আস্কর আলী পণ্ডিত প্রসঙ্গে

1 (10)শামসুল আরেফীন: আস্কর আলী পণ্ডিত আমাদের দ্বারা লোককবি অভিধায় চিহ্নিত হলেও তিনি মূলধারার বাংলা সাহিত্যের কবিও বটে। লোকসমাজে জন্ম হওয়ায় পরিচয়ের এমন স্বরূপ। আধুনিক বাংলা সাহিত্য সুধীসমাজে লালিত ও মূল্যায়িত হলেও পূর্বে মূলধারার বাংলা সাহিত্য লোকসমাজে লালিত হয়। ড. সত্যব্রত দে চর্যাগীতি পরিচয় গ্রন্থের ১০০ পৃষ্ঠায় চর্যাপদ সম্পর্কে বলেন: ‘‘একদা চর্যাগীতি সমাজে জনপ্রিয় মর্যাদায় বহুল প্রচলিত ছিল এবং সম্ভবত নিষেধ সত্ত্বেও সঙ্গীতরস উপভোগের জন্য অদীক্ষিত জনসাধারণও চর্যাগীতি আস্বাদন করিতেন।

চর্যাগীতির এই জনপ্রিয়তাই পরবর্তী সঙ্গীতশাস্ত্রগুলির মধ্যে ইহার উল্লেখ ও বিস্তৃত বিবরণ প্রদানের প্রেরণা। সুতরাং আজ চর্যাগীতি লিখিত রূপে আমাদের কাছে অসিয়া উপস্থিত হইলেও একদা চর্যাগীতিগুলি লোকমুখে প্রচলিত ও জনপ্রিয় সঙ্গীত-রীতি হিসাবেই পরিচিত ছিল’’ [পরিমার্জিত চতুর্থ সংস্করণ; জানুয়ারি ১৯৯৭; প্রকাশক: মঞ্জুলিকা ভট্টাচার্য; ১৭১/১/১ বি রাসবিহারী এভনিউ,কলিকাতা ৭০০ ০১৯]। মূলধারার বাংলা সাহিত্য অর্থাৎ চর্যাপদ এবং মধ্যযুগ- অবক্ষয় যুগে রচিত সাহিত্য লোকসমাজে লিখিত বা প্রতিলিপিরূপে এবং মৌখিকভাবে লালিত হয়। বংশ পরম্পরায় মৌখিকভাবে লালিত হওয়া ছিল সংরক্ষণের অন্যতম উপায়। কেননা ওই সময়কালে লিখে রাখার ব্যাপার ছিল কঠিন, কষ্টসাধ্য। চর্যাপদ লিখিত হয় তালপাতায়।

মধ্যযুগ-অবক্ষয় যুগে রচিত সাহিত্য লিখিত হয় তুলট কাগজ প্রভৃতিতে। চট্টগ্রাম থেকে মধ্যযুগ-অবক্ষয় যুগে রচিত সাহিত্যের অনেকাংশের লিখিতরূপ বা প্রতিলিপি পাওয়া গেছে। এসব উদ্ধার করেন মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, আবদুস সাত্তার চৌধুরী, ড. এনামুল হক প্রমুখ। এসবের মধ্যে আছে মঙ্গলকাব্য, প্রণয়কাব্য, কাহিনিকাব্য প্রভৃতি। এছাড়াও আছে অনেক বারমাসি ও গীতিকা। ঊনিশ-বিশ শতকেও মধ্যযুগ-অবক্ষয় যুগের অনুসরণে সাহিত্য চর্চা চলে। আস্কর আলী পণ্ডিত এ সময়েই নিরলসভাবে নিরন্তর সাহিত্য রচনা করেন। লোকসমাজে জন্ম হওয়ায় একদিকে লোকসংস্কৃতি, অপরদিকে লোকসমাজে লিখিত ও মৌখিকভাবে লালিত মূলধারার বাংলা সাহিত্য দ্বারা তীব্র প্রভাবিত হন। ফলে তাঁর থেকে লোকসাহিত্য ও মূলধারার বাংলা সাহিত্য উভয়-ই আমরা পাই।

লোকসাহিত্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা গান। কী জ্বালা দি গেলা মোরে, ডালেতে লড়িচড়ি বৈও চাতকি ময়নারে, কেউরে ন বুঝাইয়মরে আঁর পরাণবন্ধু কালা, বসি রইলি ও মন কার আশে/রঙ্গের বাজার,মন পাখিরে বুঝাইলে সে বোঝেনা/প্রবোধ মানে না, ঘনার দিন ত যারগৈরে ফুরাই আরত ফিরি ন আইব, বাতাসের রিত না বুঝি সুজন মাঝি ভাসায় দিছে, পরবাইস্যারে-ওরে ও পরবাইস্যারে ফজরত আঁই ধইরলাম নলর কুডি, ন মাতাই ন বোলাই গেলিরে বন্ধুয়া, কী লইয়া যাইয়ুম ঘরে সন্ধ্যাকালে, একসের পাবি দেড় সের খাবি ঘরত নিবি কী, দেখি না দেখিলো মোরে, হাউসের যৌবন আমার শেষ করি/বন্ধু যায়, এইবার মরিব আমি বিষ খাইয়া ননদিয়া প্রভৃতি গান উল্লেখ করার মত।

তাঁর সঙ্গীত-সংকলনও রয়েছে অনেক। যেমন,- নন্দবিলাস, নন্দবেহার: প্রথম ভাগ, গীত বারমাস (ক. গীত বারমাস ২য় ভাগ), হাফেজ বাহাদুর (গীত, বারমাস ও কবিতা: প্রথম ভাগ), নন্দসাগর প্রভৃতি। মূলধারার বাংলা সাহিত্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা পুথি। যেমন- জ্ঞান চৌতিসা, পঞ্চসতী প্যারজান, হাদিসবাণী প্রভৃতি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃত ভাষার প্রভাবযুক্ত জ্ঞান চৌতিসা ও পঞ্চসতী প্যারজান (পঞ্চসতী প্যারজানে দেবনাগরী ভাষার ব্যবহারও লক্ষণীয় বটে) প্রণয় কাব্য। জ্ঞানচৌতিসায় জ্ঞান ও চৌতিসা কন্যার এবং পঞ্চসতী প্যারজানে দিদার সুখ ও প্যারজানের প্রণয়কাহিনি সন্নিবেশিত। জ্ঞান চৌতিসা প্রণয়কাব্য হলেও সেখানে মরমি বা আধ্যাত্মিক দর্শনের চর্চা লক্ষ্য করার মতো। জ্ঞান চৌতিসায় এ দর্শনের চর্চা করতে প্রণয়কাহিনির আশ্রয় নেয়া হয়-এমনটি আনায়াসে ভাবা যেতে পারে। ষোল শতকে সৈয়দ সুলতান জ্ঞান চৌতিসা, জ্ঞান প্রদীপ এবং হাজী মুহম্মদ সুরতনামা বা নুরজামাল প্রভৃতি কাব্যের মাধ্যমে মরমি দর্শন চর্চা করেন।

ঊনিশ-বিশ শতকে জ্ঞান চৌতিসা নামে পুথি বা প্রণয়কাব্য রচনার মাধ্যমে আস্কর আলী পণ্ডিতের মরমি দর্শন চর্চা প্রমাণ করে তিনি তাঁদের সুযোগ্য উত্তরসূরি। পঞ্চসতী প্যারজানে কোন দর্শনের চর্চা অলক্ষ। একে স্রেফ অতি কল্পনাশ্রয়ী প্রণয়কাব্য বিবেচনা করা যায়। তবে হ্যাঁ, আবহমান বাংলার সাধারণ মানুষ সুপ্রাচীনকাল থেকে বিশ্বাস ও মান্য করে আসছে- শাস্ত্রীয় এমন কিছু বিষয়- আশয় বা রীতিনীতি এখানে উপস্থাপিত, যা থেকে বলা যায়, এতে সমাজ বাস্তবতার সামান্য ছোঁয়াও বিদ্যমান। হাদিসবাণী পুথিটি মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সংগৃহীত। তবে তিনি মনে করতেন, হাদিস কালাম-বাণী পুথির রচক লোকমান আলীই এর রচয়িতা।

১৮৪৬ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড়ে জন্মগ্রহণকারী ও পরবর্তীতে পটিয়া উপজেলার শোভনদণ্ডি গ্রামে স্থায়ী বসতিস্থাপনকারী, মোসরফ আলির পুত্র আস্কর আলী পণ্ডিত (মৃত্যু ১১ মার্চ ১৯২৭) স্বকালে বড়োমাপের কবি বা লোককবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর সময়ে আধুনিক সাহিত্য রচনা দেদারসে চললেও চট্টগ্রামের গ্রামীণ বা লোকসমাজে তাঁর রচিত লোকসাহিত্য তথা মূলধারার বাংলা সাহিত্য মনের খোরাক জোগায়। তাঁর সময়ে, সোজাসুজি বললে তখন থেকে এখন পর্যন্ত তাঁর প্রভাবমুক্ত লোককবি বিশেষ করে চট্টগ্রামে অত্যন্ত অল্প।

সেকান্দর আলী ওরফে সেকান্দর গাইন (১৮৬০-১৯৪২), খায়েরজ্জমা পণ্ডিত (১৮৭৬-১৯৫১), মকবুল আহমদ পণ্ডিত (১৮৫০-১৯৩৪), রমেশ শীল (১৮৭৭-১৯৬৭), করিম বখশ (১৮৭৯-১৯৩৮), দলিলুর রহমান পণ্ডিত (?-১৫জুন১৯১৯), মো. হাছন আলী, মোহাম্মদ হারুন, মোহাম্মদ নাসির (১৯০৩-১৯৭৯), মলয়ঘোষ দস্তিদার (১৯২০-১৯৮২), অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তী (১৯২৬-১৯৯৪), মোহনলাল দাশ (১৯২৬-১৯৭৪), এম এন আকতার (১৯৩১-২০১২), আবদুল গফুর হালী (১৯৩৬-), শাক্যমিত্র বড়–য়া, সৈয়দ মহীউদ্দিন (১৯৫৩-), সঞ্জিত আচার্য (১৯৫৫-), রুহুল আমিন (১৯৫২-) প্রমুখ তাঁর সুরে কথা বসিয়ে গান রচনা করেন।

খায়েরজ্জমা পণ্ডিতের বেনারসি শাড়ি গায়/আনা ধরি সিতা পাড়ে ভইনে খিড়কীর কিনারায়, সেকান্দর গাইনের গুরুজির চরণ মানি/পইট্টা জিলা শেষ গরিল রেয়াল কোম্পানি, অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তীর সূর্য উডের লে ভাই লাল মারি/রইস্যা বন্ধু ছাড়ি গেল গই আঁর বুগত ছেল মারি, আবদুল গফুর হালীর শুইলে ঘুমে ন ধরে/ ঘরর মানুষ বাইরে রইয়ে বুলি তার লায় পেট পোড়ে, মলয়ঘোষ দস্তিদারের ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানিত/লুসাই পাহাড়ত্তুন লামিয়ারে যার গই কর্ণফুলী প্রভৃতি গানে আস্কর আলী পণ্ডিতের বসি রইলি ওমন কার আশে/রঙ্গের বাজার অথবা বেজার কল্যাম বন্ধুরে/সারা নিশী ঘুমে না ধরে (এ গান অনুকরণ করে খায়েরজ্জমা পণ্ডিতও একটি গান লিখেন) গানের সুর। রমেশ শীলের আঁধার ঘরত রাইত কাডাইয়ম কারে লই/বন্ধু গিয়ে গই, এম এন আকতারের কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখ্যম তোঁয়ারে/সিনার লগে, রুহুল আমিনের বন্ধুর লাগি কাঁদেরে আঁর পরান্নান/এত গরি কইলাম প্রভৃতি গানে আস্কর আলী পণ্ডিতের মন পাখিরে বুঝাইলে সে বোঝেনা/প্রবোধ মানে না গানের সুর।

এ থেকে অনুধাবনযোগ্য, ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বর্তমান পর্যন্ত চট্টগ্রামে আবির্ভুত লোককবিদের তিনিই একমাত্র পথিকৃত। এক লোককবি তাঁর সম্পর্কে লিখেন: শোভনদণ্ডী কবির রাজ্য রসের রঙ্গে আনন্দিত, মোহামান্য ধর্ন্ন ধর্ন্ন আস্কর আলী সুপন্ড্রিত। জ্ঞান চৌতিসা, পঞ্চসতী প্যারজান, হাদিসবাণী প্রভৃতি পুথি অনুকরণ ও অনুসরণ করে চট্টগ্রামে পুথি বা মূলধারার সাহিত্য রচনায় কেউ এগিয়ে এসেছেন, এমনটি আমাদের লক্ষ্যগোচর হয়নি। লেখক: শামসুল আরেফীন, কবি ও লোকগবেষক, চট্টগ্রাম।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *