ঈদে ঘুরে আসেন পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বপ্নের দার্জিলিং

প্রথম সকাল ডটকম ডেস্ক: ভ্রমন প্রিয়াসী পর্যটকদের জন্য সুইজারল্যান্ড বা ভারতের স্বপ্নের তাজ মহল বেড়ানোটা অনেকটা ব্যয়বহুল হলেও পাহাড়ের সেই স্বপ্নের দার্জিলিং পার্বত্য চট্টগ্রাম কিন্তু তেমনটা দুরে নয়। নীল আকাশ, আর পাহাড় ঘেরা বিধাতার সৃষ্টি স্পর্ট গুলোর নিদারুন চিত্র ভুলার নয়। তাইতো দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে পাহাড় হয়ে উঠেছে মন হারানোর পর্যটকদের জন্য অন্যতম স্থান।

যে দিকে চোখ যাবে, শুধু রং আর রংয়ের খেলা। চোঁখের দেখাকে হঠাৎ বদলে দেবে দেখা অদেখা সব দৃশ্যপট। সর্বোচ্চ চুড়া হতে ক্যামেরার ফ্রেমে হঠাৎ মনে হতে পারে, এটি একটি ইউরোপের আধুনিক কোন ছোট্ট শহর। ঈদে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আনন্দ দিতে প্রস্তুত প্রাকৃতিক নৈসর্ঘের লীলাভূমি পর্যটককদরে মনে স্থান করে নেওয়া অন্যতম শহর রাঙামাটি। ঈদ-উল ফিতর উপলক্ষে টানা ছুটির সুযোগে লাখো পর্যটকদের পদভারে মুখরতি হয়ে উঠবে রুপের রাণী ক্ষেত পাহাড়ী জেলা রাঙামাটি। নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের অপার আঁধার পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি।

তাই পার্বত্য শহর রাঙামাটি পর্যটকদের কাছে অতি প্রিয় একটি নাম। যেকোনো ছুটিতে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা ভাবছেন? তাহলে রাঙামাটি ঘুরে আসতে পারেন। এখানে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঘুমিয়ে থাকে শান্ত জলের হ্রদ। সীমানার ওপাড়ে নীল আকাশ মিতালী করে হ্রদের সাথে, চুমু খায় পাহাড়ের বুকে। এখানে চলে পাহাড় নদী আর হ্রদের এক অপূর্ব মিলনমেলা। হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড়গুলো যেন ঢেউ খেলানো শাড়ি। আকাশের মেঘ ছুঁয়ে যায় পাহাড়ের বুক। শরৎ, হেমন্ত এবং শীতে শুভ্র মেঘের খেলাও চলে সবুজ পাহাড়ের ভাজে ভাজে।

রাঙামাটির দর্শনীয় স্থান: রাঙামাটিতে ভ্রমণ করার জন্য রয়েছে অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান। এর মধ্যে কাপ্তাই লেক, পর্যটন মোটেল, ডিসি বাংলো, ঝুলন্ত ব্রিজ, পেদা টিংটিং, সুবলং ঝর্ণা, রাজবাড়ি, রাজবন বিহার, উপজাতীয় জাদুঘর, কাপ্তাই হাইড্রো ইলেক্ট্রিক প্রজেক্ট, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। রাঙামাটি শহর ও আশপাশের স্পট: রাঙামাটিতে ঝুলন্ত সেতু, রাজবাড়ি, জেলা প্রশাসকের বাংলো, সুভলং ঝরণা, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুুর রউফের স্মৃতিসৌধ, পেদা টিং টিং, ইকো টুক টুক ভিলেজসহ দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে। এগুলো দেখার জন্য সারাদিনের জন্য বোট ভাড়া নিলে ভালো।

সাজেক উপত্যকা: এমনিতে বাংলাদেশের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ একটু বেশি। আর সে আকর্ষণকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে ‘সাজেক’ উপত্যকা। আয়তনের দিক দিয়ে দেশের বৃহত্তম ইউনিয়ন পাহাড়িয়া ‘সাজেক’। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত সাজেক এখন সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পর্যটকদের হাতের মুঠোয়। রাঙ্গামাটির হলেও এ উপজেলায় যেতে হবে খাগড়াছড়ি হয়ে। কঠিন জীবন সংগ্রামে জয়ী পাংখো-লুসাই আর ত্রিপুরাদের পরিচর্যায় টিকে আছে এখনো অনেক নান্দনিকতা।

বান্দরবন:- বান্দরবানের সবুজ পাহাড়ের বুকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান বান্দরবানের নীলগিরি। এ যেন এক কল্পনারাজ্য! এখানেই যেন সৌন্দর্যের আবেশে প্রকৃতির সান্নিধ্যে হারিয়ে যাওয়া যায় অনায়াসে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল সীমান্তে অবস্থিত বান্দরবান অনেকের কাছেই ‘বাংলার দার্জিলিং’ নামে পরিচিত। এই বান্দরবানেই নীলগিরির অবস্থান। দেশ-বিদেশের ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে এই জায়গাটির প্রতি রয়েছে অন্য রকম এক আকর্ষণ। নীলগিরির রূপ আর প্রকৃতিগত রঙ দেখে বিমোহিত হবেন যে কেউ। সুতরাং যারা বান্দরবানে ঘুরতে আসেন অথবা এখানে এসে চিম্বুক পাহাড় দেখতে আসেন তারা নীলগিরিতে কিছু সময়ের জন্য হলেও ঢুঁ মেরে যান। আমাদের দেশের দ্বিতীয় স্বাস্থ্যকর স্থান চিম্বুকের কাছাকাছি নীলগিরির অবস্থান। বান্দরবান জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪৭ কিলোমিটার।

এখানে এসে আপনি চাইলে রাত্রি যাপনেরও সুযোগ পাবেন। কেননা এখানে পর্যটন কেন্দ্রের রিসোর্ট রয়েছে। অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে বান্দরবানের পর্যটন শিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র নীলগিরির কথা এখন অনেকেই জানেন। ফলে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় নীলগিরিতে পর্যটক এখন বেড়েছে। নীলগিরিতে পর্যটনের রিসোর্টটি পাহাড়ের চূড়ায় হওয়ায় সেখানে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় মেঘ। দল বেঁধে ভেসে বেড়ানো মেঘের দেশে হারিয়ে যাওয়ার এই সুযোগ আমাদের দেশে একমাত্র নীলগিরিতেই পাওয়া যায়। এই মনোরম দৃশ্য সত্যি অবাক করার মতো! বর্ষায় মেঘ যখন দল বেঁধে ভেসে বেড়ায় তখন সড়কে চলাচল করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। দিনের বেলা তখন গাড়ির হেড লাইট জ্বালিয়ে চলতে হয়। এ সময় একটু অসাবধান হলেই এই আনন্দভ্রমণ নিরানন্দে রূপ নিতে পারে।

তাই নীলগিরি এসে সতর্ক হয়ে চলতে হবে আপনাকে। বিশেষ করে বর্ষা ও শীত মৌসুমে এটা মানতেই হবে। তখন চিরচেনা নীলগিরির অন্য চেহারা। পর্যটকেরা নীলগিরির সেই রূপ দেখতে ভিড় জমান। নীলগিরির চারপাশ জুড়ে সবুজের সমাহার। দু’চোখ যেদিকে যায় শুধু বনভূমি। এমন সবুজ দেখতে হলে আসতে হবে নীলগিরি। থাকতে হবে পর্যটন কেন্দ্রের রিসোর্টে। এর প্রতি রাতের ভাড়া কক্ষ ও সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। যেভাবে যাবেন:- দেশের যে কোনো জায়গা থেকে বান্দরবান আসা যাবে। বান্দরবান বাস স্টেশনের কাছাকাছি হোটেল হিলবার্ডের সামনে থেকে নীলগিরি যাওয়ার জন্য জীপ গাড়ি বা মাইক্রোবাস ভাড়া পাওয়া যায়। জীপ গাড়ি বা মাইক্রোবাসের রিজার্ভ ভাড়া প্রায় ৫ হাজার টাকা। দেশের এক আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হচ্ছে খাগড়াছড়ি।

চারদিকে চোখ জুড়ানো পাহাড় আর পাহাড়। এতো পাহাড়, এতো বন-বনানী পাখ-পাখালির কল-কাকলি, এতো ঝরণা আমাদের দেশের আর কোথাও নেই বললেই চলে। সুন্দরের সমারোহে ও প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে খাগড়াছড়ি অঞ্চল। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য একে করেছে আরো নয়নাভিরাম। এ ঈদে ঘুরে আসতে পারেন অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি খাগড়াছড়ি। আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র:- এটি খাগড়াছড়ির ঐতিহ্যবাহী সবচেয়ে আকর্ষণীয় সুদৃশ্য নয়নাভিরাম পর্যটন স্পট। সূর্যাস্তের পর আলুটিলা থেকে খাগড়াছড়ি দেখা অর্থাৎ রাতের খাগড়াছড়ি শহর আর এক মনোলোভা দৃশ্য। দূর থেকে দেখা যায় ঘন কালো অন্ধকারে লাখো বাতির মিটি মিটি আলো। যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা কল্পচিত্র। বলা যায়, বিনোদনপ্রেমী একজন পর্যটকের মনোআকর্ষণ উপকরণে ভরপুর আলুটিলা।

পর্যটকদের জন্য বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। রিছাং ঝরনা:- আলুটিলার পাদদেশে এ ঝরনাটি অবস্থিত। স্থানীয় মারমারা ঝরনাটিকে ‘রিছাং ঝরণা’ নাম দিয়েছেন। এ ঝরনা থেকে কিছু দূরে প্রায় ৩০ হাত উচ্চতার আরো একটি ঝরনার দেখা মিলবে। পাহাড় আর সবুজের বুক চিড়ে পড়া ঠাণ্ডা পানি অনবরত দুই ঝরনার বুক দিয়ে ছুটে চলছে। দেবতা পুকুর:-  খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে মাইসছড়ির নুনছড়িতে ৭৫০ ফুট ওপরে অবস্থিত একটি ভিন্ন প্রকৃতির স্বচ্ছ পানির অপূর্ব প্রাকৃতিক পুকুর। স্থানীয় আদিবাসী ত্রিপুরাদের মতে, পাহাড়ের ওপরের এ পুকুরের পানি কখনো কমে না এবং পানি পরিষ্কার করতে হয় না।

তাই তারা এর নাম দিয়েছেন মাতাই পুখুরি, অর্থাৎ দেবতা পুকুর। বছরের অধিকাংশ সময় পর্যটকদের আনাগোনা দেখা যায় এ পুকুরে। তবে বিশেষ করে নববর্ষে বা বৈসাবির দিনগুলোতে হাজার হাজার পর্যটকের দেখা মেলে এখানে। রহস্যময় সুড়ঙ্গ:- আলুটিলার রহস্যময় সুড়ঙ্গ পর্যটকদের আরেকটি আকর্ষণ। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এ সুড়ঙ্গের এক প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করে অন্য প্রান্ত দিয়ে বের হওয়া যায়। পাহাড়ের চোরা এ সুড়ঙ্গ দিয়ে একা ভ্রমণ যে কোনো পর্যটকের শরীর শিউরে উঠবে। সুড়ঙ্গ পেরিয়ে নিজেকে দুঃসাহসী ভাবতে ভালো লাগবে। তবে ভয়ের কোনো কারণ নেই। সুড়ঙ্গে ঢোকার জন্য মশাল পাওয়া যায়।

অরণ্য কুঠির:- খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় অবস্থিত এ বৌদ্ধ মন্দির। এখানে দেখা যাবে দেশের অন্যতম বৃহত্তম বুদ্ধ মূর্তির। অরণ্য কুঠিরে রয়েছে ৪৮ ফুট উচ্চতার বাংলাদেশের বৃহত্তম বুদ্ধ মূর্তি। বিশাল এলাকাজুড়ে সবুজের পাশাপাশি এ মূর্তি ছাড়াও আরো অনেক মূর্তির দেখা মিলবে। জেলা পরিষদ পার্ক:- জেলা সদরের জিরো মাইল এলাকায় প্রায় ২২ একর জায়গাজুড়ে এ পার্কটির অবস্থান। দুই পাহাড়ের সংযোগে এখানে রয়েছে একটি ঝুলন্ত ব্রিজ, রয়েছে বাচ্চাদের জন্য কিডস জোন, এলাকাজুড়ে রয়েছে পর্যটনি কটেজ। পার্বত্য জেলা পরিষদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ পার্ক রান্নাবান্নাসহ পিকনিক করার আদর্শ জায়গা।

তৈদু ছড়া ঝরণা:- খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা ও দীঘিনালা উপজেলার সীমান্তস্থল দূর্গম সীমানাপাড়া গ্রামে অবস্থিত তৈদুছড়া ঝরনা। আঁকা বাকা পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হবে এ ঝরনায়। অ্যাডভেঞ্চারের এ যাত্রায় যেতে যেতে আপনি দেখতে পাবেন ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রা। শেষ পর্যায়ে দেখবেন বিশাল বিশাল হাতির মাথা আকৃতির পাথরের সারি। তার পর বিশাল সেই তৈদুছড়া ঝরণা। ঝরনার সেই পানির প্রবাহ দিয়ে গেলে দেখতে পাবেন আরো একটি সুউচ্চ ঝরনা। ক্ষুদ্র নৃ জনগোষ্ঠী:- খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় বাঙালি ছাড়াও বিভিন্ন নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা সম্প্রদায় নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করছে। ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষী এসব জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন জীবন ধারা, ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সভ্যতা রয়েছে, যা সবাইকে মুগ্ধ করবে।

This website uses cookies.