অনলাইন গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আসছে

52প্রথম সকাল ডটকম (ঢাকা): সশস্ত্র বাহিনীসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত অন্য কোনো বাহিনীর প্রতি কটাক্ষ, বিদ্রূপ বা অবমাননা করা যাবে না অনলাইন গণমাধ্যমে। অপরাধ নিবারণ ও নির্ণয়ে অথবা অপরাধীদের দণ্ড বিধানে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এমন তথ্য-উপাত্ত প্রচার, প্রকাশ ও সম্প্রচার করা যাবে না। এমন তথ্য প্রচার-সম্প্রচার করা যাবে না, যা রাষ্ট্রদ্রোহমূলক ও হিংসাত্মক ঘটনা প্রদর্শন করে। এসব বিধিনিষেধ রেখে জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১৫-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এ জন্য গঠিত কমিটি খসড়াটি চূড়ান্ত করে তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয় জনমত যাছাইয়ের পর নীতিমালা পুরোপুরি চূড়ান্ত করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা বৈঠকে পাঠাবে। অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি ও তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। বেসরকারি টেলিভিশন ও বেতারের জন্য গত বছরের ৫ আগস্ট তথ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। ওই নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সম্প্রচার কমিশন গঠন করা হবে। এর জন্য বিধিমালা চূড়ান্ত হয়েছে কয়েক দিন আগে। এই জাতীয় সম্প্রচার কমিশনই জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পেতে পারে বলে জানা গেছে।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মরতুজা আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করে ধাপে ধাপে এই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। নীতিমালা সংশ্লিষ্টদের নিয়েই তৈরি করা হচ্ছে। খসড়া নীতিমালা তৈরির লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বারকে প্রধান করে একটি উপকমিটি করা হয়েছিল। মোস্তাফা জব্বার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কয়েক মাস আগে খসড়া চূড়ান্ত করেছি। জনমত নেওয়ার পর এটি চূড়ান্ত করা হবে। অনলাইন গণমাধ্যমে শৃঙ্খলা আনতেই এটি করা হচ্ছে।

ভুঁইফোর অনলাইন গণমাধ্যম সম্পাদকদের নিয়ে নীতিমালা: প্রতিষ্ঠিত অনলাইন গণমাধ্যম সম্পাদকদের বেশির ভাগই এই খসড়া নীতিমালা ও তা প্রণয়নের প্রক্রিয়া নিয়ে নাখোশ। তাঁরা বলছেন, এটি করা হয়েছে ভুঁইফোর কিছু অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে। এই নীতিমালা অনুমোদন হলে সরকার এই খাত যথেচ্ছ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে। নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির সদস্য এক সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘একটি সভায় আমি গিয়েছিলাম। এরপর আর যাইনি। দ্য রিপোর্ট ২৪ডটকমের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু বলেন, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড অনলাইন পত্রিকার সম্পাদকদের নিয়ে নীতিমালা করা হয়েছে। নীতিমালায় আরো বিভিন্ন বিষয় সংযোজন-বিয়োজন করা উচিত। 01নিবন্ধন লাগবে: চূড়ান্ত খসড়া নীতিমালা অনুসারে, অনলাইন গণমাধ্যম বলতে বাংলা ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ভিডিও, অডিও, টেক্সট বা মাল্টিমিডিয়ার অন্য কোনো রূপে উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ বা সম্প্রচারকারী ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে বোঝাবে। সব অনলাইন গণমাধ্যমকে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ বিধি অনুসরণ করে নিবন্ধন দেবে। অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য কোনো ধরনের জামানত রাখতে হবে না। সম্পাদকসহ সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, আর্থিক সংগতি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন সাপেক্ষে নিবন্ধন দেওয়া হবে।

কাগজ বা সম্প্রচারের জন্য নিবন্ধিত, ডিক্লারেশন বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত গণমাধ্যমকে অনলাইন প্রচার, প্রকাশ বা সম্প্রচারের জন্য নিবন্ধিত হতে হবে। সরকার অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ করে বিধান প্রণয়ন করবে। বিধিমালা প্রণয়নের আগ পর্যন্ত তথ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়গুলো দেখভাল করবে। শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বিজ্ঞাপনসহ সরকারি সুবিধা মিলবে: খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, নিবন্ধন পাওয়া অনলাইন গণমাধ্যম সরকারের স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে সরকারি বিজ্ঞাপনসহ সরকারের সব সুবিধা পাবে। প্রতিটি অনলাইন গণমাধ্যমের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্যের তালিকা ও সম্পাদকীয় নীতিমালা থাকতে হবে।

তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ ও সম্প্রচার করার ক্ষেত্রে সেন্সরশিপ অব ফিল্মস অ্যাক্ট-১৯৬৩, তথ্যপ্রযুক্তি আইন-২০০৬, কপি রাইট, ট্রেড মার্কস, প্যাটেন্টস ডিজাইন ও জিআই আইনসহ অন্যান্য মেধাস্বত্বগুলো বা দেশের প্রচলিত আইন ও এর অধীনে প্রণীত বিধিবিধান লঙ্ঘন করে বা কোনো জাতীয় নীতিমালার পরিপন্থী কোনো তথ্য প্রচার, প্রকাশ ও সম্প্রচার করা যাবে না। এ ধরনের গণমাধ্যমে প্রচারিত, প্রকাশিত বা সম্প্রচারিত তথ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর যুক্তি যথাযথভাবে উপস্থাপনের সুযোগ থাকতে হবে।

অপরাধীদের কাজের কৌশল প্রকাশ করা যাবে না: খসড়া নীতিমালা অনুসারে, অনলাইন গণমাধ্যমে কোনো ধরনের অশোভন উক্তি বা আচরণ করা যাবে না এবং অপরাধীদের কার্যকলাপের কৌশল প্রদর্শন, যা অপরাধ সংগঠনের নতুন পদ্ধতি প্রবর্তনে সহায়ক হতে পারে- এমন তথ্য-উপাত্ত বা দৃশ্য প্রকাশ বা সম্প্রচার করা যাবে না। মৃতদেহ প্রদর্শন নয়: নীতিমালায় বলা হয়েছে, সত্যিকার হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনায় নিহত ও আত্মহত্যাকারীর মৃতদেহ এবং নির্যাতিত, ধর্ষিত ও ব্যভিচারের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত কোনো নারী বা শিশুর স্থির বা চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা যাবে না।

মানবিক অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো মানুষ বা প্রাণীর নির্যাতনের দৃশ্য বা তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ বা সম্প্রচার করা যাবে না। দেশীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী তথ্য প্রচার করা যাবে না: নীতিমালায় উল্লেখ আছে, দেশীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং অশ্লীল, হিংসাত্মক ও সন্ত্রাসমূলক তথ্য-দৃশ্য প্রচার করা যাবে না। সংস্কৃতির সমৃদ্ধির জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিল্প ও শিল্পীদের অনুসন্ধান করে তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে এবং জনসমক্ষে তাদের প্রতিভা তুলে ধরতে হবে।

রাষ্ট্রভাষাকে যোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে তথ্য পাঠ, প্রচার, প্রকাশ ও সম্প্রচারে কোনোক্রমেই বাংলা প্রমিত বানান বা উচ্চারণের মান শিথিল করা যাবে না। প্রয়োজনে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা যাবে। তবে কোনোক্রমেই কোনো অঞ্চলের প্রতি কৌতুক বা পরিহাস করার জন্য আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শালীনতা, রুচি ও দেশীয় কৃষ্টির প্রতি লক্ষ রেখে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করতে হবে। 4অশ্লীলতা কিংবা চরমপন্থা উসকে দিলে ব্যবস্থা: নীতিমালায় বলা হয়েছে, ছবি, লেখা, কার্টুনে অশ্লীলতা কিংবা চরমপন্থা উসকে দিলে সেই পোর্টালের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। সশস্ত্র বাহিনী বা অন্য কোনো বাহিনীর প্রতি কটাক্ষ করা যাবে না: বিজ্ঞাপন বিষয়ে বলা হয়েছে, বিজ্ঞাপনে সশস্ত্র বাহিনী অথবা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত অন্য কোনো বাহিনীর প্রতি কটাক্ষ, বিদ্রূপ বা অবমাননা করা যাবে না। বাণিজ্যিক কোনো বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে প্রতিরক্ষা বাহিনী, পুলিশ বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রদর্শন করা যাবে না।

বিজ্ঞাপন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের প্রতি পীড়াদায়ক হতে পারবে না: রাজনীতিক, বিদেশি কূটনীতিক ও জাতীয় বীরদের গণমাধ্যমে প্রচারিত পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। তবে গণসচেতনতা ও সমাজ সংস্কারমূলক বিজ্ঞাপনে দেশের স্বনামধন্য নাগরিকদের সম্মতিক্রমে বিজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। বিজ্ঞাপনের ভাষা, দৃশ্য কিংবা নির্দেশনা কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের প্রতি পীড়াদায়ক হতে পারবে না। ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্যের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ইত্যাদি ধর্মীয় স্থানের স্থির কিংবা চলমান চিত্র উপস্থাপন করা যাবে না। পণ্যের বিজ্ঞাপনে বিএসটিআইয়ের মান নিয়ন্ত্রণ সনদপত্র উপস্থাপন করতে হবে।

এ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মান নিয়ন্ত্রণ সনদপত্র উপস্থাপন করতে হবে। প্রতিযোগী পণ্যের সঙ্গে তুলনা বা নিন্দা বা শ্রেষ্ঠত্ব দাবি বা অন্য পণ্য সম্পর্কে অমর্যাদাকর উক্তি করা যাবে না। বিজ্ঞাপনের অডিওতে বিকৃত অশ্লীল শব্দ, উক্তি, সংলাপ, জিংগেল ও গালাগাল অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। নকল বিজ্ঞাপন প্রকাশ বা সম্প্রচার করা যাবে না। ওষুধপত্র, চিকিৎসা পণ্যের বিজ্ঞাপনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ প্রদান এবং তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না।

তবে এইডস, ডায়রিয়া, ডেঙ্গু, যক্ষ্মা, মহামারি প্রতিরোধ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ এসিড নিক্ষেপ এসব ক্ষেত্রে অনুমতিক্রমে পরিচয়সহ বিশেষজ্ঞদের পেশাগত পরামর্শ দেখানো যেতে পারে। বিজ্ঞাপনে মডেলদের পোশাক শালীন ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। গুঁড়ো দুধের বিজ্ঞাপনে পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুদের মডেল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না বা ছবি প্রদর্শন করা যাবে না। এ ছাড়া গুঁড়ো দুধের বিজ্ঞাপনে ‘শিশুদের জন্য মায়ের দুধের বিকল্প নেই’ এবং ‘এই গুঁড়ো দুধ এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য নয়’- বাক্য দুটি সুপার ইম্পোজ করে দেখাতে হবে। পত্র মিতালী, নাইট ক্লাব, বার, সিগারেট, বিড়ি চুরুটের বিজ্ঞাপন প্রচারযোগ্য নয়।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *