রেলের ভাড়া বাড়িয়ে দরিদ্র লোকদের শোষণ করা হচ্ছে

0 (7)প্রথম সকাল ডটকম ডেস্ক: সরকারি জমি জাতীয় সম্পদ। এ সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথ মসৃণ করা দুরূহ কোনো বিষয় নয়। আর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের জমির পরিমাণ অনেক বেশি।

এসব জমির বড় অংশই অব্যবহৃত। ফলে ক্রমে বেহাত হচ্ছে রেলওয়ের জমি। সর্বশেষ হিসাবে সংস্থাটির ১ হাজার ৮৭১ একর জমির হদিস পাওয়া যাচ্ছে না, যার বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘ল্যান্ড সার্ভে অ্যান্ড ল্যান্ড উইজ প্ল্যান’ সম্পর্কিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

রাষ্ট্রায়াত্ত সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন প্রায় ৬২ হাজার একর জমির মধ্যে অর্ধেকেরও কম জমি পরিচালনা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে সারাদেশে রেলওয়ের জমির ৩০ হাজার ৫১৪ একর ব্যবহার হচ্ছে পরিচালনা কাজে। অর্থাৎ অর্ধেক জমির কোনো ব্যবহার নেই। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৩৩ একর জমি লিজ দেয়া আছে। আর ১৩ হাজার ৪২৩ একর জমি অব্যবহৃত পড়ে আছে।

এছাড়া ৪ হাজার ৬৩৬ একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২৫৫ একর সরকারি সংস্থা ও ৩ হাজার ৩৮১ একর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দখলে। অথচ সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি ফিবছরও লোকসানে থাকছে। ফলে আশানুরূপ সেবা দিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আয় ৩৪ লাখ ৪৭ হাজার ১৬৪ টাকা, ব্যয় ৬৫ লাখ ১১ হাজার ২৪৯ টাকা, লোকসান ৩০ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫ টাকা।

২০১৩-১৪ অর্থ বছরে রেলের মোট আয় ৮০৭ কোটি ৮৯ লাখ ৬১ হাজার টাকা, মোট ব্যয় ১৭৩৪ কোটি ৩৯ হাজার এবং নিট লোকসান হয়েছে ৯২৬ কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা বলে সংসদকে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। বিগত ৫ বছরে রেলওয়ের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রে আমরা মনে করি, রেলওয়ের যে সম্পদ রয়েছে তা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করে লোকসান থেকে উত্তরণ করা সম্ভব।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সম্পদের বেশিরভাগই ব্যবহার হচ্ছে না, আবার অনেক জমি কাগজে থাকলেও বাস্তবে নেই। নিজেদের কাজে ব্যবহার করার দরকার নেই এমন জমি রেলওয়ে লিজ দিয়ে থাকে। তাছাড়া দীর্ঘদিন থেকেই দেখা যাচ্ছে রেলওয়ের জমি বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল দখল করে নিয়েছে। এই তালিকায় ব্যক্তি, রাজনৈতিক সংগঠনসহ বিভিন্ন কোম্পানিও রয়েছে।

স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও বাংলাদেশের রেলওয়ের কোনো উন্নতি হয়নি। ঝুঁকি নিয়ে চলছে রেলের যাত্রীসেবা। পুরনো ও সংস্কারহীন রেল ট্র্যাকের দৈন্যদশায় যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। এ পর্যন্ত হাজার হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ এই খাতে ব্যয় করা হলেও কোনো উন্নতি নেই যাত্রীসেবায়। সংস্কার ও উন্নয়ন না হলেও ইতোমধ্যে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে অস্বাভাবিকহারে।

বর্তমানে ২ হাজার ৮৩৫ কিলোমিটার লাইনের মধ্যে ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার লাইন খোদ রেলওয়ের বিবেচনাতেই জরুরি সংস্কার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে এ প্রয়োজন এখন পর্যন্ত পরিকল্পনার মধ্যেই আছে, বাস্তবে রূপ নেয়নি। এ ছাড়া বর্তমানে ২৮৬টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৪৪টিই মেয়াদোত্তীর্ণ এবং ৫-৬টির বেশি বগি টানার ক্ষমতা না থাকলেও এগুলো দিয়েই ২৪-২৫টি বগির ট্রেন সার্ভিস চালানো হচ্ছে প্রতিদিন।

ঝুঁকিপূর্ণ লাইন এবং ইঞ্জিনের কারণে যে কোনো সময় রেলপথে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে সূত্র জানায়। বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীসেবার মান খুবই নিম্নমানের। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রেলওয়েতে যাত্রীসেবার মান বাড়ছে। তাদের রেল বহরে দিন দিন যুক্ত হচ্ছে অত্যাধুনিক ও উন্নতমানের ইঞ্জিন ও কোচ। কিন্তু বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থা এখনও চলছে সেই ব্রিটিশ আমলের ইঞ্জিন ও কোচ দিয়ে। যার প্রায় ৭০ শতাংশের আয়ুষ্কাল এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব ট্রেন চলাচল করছে তার মধ্যে কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন ছাড়া সব ট্রেনই নোংরা। অধিকাংশ আসন ছেঁড়া ও দুর্গন্ধময়। বৃষ্টি আর টয়লেটের ময়লাপানিতে সয়লাব কামরার ফ্লোর। নড়বড়ে ও ভাঙা দরজা-জানালা। এছাড়া হকার, টোকাই, মাদক ব্যবসায়ী, অজ্ঞানপার্টি, টানাপার্টি ও ভিক্ষুকদের দাপটে অসহায় যাত্রীরা। অসহায় ছাড়পোকা আর মশার অত্যাচারেও।

সেবায় নিয়োজিতরা ব্যস্ত নিজেদের পকেট ভারি করায়, কালোবাজারে টিকিট বিক্রিতে, মাদক ব্যবসায়ী ও হকারদের কাছ থেকে বখরা উত্তোলনে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলতে হয় ট্রেনযাত্রীদের। তার উপর অধিকাংশ ট্রেনের চলাচলের শিডিউল বলে কিছুই নেই। প্রতিনিয়তই শিডিউল বিপর্যয় হচ্ছে। ট্রেনের সেবার মান বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার উল্টো ভাড়া বাড়িয়েছে।

এটা হয়েছে জনগণের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বলাবাহুল্য, রেল ছিলো দেশের কোটি কোটি দরিদ্রলোকের যানবাহন। কিন্তু সে রেলের ভাড়া বাড়িয়ে কোটি কোটি দরিদ্র লোককে নতুন করে শোষণ করা হচ্ছে ও বঞ্চিত করা হচ্ছে।

পরিবারের সাথে দরিদ্রদের যোগাযোগ কমে গেছে। বড় প্রয়োজন ছাড়া কেউ যাতায়াত করছে না। বলাবাহুল্য, একটা গণতান্ত্রিক সরকার কিছুতেই গণমানুষকে এভাবে গণশোষণ করতে পারেনা। এজন্য গণমানুষের মধ্যেই গণজাগরণের উন্মেষ হতে হবে। মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *