাস বিলে পর্যাপ্ত পানি থাকলেও খরা মৌসুমে বর্তমানে সারা বিল জুড়ে চলছে ধানের চাষ। উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে বিলে এখন প্রকৃত জলার দুই তৃতীয়াংশ জমিতেই ধান চাষ করা হয় । মাঝখানের জায়গায় একটু পানি নিয়ে জবাই বিলের পুরানো স্মৃতি বহন করছে মাত্র।

ইতোমধ্যেই অনেকেই সরকারী ওই সম্পত্তির কিছু অংশের ভূয়া কাগজ তৈরী করে তা দখলে নিয়ে আছে। এই বিলের কারনে উপজেলার আইহাই, পাতাড়ী ও শিরন্টি ইউনিয়নের মানুষ সদরের সাথে বিচ্ছিন্ন থাকায় অতিকষ্টে তাদের সদরে আসতে হত । ১৯৯৬সালে তৎকালীন আওয়ামীগ সরকার আমলে এলাকার জনগনের দাবীর মুখে ৫কোটি ৮৫লক্ষ টাকা ব্যায়ে উপজেলা সদর হতে মধুইল বাজার পর্যন্ত ১৪ কিঃমিঃ রাস্তা পাকা করন ও জবাই বিলের মধ্যে ২শ’মিটার ব্রীজ এবং ৫শ’মিটার এপ্রোস  সড়ক নির্মানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বর্তমানে রাস্তা ও ব্রীজ নির্মান হওয়ায় মানুষের হাজার বছরের দুঃখ কষ্ট লাঘব হয়েছে।

এলাকার মানুষ তাদের উৎপাদিত কৃষি পন্য সহজেই বাজারজাত করতে পারছে। সচেতন মহলের ধারনা বিলের  সরকারী  সম্পত্তি সম্পুর্ন উদ্ধার করে ড্রেজিং করা বা পুনঃখনন করতে পারলে ঐতিহ্যবাহী এই জবাই বিলটি ফিরে পাবে তার পুরানো ঐতিহ্য। বিলে বারমাস মৎস্যচাষ করে বিলপাড়ের মৎস্য জীবিগনের সংসারে  ফিরে আসবে সচ্ছলতা। সে সাথে বিলের  পানি ব্যবহার করে অনেক জমিতে অধিক ফসল উৎপাদন করা যাবে। উপজেলাবাসী বিলটি পুনঃসংস্কার করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন।

উপজেলায় আনন্দ বিনোদনের তেমন কোন ব্যাবস্থা না থাকায় উপজেলার মানুষ প্রতিবছর দুই ঈদে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসেন এই বিলের পাড়ে।  একটু হলেও বিল পাড়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠে ভ্রমন পিয়াসী মানুষ । বিলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রীজে দাঁড়ালে  মনের অজান্তেই প্রকৃতির শান্তির ছোঁয়া লাগে মনে প্রাণে। উপজেলাবাসীর দাবী বিলটি পুনঃসংস্কার করে তার নাব্যতাকে পুনঃ উদ্ধারের। বিলের ধারে দর্শনার্থীদের জন্য বিশ্রামাগার, বসার স্থান,ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মান করা হলে এই বিলটি হয়ে উঠত এলাকার আনন্দ বিনোদনের একমাত্র স্পট  ও পর্যটন কেন্দ্র।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *