প্রসঙ্গঃ আওয়ামীলীগে বিএনপি এবং জামায়াত নেতা-কর্মীদের যোগদান

0 (10)ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী: ইদানিং পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই একটি প্রতিবেদন চোখে পরে, সেটা হল, বিএনপি-জামায়াত নেতা কর্মীদের আওয়ামী লীগে যোগদান দেওয়ার খবর। কিছুদিন আগে দেখলাম, একাত্তরের শহীদ পরিবারের সন্তান ও সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে গ্রেপ্তার করে ফরিদপুর জেলহাজতে পাঠানো হয়েছিল। তাকে ৫৭ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

তাঁর নামে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে একটি মামলা হয়েছে। তাই সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছিলেন! তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ১০ দিনের রিমান্ড? তাও আবার একজন পঙ্গু একাত্তরের শহীদ পরিবারের সন্তান এর জন্য? ব্যাপারটি খুবই বেদনাদায়ক।

বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকার থাকতে স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের যদি এভাবে গ্রেপ্তার হতে হয় এবং হাতে হাতকড়া লাগিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড এর জন্য আবেদন করা হয়, তাহলে যে হারে বিএনপি-জামায়াত (বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষের দল) এখন আওয়ামীলীগে যোগ দিচ্ছেন তাতে আমাদের সকলের একসময় প্রবীর সিকদারের মত হাতে হাতকড়া যে পরবেনা এর কোন নিশ্চয়তা আছে?

বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগে কেউ যদি বঙ্গবন্ধুকে মন থেকে ভালোবেসে যোগদান করেন এতে আমাদের কোন সমস্যা নেই। তাদের সকলকে আমাদের আওয়ামীলীগের সমর্থকদের পক্ষ থেকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। নতুন যারা আওয়ামীলীগে যোগ দিচ্ছেন বিএনপি-জামায়াত থেকে তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা যারা অনেক পূর্ব থেকেই আওয়ামীলীগ কে সমর্থন দিয়ে আসছি (আওয়ামীলীগ বিরোধী দল যখন ছিল তখন থেকে) আমাদেরকে দলে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হবে কি? এই প্রশ্নটি আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

দলের তৃণমূলের অনেক ত্যাগী নেতা নেত্রী রয়েছেন যারা আওয়ামীলীগ বিরোধী দল থাকা অবস্থায় পুলিশি নির্যাতন, মামলা এবং হয়রানির শিকার হয়েছিলেন, যারা বঙ্গবন্ধুকে মন থেকে শ্রদ্ধা করেন এবং ভালবেসে আওয়ামীলীগের সুখ দুঃখের সাথী হয়ে আছেন এখন পর্যন্ত। যারা দেশরত্ন শেখ হাসিনার বিপক্ষে কখনো অবস্থান নেননি এরকম অনেকেই আওয়ামীলীগে এখনো আছেন। যারা বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত সৈনিক। এরকম অনেক ত্যাগী আওয়ামীলীগের শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষ রয়েছেন আমাদের চারপাশে।

এদেরকে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কিনা আমার সেটা জানা নেই। কিন্তু যারা আজ আওয়ামীলীগের শুভ দিনে ফুলের মালা নিয়ে দলে যোগ দিচ্ছেন তাদের কে আকস্মিকভাবে বেশী মূল্যায়ন করা কি হচ্ছে না? এখন প্রশ্ন হচ্ছে- বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার যে হিড়িক পড়েছে তাতে বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত সৈনিকদের দলে মূল্যায়ন আসলেই হবে কি?

যারা এখন আওয়ামীলীগে নতুন যোগ দিচ্ছেন বিএনপি-জামায়াত হতে, তারা যে ভবিষ্যতে আওয়ামীলীগ এর মাঝে আভ্যন্তরিন কোন্দল সৃষ্টি করবেন না এটার নিশ্চয়তা কে দিবেন? সম্প্রতি বিএনপি এবং জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতা সরকারি দলে যোগ দিয়েছেন। তারা সবাই আলোচিত মামলার আসামি, তাদের দ্বারা আওয়ামীলীগ এর ভাবমূর্তি ভবিষ্যতে যে নষ্ট হবেনা এ ব্যাপারে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা নেত্রী যারা রয়েছেন তারা কি কিছু ভেবে দেখেছেন? আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল।

আওয়ামীলীগ স্বাধীনতার পক্ষের দল, পাকিস্তান পন্থীদের আওয়ামীলীগে জায়গা নেই। রাজাকারদের আওয়ামীলীগে কোন জায়গা নেই, একথা আমরা সবাই জানি,কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- হত্যা ও নাশকতার মামলা আর গ্রেফতার থেকে রেহাই পেতে বিএনপি-জামায়াত নেতা কর্মীরা যারা “বিশেষ সুবিধা” নিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগে এখন যোগ দিচ্ছেন তারা তো সবাই স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তির সমর্থকদের অনুসারী ছিলেন, তাই নয় কি?

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কে সপরিবারে হত্যা করার পেছনে মেজর জিয়া জড়িত ছিলেন আমরা সকলেই সেটা জানি, সেই মেজর জিয়ার দলের অনুসারী বিএনপির নেতা কর্মীরা আজ আওয়ামীলীগে যোগ দিচ্ছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে জামায়াত-বিএনপি নেতা কর্মীদের দ্বারা দলে পরিপূর্ণ আওয়ামীলীগ স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হয়ে ভবিষ্যতে দেশের জন্য কাজ করবে, এ ব্যাপারে আমরা কতটা বিশ্বাস স্থাপন করতে পারি? যাদের মাঝে পাকিস্তান প্রেম ও যাদের মাঝে মেজর জিয়ার রাজনৈতিক নীতি ছিল তারা আজ আওয়ামীলীগের নেতা কর্মী হয়ে যে ভবিষ্যতে আওয়ামীলীগ কে সেই ৭৫ সালে নিয়ে যাবেন না এটা কি করে উড়িয়ে দেই? তাদেরকে আমরা সন্দেহর বাইরে কি করে রাখি (জামায়াত-বিএনপি থেকে আওয়ামীলীগে যোগদান করা সুবিধাবাদী নেতা কর্মীদের)?

আমরা কি খাল কেটে কুমির আনছি? নাকি দুধ কলা দিয়ে সাপ পালনের জন্য সাপের জন্য ঘর তৈরি করছি? যে সাপ দ্বারা ভবিষ্যতে দংশিত হবার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায়না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে- হত্যা ও নাশকতার মামলা আর গ্রেফতার থেকে রেহাই পেতে বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার হিড়িক পড়েছে। একথা অবিশ্বাস করার কিছুই নেই।

দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকা বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন বলে আমার ধারণা। ডজনের চাইতেও বেশী মামলার আসামী বিএনপি-জামায়াত নেতা কর্মীদের আওয়ামীলীগে ভেড়াতেই ‘যোগদান ব্যবসার দোকান’ খুলে বসেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এর কিছু নেতা। এরা কি বুঝে এদের দলে যোগদান দিচ্ছেন বা কিসের স্বার্থে আমার সেটা জানা নাই।

আমি বিভিন্ন পত্রিকায় এটাও পরেছি যে- বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের নামে যত মামলাই থাকুক না কেন তাদের আওয়ামীলীগ এর দলে নিতে এতটুকুও আপত্তি করছেন না শাসক দলের কিছু নেতারা! এক পত্রিকায় দেখলাম- সম্প্রতি বিএনপি ও জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতা সরকারি দলে যোগ দিয়েছেন। তারা সবাই আলোচিত মামলার আসামি। এদের মধ্যে রাজশাহীর পুলিশ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ও বিএনপির ওয়ার্ড কমিশনার তরিকুল ইসলাম পল্টু রয়েছেন।

যোগদানকারীদের মধ্যে জামায়াতের একজন এবং বিএনপি’র সমর্থক দুইজন উপজেলা চেয়ারম্যান ও আছেন। গত ছয়মাসের ব্যবধানে এই যোগদানকারীর সংখ্যা ২০ হাজার বলে আওয়ামী লীগ থেকে দাবি করা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক কম বলছে জামায়াত-বিএনপি। তবে আমি ধারণা করছি এর সংখ্যা ২০ হাজার বা তার অধিক হতে পারে। পত্রিকায় আরও দেখলাম- ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর শুরু হয়েছিল এ দলবদল। সেটা ত্বরান্বিত হয় ২০১৫ সালের শুরুতেই অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে।

একদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অসহনীয় হয়রানি অন্যদিকে বিরোধী জোটের গন্তব্যহীন আন্দোলন। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা বিরোধী জোটের তৃণমূল নেতাকর্মী-সমর্থকরা অস্তিত্ব রক্ষায় বাধ্য হয়েই ছেড়ে যাচ্ছেন নিজ নিজ দল। আমার প্রশ্ন আসলেই কি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার কারনে দল পরিবর্তন করে আওয়ামীলীগে যোগ দিচ্ছেন এসব নেতা কর্মী? নাকি তাদের মধ্যে অসৎ কোন স্বার্থ জড়িত?

আমার প্রশ্ন হচ্ছে এসব (converted) নেতা কর্মী দ্বারা পরিচালিত আওয়ামীলীগ ভবিষ্যৎ এ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হয়ে কাজ করবেন কি? শোনা গেছে, আওয়ামীলীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের ফুলের তোড়া দিয়ে, সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি-জামায়াত এর নেতা কর্মীরা ভিড়ছেন ক্ষমতাসীনদের ছায়াতলে। আওয়ামী লীগ এর নেতারাও দলে টেনে নিচ্ছে তাদের। আমি শুনেছি বিরোধী জোটের শক্তিক্ষয় করতে বাছ-বিচারহীনভাবেই দলে বেড়াচ্ছেন বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের আমাদের আওয়ামীলীগের অনেক নেতারা।

এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা থাকলেও বিরোধী জোটের আন্দোলনকে দুর্বল এবং তৃণমূল পর্যায়ে দল ভারি করার নানাদিক বিচার করে প্রতিপক্ষ দলের নেতা কর্মীদের দলে টানতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও অধিক উৎসাহী। আরও শোনা গেছে বিএনপি-জামায়াতের অনেকে আবার আনুষ্ঠানিকভাবে দলবদল না করলেও সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে রাজনৈতিক মাঠে চলাচল করছেন।

সুতরাং এ সংবাদটি আমাদের জন্য (যারা আওয়ামীলীগের শুভাকাঙ্ক্ষী) কি আনন্দের নাকি ভবিষ্যতে বেদনাদায়ক বার্তা বয়ে আনবে এখন সেটা দেখার জন্য আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এখন সময়ই বলে দিবে নতুন যোগদান করা নেতা কর্মীরা আওয়ামীলীগের জন্য কতটা আত্মত্যাগ করতে পারেন।আমি বেশী উদ্বিগ্ন আমাদের নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে নিয়ে।

আওয়ামীলীগ এখন ক্ষমতায়। ক্ষমতার ছায়াতলে যোগ দেবার জন্য যারা আজ বিএনপি-জামায়াত দল ছেড়ে আওয়ামীলীগে যোগ দিচ্ছেন দলে দলে, তাদের দ্বারা আমাদের নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা কতটা নিরাপদ থাকবেন তার জন্য আমি বেশী উদ্বিগ্ন। লেখকঃ ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী, কলামিস্ট ও সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গবেষক

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *