আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো উদাসীন : চাঁদাবাজরা বেপরোয়া : কুরবানীর পশুর হাট নিরাপত্তাহীন

01সামির সালাম: ইতোমধ্যেই কুরবানীর ঈদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় আসতে শুরু করেছে কুরবানীর পশু। শুধু রাজধানী ঢাকায় নয়, এছাড়াও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর হাট থেকে গরু যাচ্ছে দেশের বড়-বড় শহরেও। সেই গরু ধীরে-ধীরে ঢুকছে পশুর স্থায়ী হাটগুলোয়।

তবে হাটে ঢোকানোর আগে গরু ব্যাপারীদেরকে পথে পথে দিতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকা চাঁদা। বিশেষ করে রাজধানীমুখী পশু ট্রাকগুলোকে দিতে হচ্ছে বেশি। মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ, বিভিন্ন সমিতি ও বাজার ব্যবসার নামে পশু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে টাকা। পশু ব্যবসায়ীরা বলেছে, সারা বছর চাঁদা দিতে হয়। তবে ঈদকে সামনে রেখে এই চাঁদার পরিমাণ বেড়ে গেছে অনেকগুণ।

পশু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এবার অস্থায়ী হাট বসার আগেই যেভাবে সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু হয়েছে তাতে অস্থায়ী হাটগুলো শুরু হলে তা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। বাজারেও এর প্রভাব পড়বে। কুরবানীর পশু আনতে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হচ্ছে পশু ব্যবসায়ীদের। ফলে বিপাকে পড়তে হচ্ছে কুরবানীর পশু ব্যবসায়ীদের। পশু আনতে পথে পথে চাঁদা না দিলে ট্রাক থেকে গরু নামিয়ে রেখে দেয়া ঘটনাও ঘটিয়েছে চাঁদাবাজরা। এসব ঘটনা ঘটছে পুলিশের সামনেই। চাঁদাবাজদের রোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার কথা ঘোষণা করলেও বাস্তবে তার কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

ফলে একদিকে যেমন গরু ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে গরু বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। এজন্য ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুরবানীর ঈদকে সামনে রেখে এখন চাঁদাবাজরা বেপরোয়া। নানা কৌশল নিয়েও তাদের রোখা যাচ্ছে না। তবে চাঁদাবাজদের প্রতিরোধ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে মাঠে নামানোর পরিকল্পনা নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মহাসড়ক থেকে ফুটপাত, মার্কেট থেকে কাঁচাবাজার, লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, বাস টার্মিনাল সর্বত্রই চলছে চাঁদাবাজি। গরু ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি রাজধানীর ফুটপাত ও অন্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও রাজনৈতিক ব্যানারে টাকা আদায় করছে মস্তানরা। অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছে ব্যবসায়ীরা।

পুলিশ-র‌্যাবের কাছে নিরাপত্তা চেয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না। এর পাশাপাশি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলোর দৌরাত্ম্যও এবার রহস্যজনকভাবে বাড়ছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর-২০১৫ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী- রাজশাহী নগরীর সিটি বাইপাস গরুর হাটে একটি হোটেলে খাবার খেয়ে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতেই অজ্ঞান হয়ে যায় অন্তত ২৫ জন গরু ব্যবসায়ী। ৬ সেপ্টেম্বর-২০১৫ বেলা ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। অজ্ঞান হয়ে পড়াদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় ছয়জনকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

সিটি বাইপাস গরুর হাটে জাফরের হোটেলের খাবার খাওয়ার পর সেখান থেকে দেয়া টিস্যুতে মুখ মুছতেই ওই গরু ব্যবসায়ীরা অজ্ঞান হয়ে পড়ে। একজন মৃত্যুবরণ করে। এদিকে হানিফ পরিবহন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গরু ব্যবসায়ী ৩ যাত্রীকে অজ্ঞান করে ১০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গরু ব্যবসায়ী ও যাত্রীরা জানায়, পরিবহনের এক কর্মকর্তা তাদেরকে চেতনা নাশক ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করে নগদ টাকা ও মোবাইল নিয়ে নেয়। ১২ সেপ্টেম্বর-২০১৫ শনিবার বিকেল ৫টার দিকে গরু ব্যবসায়ীদের সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরে তাদের জ্ঞান ফিরলে আব্দুল আলিম নামের এক গরু ব্যবসায়ী এ ঘটনার অভিযোগ করেছে।

প্রসঙ্গত আমরা মনে করি, আশু দাআইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর য়িত্ব হচ্ছে- দেশজুড়ে জোরালো অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত, ক্ষমতাসীন সরকারের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নামে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, সব সন্ত্রাসীদের দমন করা। পাশাপাশি পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে কুরবানীর পশু আনা-নেয়া যেহেতু বাড়বে, তাই সড়ক-মহাসড়কগুলোতে নিরাপত্তা বাড়াতে বাড়তি উদ্যোগ নিতে হবে। কুরবানীর পশুর হাটে পশু ব্যবসায়ীরা প্রায় সময় টাকা লেনদেন করতে গিয়েও বিপাকে পড়ে।

অনেক সময় ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টি ও মলমপার্টির সদস্যরা সুযোগ বুঝে পশু ব্যবসায়ীদের নেশাজাতীয় কিছু খাইয়ে অচেতন করে তাদের টাকা পয়সা সব হাতিয়ে নিয়ে যায়। তারা পশুরহাট থেকে বাইরে হোটেলে ভাত-নাস্তা খেতে গেলে সেখানে অপরাধী চক্রের খপ্পরে পড়ে সব কিছুই হারিয়ে ফেলে। এসব কারণে পশু ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় খাবার হোটেল ও টাকা লেনদেনের জন্য পশুর হাটে আমরা অস্থায়ী ব্যাংক স্থাপনের প্রস্তাব করছি।

আমরা আরো মনে করি, সুষ্ঠু ও সহজভাবে কুরবানীর সম্পন্নের স্বার্থে সরকারের উচিত- পশুর হাটের স্থান নির্ধারণে রাজধানীতে জরিপের মাধ্যমে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কুরবানীর পশুর হাটের নতুন এলাকা/স্থান নির্ধারণ করা। পশুর হাটে গবাদি পশুর ঢোকার তারিখ কমপক্ষে এক সপ্তাহ নির্ধারণ করে পূর্বে থেকেই পুলিশকে দায়িত্বরত রাখা। নগদ অর্থ লেনদেন হ্রাস করার জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের বুথ স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেয়া। প্রতিটি পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন রাখার ব্যবস্থা করা।

এছাড়া নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য কুরবানীর পশুর হাটের ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন, পশুর হাটের হাসিলের টাকার হার নির্ধারণসহ দৃশ্যমান স্থানে বড় করে ব্যানার টানানোর ব্যবস্থা করা। প্রসঙ্গত সমালোচক মহল মনে করছে, যথাযথভাবে ও মহাসমারোহে পবিত্র কুরবানী পালনের পৃষ্ঠপোষকতা করার এবং কুরবানীকে অভিপ্রায় সরকারের নেই। এবং জনগণেরও নেই। জনগণ এসব বিষয়ে একদিকে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানায় না। পাশাপাশি সরকারের উদাসীনতার বিপরীতে কোনো প্রতিবাদও করে না।

অথচ বাংলাদেশের সাংবিধানিক দ্বীন হচ্ছে পবিত্র দ্বীন ইসলাম। কাজেই কুরবানীর মতো সম্মানিত ইসলামী অনুষঙ্গের প্রতি অবহেলা করলে সরকার ও জনগণ উভয়েই যুগপৎভাবে দায়ী হবে। উভয়কেই সঙ্গতকারণে ইসলামপ্রবণ হতে হবে। কুরবানী সম্পর্কে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা ও উচ্ছাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হবে এবং কুরবানীর হাট, পশু সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতা প্রমাণ প্রতিভাত করতে হবে। [email protected]

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *