রক্তপাতের খেলাটা থামান : মনিকা লিউইনস্কি

5প্রথম সকাল ডটকম ডেস্ক: ১৬ বছরে ‘মুখরোচক’ গল্পটা শুনতে চেয়েছেন অনেকেই৷ মনিকা লিউইনস্কি বহুবার শুনিয়েছেন ক্লিনটনের সঙ্গে প্রেমে জড়ানোর গল্প৷ এবার প্রতিবাদ জানিয়ে সবাইকে এর প্রতিকারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বলছেন, ‘রক্তপাতের খেলাটা এবার থামান’। রক্তপাত বলে মনিকা লিউইনস্কি আসলে হৃদয়ে রক্তক্ষরণের কথাই বোঝাতে চেয়েছেন৷ সেই ১৯৯৮ সাল থেকে রক্তক্ষরণ তো কম হয়নি তার হৃদয়ে৷ তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার অনৈতিক কেলেঙ্কারির খবর ফাঁস হবার পর সবাই লুফে নেয় সেই খবরটি৷ ইন্টার্ন হিসেবে হোয়াইট হাউসে কাজ করতে গিয়ে এক ২২ বছর বয়সী সুন্দরীর খোদ প্রেসিডেন্টের প্রেমে পড়া, দুজনের মাঝে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা- আলোড়ন তোলার মতো সব রসদই তো ছিল সেখানে! আলোড়ন এতটাই সৃষ্টি হলো যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অভিসংশনের প্রস্তাব রাখে৷ এমন লজ্জাজনক ক্ষমতাচ্যুতির হাত থেকে ক্লিনটনকে অবশ্য বাঁচিয়েছিল সিনেট৷

সিনেট অভিসংশন থেকে মুক্তি দেয়ায় এক অর্থে ক্লিনটনের ‘শেষ রক্ষা’ হলেও যার সঙ্গে তিনি প্রেমে মজেছিলেন, মেয়ের বয়সী যে তরুণীর সঙ্গে গড়ে তুলেছিলেন শারীরিক সম্পর্ক, সেই মনিকা লিউইনস্কির চাকরি, সামাজিক মানমর্যাদা সবই চলে যায়৷ গত বছর ফিলাডেলফিয়ায় ত্রিশ বছরের কম বয়সী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের নিয়ে আয়োজিত এক সম্মেলনে ভাষণ দেন মনিকা লিউইনস্কি৷ হোয়াইট হাউসের বু্দ্ধিদীপ্ত, চটপটে, সুশ্রী এক শিক্ষানবিশ থেকে অনেকের চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ হয়ে জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার সময়টার কথা সবিস্তারেই বলেছেন সেখানে৷ অবশ্য পুরনো কাহিনী নতুন করে শোনানোর জন্য সেখানে যাননি তিনি৷ অনৈতিক কেলেঙ্কারির জন্য বিশ্বময় পরিচিতি পাওয়া এই মার্কিন নাগরিক সেখানে গিয়েছিলেন ১৯৯৮ থেকে ইন্টারনেটে তার বিরুদ্ধে চলে আসা ঢালাও অপপ্রচার, কুৎসা, ঘৃণার অবসানকল্পে কিছু বলতে৷

সেখানেও নারী হিসেবে আক্রমণের শিকার হতে হয় তাকে৷ ২৭ বছর বয়সী এক তরুণ ৪১ বছর বয়সী মনিকাকে বলেন, সুযোগ পেলে তিনি মনিকাকে ‘২২ বছর বয়সের অনুভূতি’ ফিরিয়ে দেবেন৷ গত সপ্তাহে হাসতে হাসতে তারও একটা জবাব দিয়েছেন মনিকা লিউইনস্কি৷ গত সপ্তাহে ইন্টারনেট জগতের অনেক রথীমহারথী এবং বিশ্বের বড় বড় তারকার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠা ‘টেডটক’-এ ভাষণ দিয়েছেন মনিকা৷ সেখানে ২৭ বছর বয়সী ওই তরুণের মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে হাসতে হাসতে বলেছেন, পৃথিবীতে আমিই সম্ভবত ৪০ পেরোনো একমাত্র নারী, যে আর ২২ বছর বয়সে ফিরে যেতে চায় না৷ ওই ২২ বছর বয়সেই ক্লিনটনের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন মনিকা লিউইনস্কি৷ সেটা যে ভুল ছিল তা একভাবে স্বীকার করেই টেডটক-এর শ্রোতাদের কাছে জানতে চাইলেন, আপনাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন যিনি ২২ বছর বয়সে কোনো ভুল করেননি? উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে এমন মানুষ দু’চারজনই ছিলেন৷ কিন্তু সাইবার জগতে সক্রিয়দের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ কি এটা কখনো ভাবেন যে, ভুল সব মানুষের জীবনেই থাকে।  তাই সেই ভুলের কারণে কারো জীবন দুর্বিষহ করে তোলা অনুচিত? ভাবলে ইন্টারনেটে কেন এত ঘৃণা ছড়ানো? এমন তৎপরতার কারণে মনিকা লিউইনস্কিও এক সময় ভেঙে পড়েছিলেন৷

আত্মঘাতী হওয়ার ভাবনাও এসেছিল মাথায়৷ পরে ধীরে ধীরে সামলে নেন নিজেকে৷ সবার অগোচরে নতুন করে গড়ে তোলেন নিজেকে৷ টেডটক-এ প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল বলছে, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে আর ভুল পথে পা না বাড়িয়ে বরং নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন মনিকা৷ লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স থেকে সামাজিক মনস্তত্বে মাস্টার্স করেছেন৷ ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন৷ জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে সেটি৷ তবে স্রেফ নিজের জগতের নীরব বাসিন্দা হয়ে বেশিদিন থাকতে পারেননি মনিকা লিউইনস্কি৷ ৫ বছর আগের একটি আত্মহত্যা ভীষণ নাড়া দেয় তাকে৷ মনিকা ঠিক করেন, সাইবার জগতে ঘৃণা ছড়ানো, যাকে খুশি তাকে অপমান-অপদস্থ করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন৷

নিউ জার্সির টাইলার কমেন্টি একটি ছেলেকে চুমু খেয়েছিল৷ ১৮ বছর বয়সী এক ছেলের অন্য ছেলেকে চুমু খাওয়ার সেই দৃশ্য ওয়েবক্যামে গোপনে রেকর্ড করে প্রকাশ করে দেয়া হয়৷ চুম্বন দৃশ্য দেখে সবাই এত অপমানজনক কথা বলতে এবং লিখতে শুরু করে যে সেসব সইতে না পেরে জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে টাইলার৷ টাইলারের মৃত্যুর পরই মূলত ‘সাইবার বুলিয়িং’, অর্থাৎ সাইবার জগতে অন্যকে অবিরাম আঘাত করার যে প্রবণতা, তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন মনিকা লিউইনস্কি৷ দীর্ঘদিনের প্রায় অজ্ঞাতবাসের পর এভাবে জনসমক্ষে এসে দারুণ সাড়াও পাচ্ছেন৷ তার কেলেঙ্কারির কারণে লজ্জায় ডুবে থাকা জীবনে আসছে সম্মান, মর্যাদা৷ টেডটক-এ দেয়া তার ভাষণের ভিডিও ইউটিউবে সাড়ে সাত লক্ষেরও বেশি এবং টেড-এর ওয়েবসাইটে এরই মধ্যে সাড়ে ষোলো লাখেরও বেশি মানুষ দেখেছেন৷

বহুল প্রশংসিত এই ভাষণে নিজের জীবনের সবচেয়ে কলঙ্কজনক এবং বিতর্কিত অধ্যায় নিয়ে অনেক কথা বললেও তার শেষ কথা ছিল একটাই, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি৷ কিন্তু আমাদের মত প্রকাশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে নিজ নিজ দায়িত্ব নিয়েও কথা বলা দরকার৷ আমরা সবাই চাই আমার কথা কেউ শুনুক৷ কিন্তু উদ্দেশ্যমূলকভাবে কিছু বলা এবং মনযোগ আকর্ষণের জন্য কিছু বলার মধ্যে পার্থক্য আছে৷ নিজেকে বাঁচানোর জন্য নয়, মনিকা কথা বলছেন, এমন প্রতিটি মানুষ যে কিনা লজ্জায় কুঁকড়ে যাবার মতো আঘাত এবং গণঅপমান সহ্য করছেন তাদের পাশে দাঁড়াতে৷ মনিকার মতে, বিশ্বে এমন একটা বাজার তৈরি হয়েছে যেখানে গণঅপমানও একটা পণ্য আর লজ্জা একটা শিল্প৷ কাউকে আপনি যত লজ্জা দেবেন, তত ক্লিক পাবেন৷ যত ক্লিক পাবেন, বিজ্ঞাপন খাত থেকে আসা টাকার অঙ্কটা তত বড় হবে৷ এ অবস্থায় মনিকা লিউইনস্কির আহ্বান, আসুন, লজ্জা আর রক্তপাতের এ খেলাটা এবার থামাই৷ সূত্র : ডয়চে ভেলে

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *