কলঙ্ক কিসে : যুদ্ধাপরাধে নাকি মুক্তিযোদ্ধা কোটায়?

1 (1)

সিরাজী এম আর মোস্তাক: ২২ নভেম্বর, ২০১৫ তারিখের পর থেকে সবাই বলছে, বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। আমার জিজ্ঞাসা, আমাদের কলঙ্ক কিসে, যুদ্ধাপরাধে নাকি মুক্তিযোদ্ধা কোটায়? বাংলাদেশে বর্তমানে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রায় দ্ইু লাখ। আর গেজেটভুক্ত বীরাঙ্গনা ৪১ জন। ১৯৭১ সালে এদেশে মোট বাঙ্গালী ছিল সাড়ে সাত কোটি।

বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সকল বক্তব্যে বলেছেন, ‘১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের দেশকে স্বাধীন করেছেন। তাদের ত্রিশ লাখ শহীদ হয়েছে এবং দুই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছে। তারা প্রত্যেকে মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধু সকল জনসমাবেশে উক্ত শহীদদের জন্য বিশেষ দোয়া করেছেন। তিনি মাত্র ৬৭৬ জন বিশিষ্ট বীরকে মুক্তিযোদ্ধা খেতাব দিয়েছিলেন।

অবশিষ্ট সবাইকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। তিনি শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কখনো আলাদা করেননি। বর্তমানে তার সে চেতনা সম্পুর্ণ অনুপস্থিত। মুক্তিযোদ্ধা মাত্র দুই লাখ আর বীরাঙ্গনা ৪১ জন। খোদ বঙ্গবন্ধুর নামটিও এ মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই। ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা নারী তো অনেক দূরে।

কোটি কোটি যুদ্ধবিধ্বস্ত সাধারণ বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত না হয়ে বরং রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী বা মানবতা বিরোধী অপরাধী হয়েছে। অন্যদিকে হাজার হাজার নর-পিশাচ পাকিস্তানী সেনারা সম্পুর্ণ নিরপরাধ হয়েছে। এটা কি কলঙ্ক নয়? কিন্তু কেন এ কলঙ্ক? বঙ্গবন্ধু কি মুক্তিযোদ্ধা নন? তিনি কি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন না? তার নামটি কেন মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই? তার মহান ভূমিকা কেন মূল্যায়ণ হয়নি?

১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চে তিনি ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে পাকবাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। তিনি কি ইচ্ছাকৃতভাবে আটক হয়েছিলেন? কখনো নয়। তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল বা ব্যরিষ্টার আমিরুলদের মতো সেদিন তিনিও যদি আত্মগোপন করতেন, তাহলে শুধু তাকে খুঁজতেই কসাই পাকবাহিনী দেশের সকল সাধারণ বাঙ্গালীকে নির্দয়ভাবে হত্যা করতো। শুধু এ চিন্তায়ই আমাদের বাঙ্গালী দরদী পিতা সেদিন স্বেচ্ছায় নিজেকে পাক বাহিনীর কাছে ধরা দিয়েছিলেন।

কি মহৎ তার চেতনা! অথচ দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকার মধ্যে তার নাম নেই। এটা অবশ্যই কলঙ্কের বিষয়। বাংলাদেশে যে দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা ও ৪১ বীরাঙ্গনা তালিকাভুক্ত রয়েছেন, শুধু তারাই আমাদের দেশকে স্বাধীন করেছেন। শুধু তারাই মুক্তিযোদ্ধা। তাদের জন্যই মুক্তিযোদ্ধা কোটা বরাদ্দ। তাদের পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্তুতিও এ কোটাভুক্ত। বাংলাদেশের সকল নিয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চিকিৎসা, সম্মানী ভাতাসহ সর্বত্র এ কোটা সুবিধা বিস্তৃত। তারা ভিন্ন অন্য কেউ মুক্তিযোদ্ধা নয়।

লাখ লাখ শহীদ ও সম্ভ্রমহারা নারীও মুক্তিযোদ্ধা নয়। বরং সবাই রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধী অপরাধী বটে। ত্রিশ লাখ শহীদেরা রাজাকারি করেই শহীদ হয়েছেন। দুই লাখ নারী পাকবাহিনীকে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ও পাঁচ লাখ বাঙ্গালী রাজাকার হিসেবে পাকিস্তানে বন্দি বা অবরূদ্ধ ছিলেন। প্রায় এক কোটি বাঙ্গালীও রাজাকার ছিলেন বিধায় শত কষ্ট করেও ভারতে শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করেছেন। আর অবশিষ্ট যুদ্ধাক্রান্ত কোটি কোটি অসহায় বেসামরিক বাঙ্গালী যুদ্ধকালে রাজাকার বা পাকবহিনীর সহযোগী হিসেবে দেশে ছিলেন।

তারা রাজাকার না হলে পাকবাহিনী অবশ্যই তাদেরকে হত্যা করতো। তাই তারা ছলে-বলে কৌশলে রাজাকারি করেই পাকবাহিনীর হাত থেকে আত্মরক্ষা করেছেন। এটা  জাতির জন্য নিত্যন্তই কলঙ্কের বিষয়। এ কলঙ্ক থেকে অবশ্যই মুক্তি দরকার। তারা কিভাবে আত্মরক্ষা করেছেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। অতএব, জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা দরকার।

বঙ্গবন্ধুসহ সকল বাঙ্গালীকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বাইরে রাখাটাই কলঙ্কের, নাকি দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা ভিন্ন অন্যদেরকে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করাই কলঙ্কের, তা ভেবে দেখা দরকার। আমাদের জাতীয় কলঙ্ক মোচন করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটাভোগীদের সুবিধা আরো অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি করে অবশিষ্ট সবাইকে যুদ্ধাপরাধী কোটাভুক্ত করা যায় কিনা, তাও ভেবে দেখা দরকার। [email protected] (প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার জন্য প্রথম সকাল ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।)

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *