রাজপুত্তুর / নূরিতা নূসরাত খন্দকার

প্রথম সকাল ডটকম ডেস্ক: রাজপুত্তুর শিশুকালের কল্পনা জগতের এমন এক চরিত্র, যে উড়ে আসবে পংখিরাজে চড়ে, তারপর সকল সঙ্কট মাড়িয়ে নিয়ে যাবে কোন এক গল্প-কথার দেশে। তারও পর সকল কান্না সকল হাসির মালা গেঁথে পরিয়ে দেবে দুঃখিনীর গলায়। তারপর? হুম, তারপর মহাকালের ঘাটে ঘাটে ভিড়বে সেই রাজপুত্তুরের গল্পতরী। বরণ করবে সকল কালের কূলবাসী।

এই তো রাজপুত্তুরের ইতিহাস। ইতিহাস ঘেঁটে ঘেঁটে দেখা যায়– রাজ্যের অস্তিত্ব যতক্ষণ, রাজত্বের ইতিহাসও ততোক্ষণ। কিন্তু রাজপুত্তুর চিরকাল রাজপুত্তুরই থেকে যায়। এখনও মুঘল রাজপুত্তুর আকবরের নাম নেয়ার আগে সম্রাট উপাধি যুক্ত থাকে। তাঁর রাজত্ব নেই, রাজ্য নেই তবুও সম্রাট আকবর ঠিকই সম্রাট আকবরই থেকে গেছেন– উত্তরকালের সকল কূলবাসীর কাছে। আমি যে রাজুত্তুরের কথা বলব সে রাজপুত্তুর উড়ে আসে না। শব্দের বৈঠায় বাক্যস্রোত পার করে কাব্যতরী বেয়ে যায়, তাঁর একাকী সন্যাস।

তাঁকে অনেকেই চেনে, অনেকেই জানে না। আবার কেউ কেউ জানে, অনেকেই বোঝে না। এমন এক রহস্যময় সে রাজপুত্তুর যাকে নিয়ে গল্প বলা আমারও সাজে না। সাগরবুকে নুনের পুতুলের গলে যাওয়ার মতই দশা হবে আমার। তবুও বলার সাহস করছি, ধৃষ্টতা নয়। কারণ, আমি শুনেছি সে রাজপুত্তুরের এক প্রহরের বাঁশির সুর। কোন এক রাতে চাঁদ নয়, চারু মজুমদার ছিলেন তাঁর আকাশে।

রাতের বোতাম খুলে চাঁদের বদলে সাইকেলের চাকা বসিয়ে দাপিয়ে বেড়ায় সে রাজপুত্তুর। দূরে বহুদূরে সাইকেলে ধুলি ওড়ানো পথে তার শৈশব খেলা করে। তাকে রোজ রোজ ডেকে যায় ‘নাড়ার আগুনে লেখা শীতের হাওড়’। সে শুনেছে, এখনও ‘কাতলার বিলে দস্যু কেনারাম হাঁকে অমাবস্যা রাতে। ‘জঙ্গলবাড়িতে আজও সূর্য ওঠে বীরশ্রেষ্ঠ ঈশা খাঁর নামে’। তার হাতের ‘মন্দিরাতে সন্ধ্যাতারা বাজে’।

‘দূরে কোথাও আরও দূরের ডাক’ শুনেই সে বলতে পারে ‘সেখানে এক বালিকা বাস করে’। সেই বালিকার ‘শ্রাবণ-করা’ মনের খোঁজও তার অজানা নয়। ভাটেশ্বরীর সহোদরা ফুলেশ্বরীর স্রোতে স্রোতে তার অবগাহন। মনিটরে অপেক্ষমাণ ইমেইলের চেয়ে তার কাছে ঢের বেশি জরুরি– পাখি সংবাদ।

রাজপুত্তুরের মেয়ে বাংলাদেশ ‘বড় লক্ষ্মীমন্ত’-
“…ও বড় আহ্লাদী মেয়ে
সবুজ ফিতেয় চুল বেঁধে প্রতিদিন
পা দোলায় বঙ্গোপসাগরে।
জল, পলিমাটি নিয়ে খেলতে ভালবাসে।
কারো সঙ্গে বিরোধ করে না।…” (বাংলাদেশ/ কাব্য গ্রন্থঃ অন্তহীন মায়াবী ভ্রমণ)

দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সেই রাজপুত্তুরের ভাবনা জগতকে সরল পল্লী-ঘোর লেপটে থাকে। বাঙালীর গ্রামীণ সৌন্দর্য তাঁর অহঙ্কার-

”আমি লুঙ্গি-বাউলের নাতি, শাড়ি কিষাণীর ব্যাটা,
আমার বাপের নাম কে না জানে– চাষা-মালকোঁচা
আমি গামছা-কুমোরের প্রতিবেশী, জ্ঞাতিগোষ্ঠী যত নিম্নজনা…”। (মাটি- বংশধর/ কাব্য গ্রন্থঃ একলব্যের পুনরুত্থান)
‘মাটিবংশধর’ এ রাজপুত্তুর ‘মাটি মাতৃভাষায়’ ‘সোঁদাগন্ধ পুঁথি পাঠ’ করে। সরলসবুজ গন্ধ মাখা যার জীবন তাঁর প্রেমকেও দেখা যায় প্রকৃতির রঙরূপেরই প্রতিচ্ছবি-

“তোমার চোখের চেয়ে বেশি নীল অন্য কোন আকাশ ছিল না
যেখানে উড়াল দিতে পারি
তোমার স্পর্শের চেয়ে সুগভীর অন্য কোন সমুদ্র ছিলো না
যেখানে তলিয়ে যেতে পারি
তোমাকে দেখার চেয়ে নির্মিমেষ অন্য কোন দ্রষ্টব্য ছিল না
যেখানে নিমগ্ন হতে পারি।
তোমাকে খোঁজার চেয়ে বেশি দূর কোনও গন্তব্য ছিল না
যেখানে হারিয়ে যেতে পারি।

কেবল তোমার চেয়ে বেশি দীর্ঘ তুমিহীন একাকী জীবন।” (তুলাদন্ড/ অব্যর্থ আঙুল)

আরও কিছু পঙক্তি মেলে ধরছি, যা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাঁর রাজত্বের কাব্যরাজ্য জুড়ে-

”তুমি আমার বহুল পাঠে মুখস্ত এক কাব্য গ্রন্থ-
তোমার প্রতি পঙক্তি আমি পাঠ করেছি মগ্ন হয়ে…” ( আদ্যোপান্ত )

“ডোবায় কি পেয়েছিলো কেউ সমুদ্রের ঢেউ?
ভেঙে দিলে সমুদ্র নেবে না বোকা মেয়ে,
বোকাদের পুরোটাই চাই———
নিক তবে ঘোলাটে ডোবাই।” (সমুদ্র ও তালপট্টিকালে মনে পড়ে)

“প্রতীক্ষার থাকা চাই শেষ——
কাপেই জুড়িয়ে গেল চায়ের বয়স।”

“যেতে চাও যাবে———-
আকাশও দিগন্তে বাঁধা,কোথায় পালাবে?””যেতে চাও যাবে———-
আকাশও দিগন্তে বাঁধা,কোথায় পালাবে?”যেতে চাও যাবে———-
আকাশও দিগন্তে বাঁধা,কোথায় পালাবে?”

”…এখনও পদ্মার বাঁধে নাজাতের খালি বাড়ি ছুঁয়ে
অনেক দুপুর একা লালনের মাঠে চলে যায়”

“…গাছ যদি ছায়াবিল, নদী যদি ঢেউবিল,
পাখি যদি সুরের মজুরী চেয়ে বসে?”
গল্পের এই রাজপুত্তুর সম্পর্কে বাংলা সাহিত্য-নক্ষত্র-জগত নিবাসী সুজিত সরকার (কোলকাতা) এঁর অভিমত,”তাঁর গদ্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটার অনেক আগেই তাঁর কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছে। আমি প্রথম থেকেই তাঁর কবিতার এক মনযোগী ও মুগ্ধ পাঠক…তিনি আমার ভাষারই কবি, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নন, বাংলাদেশের। বাংলাদেশের সব কবির কবিতা আমি পড়িনি তবে প্রধান কবিদের কবিতা অবশ্যই পড়েছি… ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের পরে তিনিই সবচেয়ে সেই গুরুত্বপূর্ণ কবি… তাঁর কবিতা মেধা ও আবেগের এক স্বার্থক সমন্বয়।” তথ্যসূত্র দৈনিক মানবকণ্ঠ, পৃষ্ঠাঃ ৫, তারিখঃ ২২/৫/২০১৫ ।

আলোচক সুজিত সরকারের মতে এই কবিজীবনীর শ্রেষ্ঠ ফসল কাব্যগ্রন্থ- বালিকা আশ্রম। এই প্রসঙ্গে তিনি কবি রহমান হেনরি’র মন্তব্যও তুলে ধরেন, ” বালিকা আশ্রম হয়ে ওঠে আমাদের সময়ের এমন এক সোনালি দলিল, যার চেতনাবীজ ইতিহাসে প্রোথিত। যন্ত্রণাস্নাত স্মৃতি যার প্রকাশ্য ও আপাত অবলম্বন। ব্রাত্যজীবনের অনুদ্ঘাটিত রূপ-রস-সৌন্দর্য, এমনকি শব্দাবলি যার নির্মাণ- উপাদান এবং চূড়ান্তে মহাজীবন ও মহাপৃথিবীর দিকে ধাবমান যার গতিমুখ”।

আমাদের কাব্যসাহিত্যের এই রাজপুত্তুর নিজেও ধাবমান, হেঁটে চলছেন একাকী জীবন আর কবিতা নিয়ে। অতীতের পথে চলতে চলতে দেখেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। পাঁচ মাইল পথ হেঁটে হেঁটে ময়মনসিংহ শম্ভুগঞ্জ গুদারাঘাট পাড়ি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জানানো। সেদিন থেকেই বুকে সাত সমুদ্র ঢেউ নিয়ে আজও হেঁটে চলেছেন। নতুন প্রভাতের আলো আনতে ‘থোকা থোকা অন্ধকার চিরে’ চিরে তাঁর হট্টন উপাখ্যান এগিয়ে চলছে। হাঁটার পথে কীটনুকীটদের যন্ত্রণাও তাঁকে সইতে হয়।

তবুও সে চলন্তিকা, দমে যাবার নয়। তাঁর মতে, ”এই অনিঃশেষ পথহাঁটাকেই আমি ‘একার সন্যাস বলি… একাকী জীবন হাঁটি আমি আর কবিতা। স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমান এঁর ভাষায়, ”…সত্তর দশকে যার আবির্ভাব, আমার অত্যন্ত প্রিয়জনই শুধু নন, আমি তাঁর কবিতার মুগ্ধ পাঠকও। তাকে আমাদের দেশের একজন অগ্রগণ্য কবি বলে মনে করি। তিনি পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান, সর্বপরি মেধাবী…সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয় হচ্ছে এই কবি ক্রমাগত নিজেকে অতিক্রম করে চলেছেন— কি বিষয় নির্বাচনে, কি প্রকাশ ভঙ্গিতে।” [তথ্যসূত্র দৈনিক মানবকণ্ঠ, পৃষ্ঠাঃ ৫, তারিখঃ ২২/৫/২০১৫]

এই রাজপুত্তুরকে বুঝতে হলে আমাদেরও যান্ত্রিক ‘কাঁচের শহর’ থেকে বেড়িয়ে যেতে হবে। জানতে হবে বাংলা শব্দ বুনন আর প্রক্রিতির বিচিত্র চিত্রপট। এই রাজপুত্তুর ‘বালিকা আশ্রম’– এর রূপকার কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। সাঁওতাল- গঙ্গারিডাই থেকে শুরু করে কবির কৈশোরের প্রথম দেশ চেতনার শিহরণ গণ অভ্যুত্থান-কালপুরুষ বঙ্গবন্ধুর আবির্ভাব-মুক্তিযুদ্ধ কালীন হাওড়ে ‘ফুঁসে ওঠা নিপীড়িত জাতি’ সব মিলে বাংলাদেশ জাতিসত্তার অতীত ধারাবাহিককে জড়ো করে বালিকা আশ্রমের চরিত্র গাঁথা।

এখানে চন্দ্রাবতীর বাড়ির উঠোন-শিব মন্দির-হাওড়ে কাটানো পূর্ণিমা-রাজচন্দ্রর জমিদারবাড়ি-ঈশা খাঁর জঙ্গল বাড়ি-তালজঙ্গা গ্রামে চন্দ্রাবতী কবিতা আশ্রম প্রতিষ্ঠা-সেখানে গীতিকা উৎসব পালন এসব কিছুই কবিকে দিয়েছে এক নতুন রাজ্য; কাব্য গড়ার প্রেরণা। যে রাজ্যের নৃপতি তেভাগা আন্দোলনের সেই স্বপ্নবান কৃষকেরা। বাদ যায় নি টুইনটাওয়ার হামলা, উগ্র মৌলবাদ আর বিশ্বায়ন দুষ্ট কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রতি কবির কটাক্ষ লোচন-বচন। কবির ভাষায়, “সমকালীন দেশকাল ও পৃথিবীকালকে মহাকালের নিক্তিতে ওজন করার একটি পরিশীলিত চেষ্টাও বালিকা আশ্রম”।

রাজপুত্তুরের দীক্ষাগুরু লালন-রবি-শঙ্খ। তাঁকে চিনতে কারো অসুবিধে হলেও হতে পারে। আকবরের হাতে ছিল তলোয়ার, তাই সময় তাঁকে চিনতে সময় নেয়নি। কিন্তু আমার গল্পের রাজপুত্তুরের হাতে শব্দের বৈঠা, ঢেউয়ে ঢেউয়ে বয়ে যাবে বহু বাক্যস্রোত।

এ সময় তাঁকে চিনবে কতটা জানি না। কবিতার ভাসানে ভাসানে স্রোত বয়ে যাবে ঠিকই। কিন্তু তারপর! হুম তারপর মহাকালের ঘাটে ঘাটে ভিড়বে সেই রাজপুত্তুরের কাব্যতরী। বরণ করবে সকল কালের কূলবাসী। হয়তো রাজপুত্তুরের ইতিহাস এভাবেই ভেসে বেড়াবে কালান্তরের মাঠে, অন্য সময়- ভিন্ন যুগের প্রান্তরে। গঙ্গা রিডাইয়ের মত প্রাচীন কাব্য ফলকে আবু হাসান শাহরিয়ার নামে রাজত্বের সাক্ষ্য থেকে যাবে অনন্তকালের বাংলা সাহিত্যের তীর্থভূমে।

”না-ও যদি জন্মাতাম আমি, পৃথিবীর কিছুই আসত-যেত না। তবু জন্মেছিলাম বলে আমার একটা জন্মদিন আছে।”- আবু হাসান শাহরিয়ার
সংগ্রহ: Abu Hasan Shahriar ফেসবুক স্ট্যাটাস- ২৬জুন/ ২০১৪।

(শ্রদ্ধেয় কবি আবু হাসান শাহরিয়ার এর ৫৬ তম জন্মবার্ষিকীতে আমার কবি প্রণাম।)

কবির জন্মঃ ১৯৫৯, ২৫ জুন।

This website uses cookies.