বিসিএস এ প্রথম হয়েছি ভ্যাট দেওয়ার জন্য নয়

1আরিফ চৌধুরী শুভ: গত শনিবার মৌচাক থেকে ধানমন্ডি যাচ্ছি একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশের তিন টাইগার মোস্তাফিজুর রহমান, সৌম্য সরকার এবং রবিউল ইসলামকে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছেন নর্দান ইউনিভার্সিটি।

টাইগারদের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য একটু তড়িঘড়ি করে রওয়ানা দিলাম। রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম দেখে রিকসা ছেড়ে ৬ নাম্বার বাসে উঠলাম মগবাজার থেকে। ভাবলাম জ্যামের মধ্যে রিকসার যেই গতি বাসেরও তাই। জীবনের গতির সাথে ঢাকার জ্যাম আর বর্ষার মেঘও পাল্লা দিতে ভুলে না।

শুরু হলো বড় ফোটার বৃষ্টি। গাদাগাদি বাসে হঠাৎ ফোন এলো এক শিক্ষার্থীর। বৃষ্টি আর গাড়ির শব্দের কারণে ফোনের স্পিকার বাড়িয়ে কথা বলছে ছেলেটি।

বন্ধু কই তুই? বাসে। বাসে কেন?

আজ না তোর মিটিংয়ে থাকার কথা? কিসের মিটিং দোস্ত?

কেন জানিস না তুই? তাইলে কি ভ্যাট দিয়ে পড়বি? বিসিএস এ প্রথম হয়েছি ভ্যাট দিয়ে পড়ার জন্য নয়? উপরের কথপোকথন দুই বন্ধুর হলেও পুরো গাড়িতে ছড়াতে সময় লেগেছে মাত্র কয়েক মিনিট।

সবার মধ্যে কেমন একটা সরব পড়ে গেল। ৩৪ তম বিসিএস পরীক্ষায় এই প্রথম বারের মত প্রথম হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। বিসিএস এ প্রথম স্থান অর্জনকারী শিক্ষার্থী মো: ওয়ালিদ বিন কাশেম ঢাকার আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ফোনে বন্ধুর সাথে কথা বলা শিক্ষার্থীও একই ইউনিভার্সিটির। ওয়ালিদ বিন কাশেমের প্রথম হওয়ার খুশিটা এই শিক্ষার্থীর ভেতরে আবদ্ধ থাকার নয়।

কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি অনেকের মধ্যে একটি ঈষৎ দৃষ্টি আগ থেকেই রয়েছে। এই অর্জন সেই ঈষৎ দৃষ্টির জবাব। বাসে উপস্থিতির বেসির ভাগের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তারা ওয়ালিদ এর বিসিএস এ প্রথম হওয়াটা রুপকথার কাহিনী শুনছেন ছেলেটির মুখে। ৫০ উর্ধ্বে এক ভদ্রলোক ছেলেটির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন ‘শুন বেটা এক ওয়ালিদ দিয়েতো আর সংসার চলে না’।

তবে তার এই কথার পক্ষে বিপক্ষে তর্ক শুরু হয়ে গেল পুরো বাসে। ততক্ষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার এক বন্ধু ফোনে এসএমএস করেছে আমাকে সেও বিসিএস এ উর্ত্তীণ হয়েছে। তবে এসএমএস এ তার শেষ কথাটা ছিল দোস্ত তোরা এবার ফাস্ট হয়েছিস। ব্যাপারটা আর বুঝতে বাকি রইল না তোরা বলতে সে কাদের বুঝিয়েছে?

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এবং আসন এতটাই কম যে আমাদের জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরাই বাদ পড়ছেন অর্ধেক। তাহলে বাকীদের অবস্থা কি হবে? উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা একজন শিক্ষার্থীর শেষ স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় নিজেকে আবিষ্কার কারা। তখনও সে জানে না সে কি নিজেকে পাবলিক না প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় আবিষ্কার করবে। এক রকম বাদ্য হয়ে নিজের সন্তানের ভবিষ্যতর জন্য বাবা মা তখন ভিটে মাটি বিক্রি করতেও দিধা করেন না।

ছেলে ডাক্তার হবে ইঞ্জিনিয়ার হবে আর এডভোকেট হয়ে কালো কোট পরে আদালতে যাবে এমন স্বপ্ন দেখাটা আজ দোষের হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে বড়লোক হয়ে যায় আর সাটিফিকেট কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরে যারা ভাবেন তারা ওয়ালিদ বিন কাশেম কে উদাহরণ হিসাবে দেখেন না কেন? নিজের সন্তানদের অর্জনকে পাবলিক আর প্রাইভেট এর মধ্যে বিভাজন না করে উপলব্দি করতে শিখুন।

তাহলে দেখবেন ওয়ালিদ বিন কাশেমের সংখ্যা দিনদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে বেসরকারি হিসাবে বর্তমানে ৮৯ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৫৩ টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ যা মোট শিক্ষার্থীর ৬৩ শতাংশ। এই ৬৩ শতাংশের মধ্যে কেউ কৃষকের ছেলে, কেউ মুচির ছেলে, কেউ স্কুল শিক্ষকের ছেলে, কেউ মুদি দোকানির ছেলে আবার কেউ বেসিক ব্যাংকের এসির নিচে বসা বাবার ছেলে।

তালপাখার বাতাস আর এসির বাতাসের স্বাদ যেমন এক না তেমনি ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর অর্থনৈতিক কোয়ালিটি এক না। যে বাবা বেসিক ব্যাংকের তার মাসিক হিসাবটা আর স্কুল শিক্ষক বাবার মাসের হিসাবটাও এক না। একই রকম ভাবে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদন্ড এবং টিউশান ফি সমান না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে বলে মধ্যবৃত্তের একটা অংশ উচ্চ শিক্ষার গন্ডি পার হওয়ার সুযোগ পায়। না হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশান জটের অভিশাপ যেমন তাদের গায়ে লাগতো তেমনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নোংরা রাজনীতির রক্ত তার শরীর রাঙ্গাত।

মধ্যবৃত্ত শ্রেণি যদি ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা দিয়ে উচ্চ শিক্ষা নিতে পারে তাহলে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট কেন দিতে পারবে না অর্থমন্ত্রীর এমন কথার যৌক্তিকতা কতটুকু? এই অর্থবছরে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় অর্থমন্ত্রনালয় সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট বসিয়ে ইতিমধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে পড়েছেন সরকার। বেসরাকরি উচ্চ শিক্ষায় ভ্যাট কেন অবৈধ হবে না তা জানতে আদালতে রুলও জারি করা হয়েছে।

ব্যাখা চাওয়া হয়েছে অর্থমন্ত্রনালয়ের কাছে। ঈদের পর দেশ ব্যাপি শিক্ষার্থীদের সাথে অভিবাবকরাও ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে রাজপথে নামবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তাহলে কি শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ২০১০ সালের ভ্যাট প্রত্যাহারের আন্দোলনের মত কঠিন আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন নাকি সরকার তার আগেই একটি যুগান্তকারি সিদ্ধান্ত নিবেন? আবারও রক্তারক্তি অবশেষে হয়তো ভ্যাট প্রত্যাহার এমনটা হওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে সরকারকে আরেকটু চিন্তা করা উচিত।

গত ১৪ আগস্ট অর্থমন্ত্রী সিলেটে একটি সভায় গিয়ে ভ্যাট প্রত্যাহারের জন্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সত্যি দুখজনক এবং অনিবেপ্রেত। শিক্ষার্থীদের পক্ষে যেটা সম্ভব না তারাতো সেটা নিয়ে রাজপথে নামবেই। আমাদের ইতিহাসতো শিক্ষার্থীদের তাই শিখায়। যেহেতু অর্থমন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে মননীয় মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুুহিত তাই তাঁকে এমন বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কৌশলী হওয়া উচিত ছিল। সরকার মন্ত্রীদের সুল্কমুক্ত বিলাস বহুল গাড়ি কেনার সুযোগ দিচ্ছেন আর শিক্ষার্থীদের উপর ভ্যাট আরোপ করছেন এটা কি মাননীয় মন্ত্রীর উপলব্দিতে আসে না?

নাকি তিনি সেই সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না? শিক্ষা যদি মানুষের মৌলিক অধিকার হয়ে থাকে তাহলে তার উপর ভ্যাট কেন? মাননীয় মন্ত্রীর কাছে আজ সকল শিক্ষার্থী ও অভিবাবকের প্রশ্ন? শিক্ষাতো আলু পটলের মত দরাদরি করে কোন দোকান থেকে শিক্ষার্থীরা কিনছে না। অথচ বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় ভ্যাট বসানোর সময় শিক্ষাকে পন্য হিসাবে দেখানো হয়েছে। কিছুদিন আগে মননীয় শিক্ষা সচিব একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে ‘শিক্ষা যখন পণ্য’ এমন একটি টকশোতে শিক্ষাকে পন্য হিসাবে দেখার পক্ষে যুক্তি দেন।

সেই অনুষ্ঠানে শিক্ষা সচিবকে দেশের সকল শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আমি যখন প্রশ্ন করি ‘শিক্ষা কি পন্য?’ তিনি এর কোন সুদউত্তর দিতে পারেনি। শুধু বলেন ‘শিক্ষাকে পণ্য না ভাবার কারণে আমরা এতদিন সফল হইনি তাই পণ্য ভাবুন দেখবেন সফল হবেন।’ জানিনা শিক্ষা সচিব শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে কোন সফলতার কথা বলেছেন? অর্থমন্ত্রী কি জানেন সেই সফলতার কথা? বেসরকারি শিক্ষার্থীরা এখন আর পাবলিকের চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে নাই। তারাও বিসিএস এর মত পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ওয়ালিদ বিন কাশেম সেটি দেখিয়েছে।

তারাও বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছে যোগ্যতার ভিত্তিতে। লাল সবুজের পতাকা তলে তারাও গায় সোনার বাংলা। তাহলে তাদের প্রতি সরকারের এমন দৃষ্টিভঙ্গি কেন? সরকার চাইলে শিক্ষার্থীদের সন্তান ভেবে তাদের উপর অর্পিত ভ্যাট তুলে নিতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু রাজপথে ভ্যাট প্রত্যাহারের আন্দোলন সরকার চাইলেই পেটোয়া বাহিনী দিয়ে দমন করতে পারবে না কয়েক দিনেও। আমরা চাই সরকার শিক্ষার্থীদের সন্তান ভাবুক। তাদের মনে যে অসোনতোষ সৃষ্টি হয়েছে তা ঈদের আগেই মুছে যাক। শিক্ষা হোক ভ্যাট মুক্ত। লেখক:- প্রকৌশলী, সমন্বয়ক নো ভ্যাট অন এডুকেশান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *