ন হন্যতে

জিনাত ইসলাম: আচ্ছা একজন পর্ন ষ্টার এর নাম বলুন তো! কেন সানি লিওন।এ তো মেয়ে! একজন ছেলের বলুন? ছেলে? পর্ন ষ্টার? না, না, পারলাম না। একটু ভেবে বলুন! না, পাচ্ছি না তেমন কাউকে! হ্যাঁ, পাবেন না ইন্সটান্টলি! এইটি আমাদের দোষ নয়! আমাদের মেন্টাল সেট আপ টাই এমন বিগড়েছে আমাদের ভাবনাকে। নারী মানে শরীর আর গোপনীয়তা। পুরুষ মানেই সামাজিক মর্যয়াদা আর টাকা।

এমনি করে শরীর এগিয়ে দেয় নারীকে সমাজের মননে। লিওন নামেই সিক্ত হয় পুরুষ বিবেক। আকাঙ্খ্যা ভাষা পায় স্নায়ু যন্ত্রে। গনতন্ত্রে পুরুষ কে এমনি করেই পাশ করিয়ে দেওয়া হয়। গ্রেস দিয়ে ও ফেলের কলঙ্ক মোছে না নারীর। তার ক্ষমতা, প্রতিভার আগে ছোটে তার ব্রান্ড-“মেয়েছেলে”। নারীর লক্ষন রেখা জুড়ে থাকে প্যাড কেনার সতর্কতা, কাপড়ে লাল ছাপ না পড়ার প্রশিক্ষন, ব্রা এর ফিতে বেরিয়ে পড়ার অজানা আতঙ্ক, শরীর স্পর্শ করতে পারে এমন কালো হাতের ছায়া থেকে আত্মরক্ষা-নারীর সবটাই পর্ন।

গর্ভসঞ্চার থেকে মাটির আশ্রয়ে ফিরে যাওয়া সবটাই লজ্জা লুকানোর সংগ্রাম। শরীরে ওড়না ওঠামাত্র বাড়ীতে এক অলিখিত নিষেধাজ্ঞা। বাবার গায়ে চড়া বারণ। হা-হা হাসিতে কাকুর গায়ে গড়িয়ে পড়া নিষেধ। ডাইনিং এ খেতে বসে বেশী ঝুকে পড়লে মায়ের চড়া স্বরে বকুনি, ঠিক করে বসো!তারপর ব্রা-প্যাণ্টি অন্য জামার তলায় আড়াল করে মেলে দিতে শেখা। হ্যা সবটাই পর্ন। বাসে দুই হাত তুলে রড ধরে সিট না পেয়ে কোনও রকমে ব্যালান্স রাখা ব্যাস! চোখের চাউনীতে আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে আমি শেষ।

আমি তখন সাইজের ৩৪/২৮/৩২। আমি তখন বাজারি। কখনো-সখনো ফিরতে দেরী কর্মক্ষেত্র থেকে। দাড়িয়ে বাসের টেনশন। আমার পাশে হায়না সব। ছিড়ে-খুড়ে ফেলার অপেক্ষায়। সন্দিহান দৃষ্টি। এমনটা যেন! জ্ঞান পিপাসুদের একটি ইচ্ছা ও সমাধানের রাস্তা! কেউ না থাকলে  আমরাই তো আছি।চলুন আপনাকে সারা করি!ভয়ে আতঙ্কে সেখান থেকে এক দৌড়ে জায়গা বদল।

নতুন ডেরা। দাঁড়াবার জায়গা। সিনেমার পোষ্টার এ পাউলি দাম! আরে বাব্বা! মাথা নিচু পলায়ন! একঘরে  একঘরে! শারুখ খান এর মায়া মেমসাবের সিন? সিকোয়েন্সের ডিমান্ড! আরে  বিজ্ঞাপনে শরীর বের করা নারী? এক্সপোজড! এক্ষুনি চোখ ফিরিয়ে আমি উধাও! টাওয়েল খোলা রনবীর? সো হোয়াট? বোল্ড হ্যায় ডিয়ার! একাকী নারী সে ও পর্ন। বয় ফ্রেন্ড নিয়ে একটু রাতে সে পর্ন। বিধবা নারী? ডিভোর্সী? আহারে! সেও পর্ন। বিয়ের প্রথম রাত, প্রেমিকের আব্দারে শরীর দান সবটাতেই নারী স্টার। প্রেগন্যান্সির সময় শরীর মেলে না, মন বাধা দেয়।

আহ বি মডার্ন! শিক্ষিত মেয়েদের এ কি কথা! মা হয়ে  গিয়ে নতুন প্রেমে পরা। কি জবাব দেবে? ছি,ছি, সন্তান কি বলবে? তাদের মুখের দিকে তাকাও! তোর স্বামী কাজের মেয়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে? সেকি! চুপ! কাউকে নয়, আমাদের তো সম্মান আছে সমাজে।ও যখন বুঝবে ঠিক হয়ে যাবে দেখবি! চিন্তার কিচ্ছু নেই, এমন অনেকের হয়। বড় নখ, লাল ঠোট, বেরিয়ে থাকা পিঠ, ক্লিভেজ পর্ন এর সাবভার্সন। নারীর শরীরের বিশ্ববাজার! খোলা মার্কেট! বাড়ীর মোটা কাজের মাসীকে মনে করে ও চলে ১২/১৩ বছরের ছেলের শরীর খেলা।

হোক না বিপাশা, ক্যারিনা, কলেজের দিদি, পাশের বাড়ীর বৌদি! চলুক ব্রেষ্টের উপর ঢালাও নজর!খুলে যাক ত্রিপিল এক্স  সাইট। নারী, কুকুর, পুরুষ সব যেখানে এক রাস্তায় ট্রাফিক বর্জিত। যেন চোখা দৃষ্টি বলে যতই ইনার বাড়াও, আর চুন্নী ওড়াও আই নো হোউয়ার ইস ইয়োর নিপ্পল! চোখ সরাচ্ছি না  কিছুতেই। এজলেশ বিউটি! ফ্যাব বডি! হাঁটুর বয়সী ছেলের বিছানার সঙ্গী, হাতের বালিশ, রাতের ঘুমের রসদ নারী। শরীরের শান্তি! হরমোন মুক্তি।

নারীর মন সে ও তো অন্য পুরুষের ডেরা।যদি বলি আমি আমার কলিগ এর বাইকে ফিরেছি। আঃ মরন! কেন? সে কে তোমার? লোকে কি বলবে?তার কি বৌ নেই?না আনম্যারেড। স্ত্রীয়াশ্চরিত্রাং দেব না জানি কুত মনুষ্যা! ভাল না মেয়ে একদম ভাল না! অবৈধ সম্পর্ক নির্ঘাত! যদি বলি আমার ছাত্র আজ আটকে গেছে আমার বাড়ীতে। আমেরিকায় থাকে। বাড়ীতে এসেছিল তাই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসা।হায় মাগো! সারারাত তাই বলে থাকবে? বলে কি মেয়ে? এই তুই নাকি শিক্ষিকা! পেশা থেকে অস্তিত্ব থেকে চরিত্র সবের পিন্ডদান এক থালায়! এত নৈবেদ্য রাখি কোথায়! নারী বলেই কিনা পারি!

বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে বাসে পেশাদার গোত্তাদারের কনুইবাজিতে যখন যন্ত্রনায় কাতর তখন আবার সামনের ট্রাফিক চোখ নাচিয়ে বলে কোথায় যাবে? মানে যেন যাওয়ার না থাকলে আমার সঙ্গে এসো ইচ্ছেটা অনেকটাই এমন প্রকাশ পায়। সম্পুর্ন ঢাকা শরীরে অনাবৃত এক অস্তিত্বের নাম নারী।শীতল শরীর আর গরম চেনে না! হেনস্থা হয় করুনভাবে ফুলশয্যার রাতে। কি? কখনো কোনও ফ্লিম ও দেখনি! এতটা হাঁদা! আশাই করিনি।

আই মিন হেল্প মি। ডোন্ট আস্ক মি দেন হাউ টু? আই ওয়ান্ট এক্সসাইটমেন্ট! কিন্তু কত? সেই আট বছর বয়স থেকে বিলিয়ে দেওয়া এই শরীর হারিয়ে ফেলেছে নিজের মানে।ঘরে বাইরে সংঘাত। এক অলিখিত জরুরী অবস্থা চলেছে সারা শরীর জুড়ে। আজ তার মুক্তি দিবস বুঝে উঠতে পারেনা শরীর। বিবাহের প্রথম রাত তার উদযাপনের দিন জানেই না এই নারীদেহ। স্বামী এই সেই যোগ্য ব্যাক্তি যার জন্য শরীর বাচিয়ে রাখা কিনা উত্তর জানেনা ঘাত-প্রতিঘাতে পেরিয়ে আসা শীতল দেহ। মনে হয় আজ বুঝি পাপ মুক্তির দিন।আজ থেকে এই শরীর কাঁটা- ছেঁড়ার মালিক অন্তত একজন তো স্থায়ী হল।

মহাকাশ খুব প্রিয় ছিল একদিন।কি? মহাকাশ? বিজ্ঞানে মেয়েদের একদম মাথা নেই।একদম হয় না মেয়েদের!কল্পনা চাওলা? ওসব মেয়েদের বিজ্ঞাপন মাত্র। কালে ভদ্রে আসে একজন তাকে পতাকা করে গায়ে জড়ালে রাজনীতি হয়, নারীবাদ হয় আসলে কাজের কাজ হয় না, যত উপরে যাবে পিরামিড হবে, শীর্ষে গিয়ে একদম মমি। কেউ থাকবে না। সেখানে মেয়েরা বস হতে পারেনা। আবেগ দিয়ে মহাকাশ হয় না।তবে? রান্না টা ও তো পারিনা? সংসার হবে না। বর তো তোমার মুখ দেখবে না? তবে গান পারি, গান খুব ভালো লাগে আমার।

তুমি ঘরসংসার ছেড়ে নিয়ম করে গান শিখতে যাবে? ইন্দ্রানী সেন হবে? না, বাপু না, না ষ্টেজে উঠে গান? না, না শ্বশুর বাড়ীতে এমনটা মুশকিল। নাচ, সেটা তো আমি ছোটো থেকে শিখি। তাতে কি? সবাই একটা বয়সের পর ছেড়ে দেয়। তুমিও দেবে? তুমি কি আলাদা কিছু? না কিন্তু ভালবেসেছিলাম এদের, শৈশবের সঙ্গী আমার এরা। কিন্তু সংসারের সঙ্গী স্বামী-ছেলেমেয়ে তার পরিবার। আর আমার পরিবার সেটা তো তার বৌমা দেখবে কিন্তু আমার দাদা তো বিদেশে থাকে। তাতে কি? মেয়ের বাবা-মার জ্ঞান আছে তারা জানেন কি করতে হবে।

খুবজোর কলেজে-স্কুলে চাকরী করতে পার। সেফ থাকবে। অনেক ছু্টি, আজকাল তেমন পড়াতে টড়াতে হয় ও না! বাড়ীতেই থাকতে পারবে। বাঃ, আমার পেশার নির্বাচনটাও এত্ত সহজ ইকুয়েশন জানতেই পারিনি। সেতো নিয়ম করে বাইরেই থাকা। বিনোদনে যাওয়া। সেখানেও আমি স্টার। পায়ে হিল তোলা গোড়ালী, বড় সাইজের টিপ, সিদুরহীন স্বামী থাকা মাথার সিঁথি, আমার ডিজাইনার শাড়ী, ব্লাউজের গলা, শাখা-পলা হীন সধবা হাত- আমি পর্ন। আমার নারীত্ব আলোচনার অবকাশ রাখে। তথাকথিত ভাল মেয়ের খাতা থেকে নাম কেটে আমার নাম অন্যরকমের দলে লেখায় বিবেচকদের বোর্ড।

তবু ও এই একমুখ হাসি আমার। দ্বিধাহীন লাল লিপস্টিকে রাঙ্গানো ঠোঁট আমার। হাতের নোখে দামী নেল পোলিশ, কস্টিউম জুয়েলারী ভরা গলা ও হাত আমার একান্ত নিজেস্ব পছন্দের। আমার অভ্যাস, পার্লার, জিম স্বনির্বাচিত। আমার শরীর আমার কাছে বড্ড দামী,বড্ড কাছের ঘন কৃষ্ণবর্নের এই নরম দেহ। আমার বিদেশী অন্তর্বাস, পারফিউম, সানগ্লাস, আমার সব প্রসাধনী, আমার কনজুগ্যাল লাইফ প্রত্যাখ্যান সব আমার নির্বাচিত। আমার চোখে আমিই ষ্টার।আমার প্রাথমিক পচ্ছন্দ আমার নারীত্ব। পুজা করি আমি তার।

আধেক আকাশে, নরনারীর অর্ধ সংসারে নয় আমি খুঁজে পায় নিজেকে এই মাটির ধূলিকণায় যেখানটা আজ ও সিক্ত দেখে গর্ব করি আমি। ভিজিয়েছিলাম তোমায়  ফোঁটা ফোঁটা আবেগে তাই বুঝি তোমাতে এতো সুবাস! তারাভরা আকাশে চোখ মেলে প্রানভরে বলি ঝরেছিল স্বপ্ন আমার তাইতো তোমার বুক আলোয়  ভরা।

কাপুরুষের মত যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া নিখোঁজ প্রেমিক কে বলি তুমি ছিলে তাই বাজার ভরেছে এত নকল প্লাস্টিক, কাগজের ফুল। ছেড়ে আসা স্বামী কে বলি তুমি এসেছিলে তাই মৃত্যুকে জয় করেছি সহজে আমি।প্রতিটি কন্যা কে বলি তুমি ছিলে তাই আজ ও স্বপ্ন দেখি আমি। এই স্বপ্নের দেশে আমি সাম্রাজ্ঞী। আমার রাজ্যপাট, সিংহাসন অবিজিত-ন হন্যতে।।

This website uses cookies.