রমজানের শিক্ষা ও ঈদ আনন্দ

65প্রথম সকাল ডটকম ডেস্ক: পবিত্র রমজান মাস জ্ঞান বিজ্ঞানের বিশ্বকোষ আলকুরআন নাযিলের মাস। কুরআনে রমজান ছাড়া কোন মাসের নাম উল্লেখ নেই। রমজান কোরআন চর্চার মাস সিয়াম সাধনার মাস। এমাস দোয়া কবুলের মাস। ইফতার, সেহরী, তারাবীহ এতেকাফের মাস, পবিত্র লাইলাতুল কদর রয়েছে এমাসে। রমজানকে আল্লাহর মাস বলা হয়েছে। রহমত মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজান। এমাসে বেহেস্ত খোলা থাকে দোযখ বন্ধ থাকে। শ্রেষ্ঠ দুশমন শয়তান থাকে বন্দি অবস্থায়।

রমজানের ১৭ তারিখে বিশ্ব নবী (সঃ) বদরের যুদ্ধে ইসলাম বিরোধীদেরকে চরম ভাবে পরাজিত করেন। এমাসের ১ম তারিখে ৫৮৩ হিজরীতে বায়তুল মোকাদ্দাম বিজয় হয়। ৬ই রমজানে তাওরাত ১২ রমজানে যাবুর ১৩ রমজানে ইঞ্জিল এবং লাইলাতুল কদরে কুরআন নাযিল হয়। ৮ম হিজরীর রমজান মাসে মক্কা বিজয় হয়। এ মাসেই ১ম আদম শুমারী শুরু হয়। রমজানের প্রতিটি হরফকে পৃথক করলেও চমৎকার তাত্বিক অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। যার অর্থ হল-দয়া, ক্ষমা, জামিন ,ভালবাসা, সম্পদ।

‘রমজান’ রমজ ধাতু হতে এসেছে। এর অর্থ দাহন, জালানো, পোড়ানো। অর্থাৎ এমাসে রোজার সাধনায় আত্মাকে পোড়ানো হয়, সংশোধনের জন্য। এভাবে আত্মা আলোকিত হয়। যেমন স্বর্ণকে এসিড দ্বারা পোড়ালে তা উজ্জল ও নিখুঁত হয়। রমজান হেদায়াতের মাস। শা’বান মাসের শেষ জুমায় নবী ( সঃ) ভাষন ‘‘হে মানব জাতি! তোমাদের নিকট এক মহান বরকত ময়মাস আসছে। যে মাসে এমন একরাত রয়েছে যা হাজার মাসের চাইতেও উত্তম। এমাসে রোজাকে আল্লাহ ফরজ করে দিয়েছেন’’। 0323আল্লাহ এমাসে একটি ফরজ আদায় করলে ৭০টির সওয়াব দেবেন। সকল মাসের সর্দার রমজান। আল্লাহ রমজান সর্ম্পকে বলেন ‘‘রমজান মাস এতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যেও পার্থক্য কারী রুপে কুরআন অবতীর্ন হয়েছে তাই তোমাদের মধ্যে যারা এমাস পাবে তারা যেন এমাসে রোজা রাখে এবং কেউ পীড়িত থাকলে কিংবা সফরে থাকলে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করবে- বাকারা-১৮৫। ‘‘রমজান মাসের ১ম রাতে একজন আহবানকারী আহবান করে বলেন‘‘হে কল্যানের প্রত্যাশী এগিয়ে আস।

হে অনিষ্টের প্রত্যাশী থেমে যাও। আর এমাসের প্রত্যেক রাতে আল্লাহ অসংখ্য মানুষকে দোযখ হতে মুক্তি দেন’’। ইবনে (হাব্বান) রমজান দয়ামায়া ও দানের মাস, মুমিনের জীবিকা বৃদ্ধির মাস। নবী (সঃ) বলেন ‘‘রমজানে আমার উম্মতকে ৫টি বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এক-রোজদারের মুখের দূর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশেকের চেও সুগন্ধিময়। দুই-ইফতার নাকরা পর্যন্ত ফেরেস্তারা তাদের জন্য দোয়া করে। তিন-তাদের জন্য আল্লাহ প্রতিদিন জান্নাত সুন্দর করে সাজান এবং বলেন আমার সৎবান্দা গন অচিরেই এখানে পৌঁছবে।

চার-অবাধ্য শয়তানেরা এ মাসে বন্দি থাকবে। পাঁচ-রমজান মাসের শেষ রজনীতে তাদের ক্ষমা করে দেয়া হয়। (ইমাম আহম্মদ হাদীসটি উল্লেখ করেন) তাকওয়া অর্জনের মাস রমজান। যে তাকওয়া কুরআনের অনুসারী তৈরী করে। রমজান তাকওয়ার মাস, আল্লাহর মহিমা ঘোষণার মাস। অন্যায় অসত্য রুখে দেয়ার মাস । সকল কষ্টে ও আল্লাহর বাধ্যগত থাকার মাস। রমজানে রোজাদার যা খায় তার কোন হিসাব নেই। আল্লাহ বলেন ‘‘হে ঈমানদার গন তোমাদের উপর রোজা ফরজ করে দেয়া হল যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর রোজা ফরজ করে দেয়া ছিল। যাতে তোমরা সংযমশীশ হতে পার’’। (বাকারা ১৮৩) হাদীসে আছে নবী (সঃ) বলেন-‘‘যে ঈমানের সাথে পূন্য লাভের উদ্দেশ্যে রমজানের রোজা রাখে আল্লাহ তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেবেন’’। (বুখারী মুছলিম)।100

শুধু রোজা রাখা নয় রোজাদারকে ইফতার করানো প্রসঙ্গে বলেন-‘‘যে কাউকে ইফতার করাবে তার সমপরিমাণ সওয়াব এমন ভাবে লাভ করবে যে ঐ রোজাদারের সওয়ার থেকে বিন্দুমাত্রও কমানো হবেনা। আর যে একজন রোজাদারকে পেট ভরে খাওয়াবে আল্লাহ তাকে তাঁর হাউজ হতে এমন ভাবে পান করাবেন যাতে সে জান্নাতে যাওয়া পর্যন্ত পিপাসাত হবেনা। মনে রাখতে হবে ইসলামের ৫টি স্তরের একটি রমজানের রোজা। এ রোজা অস্বীক্ষার করলে সে মুসলিম নয়। রমজানে তারাবীহ ও গুরুত্ব পূর্ণ শর্ত। তারাবীহ পড়তে না পারলেও রোজা হবে। তবে তারাবীহর আবশ্যকতা অস্বীকার করা যাবেনা। স্বয়ং রাসূল (সঃ) তারাবীহ চালু করেন। রোজাদারদের সেহরী খেতে হয়। সেহরী খাওয়া না গেলেও রোজা রাখা বাধ্যতা মূলক।

তবে ইচ্ছাকৃত ভাবে সেহরী বর্জন করা ইহুদীদের অভ্যাস। প্রিয় নবী (সঃ) বলেন ‘‘তোমরা সেহরী খাও, কারণ সেহরীতে বরকত রয়েছে। পবিত্র রমজানের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতেকাফ ও লাইলাতুল কদর। এতেকাফ মূলত-লাইলাতুল কদর তালাশের জন্য যে রাতে কুরআন নাযিল হয়েছিল। এরাত নিয়ে সরাসরি একটি সূরায় আল্লাহ উল্লেখ্য করেছেন। নবী (সঃ) গোটা জীবন এরাতের সন্ধানে এতেকাফ করেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন ‘‘রাসূল (সঃ) রমজানের শেষ দশকে ওফাতের পূর্ব পর্যন্ত ১০দিন এতেকাফ করেন। (বোখারী মুসলিম)।

এতেকাফ হচ্ছে স্থানীয় জামে মসজিদে এলাকার অন্তত একজন মুসলিম বাড়ি, সংসার ত্যাগ করে অবস্থান করা, ইবাদত করা। এ অবস্থান রমজানের শেষ দশকে হতে হবে। কেউ এতেকাফ না করলে সবাই গুনাহগার হবে। এতেকাফ সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কেফায়া। হাদীসে আছে ‘‘এতেকাফকারীকে দুই হজ্ব ও দই ওমরার সওয়াব দেয়া হবে’’। আর লাইলাইতুল কদর সম্পর্কে কুরআনে হাজার মাসের চাইতে উত্তম বলা হয়েছে। নবী (সঃ) বলেন‘ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে রাত জাগবে তার জীবনের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে’’। (বোখারী মুসলিম)। এখানে আমাদের লক্ষ রাখা চাইযে-রমজানের ফজিলত,রোজার ফজিলত,এতেকাফের ফজিলত সবই তো কুরআনের কারণেই। সেই কুরআন চর্চা ও জীবনের সকল ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়নেই প্রকৃত স্বার্থকতা ও সাফল্য আসতে পারে নচেৎ নয়।

ফিরে আসি রমজান ও রোজা প্রসঙ্গে হুজুর (সঃ) বলেন‘‘তোমরা রোজা রাখ সুস্থ থাক’’। সুতরাং রোজা দেহকে সুস্থ্য করে। রোজা কোন উপবাস নয় ইসলামের ফরজ ইবাদত। এর রয়েছে উদ্দেশ্য ডাক্তার আবরাহামা জে হেনরী বলেন ‘‘রোজা হল পরম হিতেষী ঔষুধ বিশেষ কারণ রোজা পালনের ফলে বাত রোগ বহুমূত্র অর্জীন হৃদ রোগ ও রক্তচাপ জনিত ব্যাধিতে মানুষ কম আক্রান্ত হয়”। ইসলাম অসুস্থ্য অসামর্থকে রোজা রাখা বাধ্য করেনি। সুস্থ্য মুসলমানের উপর রোজা রাখা ফরজ। রোজার উদ্দেশ্য তাকওয়া। তাকওয়া হল অপরাধমুক্ত দূর্নীতি মুক্ত ব্যাক্তি পরিবার ও সমাজ গঠন। তাকওয়া আল্লাহর ভয়ে পাপ মুক্ত থাকা।

রোজা জীবনকে সুষমামন্ডিত করে নৈতিক শুদ্ধতা ও সংশোধন ও চিন্তার বিশুদ্বতার জন্য রমজান এবং রোজা। অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলোকে পাপ হতে বাঁচিয়ে রাখাই আসল রোজা। হযরত ওমর রাঃ কে কা’ব রাঃ বলেন ‘‘আপনি কি এমন সংকীর্ন পথে হাঁটেননি যার দুদিকে কাঁটাযুক্ত গাছ’’। তিনি বলেন‘‘ হ্যাঁ হেটেছি। কি ভাবে? সাবধানে যাতে কাটা না লাগে। কা’ব বলেন এভাবে গুনাহ হতে বেঁচে থাকার চেষ্টাই তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়। এই ভয়ই রোজার উদ্দেশ্য। তাই রমজানের কঠিন সাধনার আগুনের জ্বলে বাঁকা পথের বাঁকা মতের ইসলাম বিরোধী চিন্তার সকল লোকগুলো সোজা পথে,আল্লাহর পথে কুরআনের পথে আসবে এটাই রমজানের রোজার উদ্দেশ্য।

এ উদ্দেশ্য যারা হাসিল করতে পারবে তাদের জন্য ঈদের দিনের পবিত্র আনন্দ। আসুন ঈদ সর্ম্পকে আলোপাত করি-প্রকৃত ঈদ কিন্তু ভোগে নয় ত্যাগে এত্যাগই রোজার শিক্ষা। অপরের সুখ দুখ ভাগ করে নিতে হবে। ঈদের দিনে ফিতরা দিয়ে রোজার ভূল ক্রটি যেমন মাফ হবে তেমনি গবির লোকেরা উপকৃত হবে। 7কবি নজরুলের ভাষায়-‘‘কারো আঁখি জ্বলে কারো ঝাড়ে কীরে জ্বলিবে দ্বীপ, দুজন হবে বুলন্দনসিব লাখে লাখে হবে বদনসিব এই নহে বিধান ইসলামের’’ যাকাত বসরান্তে দিতে হয়। যাকাত ব্যবস্থা ইসলামী নিয়মে চালু থাকলে প্রতিদিনই ঈদের আনন্দ পাওয়া যেত। সাম্য মৈত্রী শান্তি আর মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সওগাত নিয়ে প্রতিবছর উপস্থিত হয় ঈদুল ফিতর। এদিনে আমিত্ব থাকেনা। রমজানের ইবাদাতের আধ্যত্বিক স্বাদ ঈদের রাতের দোয়া আল্লামুখি করে। রোজার কষ্ট অন্যের কষ্টকে বোঝায়।

এ ভাবে ঈদের আনন্দ অতুলনীয় হয়ে ওঠে। ঈদ মুসলমানদের সম্মেলন। গুনাহ মুক্ত পরিবেশ। উঁচু নীচু, ধনী গরীব সবাই এককাতারে দাঁড়ায়। বিনাসুতার মালায় গেঁথে যায় সবাই। ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য, সৌহার্দ, ভালবাসা প্রাতির অনুপম দৃশ্য ঈদ। হাতে হাত বুকে বুক মিলিয়ে ভূলে যায় পারষ্পারিক দূরত্ব। নবী (সঃ)বলেন ‘‘ঈদের নামাজ সমাপনকারী নিষ্পাপ অবস্থায় ঈদের মাঠ হতে নিজ গৃহে ফিরে যায় যেন তারা নবজাতক শিশুর ন্যায় হয়ে যায়’’। ঈদুল ফিতরের খুতবায় থাকে-বিশ্ব পরিস্থিতি, দেশের অবস্থা,মুসলমানের অবস্থা, করনীয় ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের গুরুত্ব।

খুতবায় চিহিৃত করা হয় বিদ্যমান অনাচার ও তার প্রতিকারের উপায়। এলাকা,দেশ, পরিবেশ উন্নয়ন ও সমস্যার সমাধান মুলক কথা থাকে খুতবায়। অবশ্য বর্তমানে জুমা ও ঈদের খুতবায় উপরোক্ত বক্তব্য অনুপস্থিত থাকে প্রায়ই। যা জঘন্য অন্যায়। ঈদুল ফিতরের দিন নবী (সঃ) বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খেয়ে এক রাস্তায় ঈদে যেতেন অন্য পথে বাড়ী ফিরে আসতেন।

আল্লাহর পক্ষে হতে ঈদের ব্যবস্থা। নবী (সঃ) বলেন ‘‘প্রত্যেক জাতিরই আনন্দ রয়েছে এটি হল আমাদের আনন্দ (ঈদ) মুসলমানদের ইসলামের আনন্দের ও একটি নৈতিক মান আছে অন্য ধর্মের মেলা উৎসব আর ঈদ এক কথা নয়। ঐসব মেলা তামাশার বদলে ঈদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঈদের আনন্দ বস্তুগত নয় আধ্যাত্বিক। এ আনন্দ রোজাদাররাই বোঝেন।

লেবাস পোশাক ঈদের মুখ্য বিষয় নয়। তাইতো ওমর রাঃ ঈদুল ফিতর দিবসে দুয়ার বেঁধে আত্ম সমালোচনায় কেঁদে বুক ভাসিয়ে ছিলেন। ঈদে আগমন কারীদের আল্লাহ বলেন ‘‘বাড়ি যাও আমি তোমাদের মাফকরে দিলাম’’। আসুন ঈদের দিনে হিংসা দ্বেষ ভূলে যাই। দোয়া করি নিজের দেশের ও মুসলিম জাতির জন্য। রমজানের শিক্ষা বাস্তবায়ন করি। সুত্র:- ওয়েভ সাইট

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *