শুধু সার্টিফিকেট নয় শিক্ষার মান নিয়েও ভাবতে হবে

8মুহাম্মদ আবদুল কাহহার: গত ০৩ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম খান স্বাক্ষরিত এক পরিপত্র জারি হওয়ায় দেশ ব্যাপি আবারও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্যদিকে বিতর্কীত একটি সিদ্ধান্ত নেয়া কোন মতেই কাম্য ছিলনা। পরিপত্র জারির বিরুদ্ধে সারাদেশ থেকে নেতিবাচক মন্তব্য আসায় হয়তোবা সিদ্ধান্তটি বাতিল হতে পারে। ২২ মার্চ পর্যন্ত পরিপত্র বাতিলের মতো কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। পরিপত্রটি বাতিল হওয়াটাই সময়পযোগী ও যুক্তিসঙ্গত। পরিপত্রটি বাতিল হবে এমন সংবাদটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও তা কতটা কার্যকর হবে নিশ্চিত করে বলা যায়না। কেননা, গত ১১ মার্চ পরিপত্র জারির বিষয়ে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন,‘ দেখেন কি হয়। আমি কি বলবো!’ মন্ত্রী হয়েও তিনি যেন অসহায়। একই দিনে শিক্ষা সচিবের কাছে পরিপত্র জারির প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিপত্র বাতিল করার যুক্তি দেখিনা। তবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মনে করলে, সেটি ভিন্ন বিষয়।’ অথচ নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করার বাধ্যবাধকতা না থাকা সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানরা মতামত প্রদানকরে বলেছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এ সার্কুলারটি ‘শিক্ষা ধ্বংসকারী, আপত্তিকর’ এবং ‘শিক্ষা ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক’ বলে মন্তব্য করেছেন। পরিপত্র জারি করাটা সঠিক ছিল নাকি বাতিল করা সঠিক সে হিসেব নিকেশ যেন গ্যারাকলে আটকে আছে। শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের কথা শুনে মনে হলো, তিনি হয়তো আবারো কেঁদে দিবেন। যেভাবে কেঁদে ছিলেন সিলেটের এমসি কলেজে ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের কর্তৃক আগুন লাগানোর পওে! কোন কোন ক্ষেত্রে তিনিও হয়তো অসহায়, যে কারণে কান্নাটাই তার হাতিয়ার।

ইতোমধ্যে যে পরিপত্রটি জারি করা হয়েছে অনেক গুলো বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষার পূর্বে যথাযথ গুরুত্বের সাথে নির্বাচনী পরীক্ষার আয়োজন করে নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অনুর্ত্তীণ কিন্তু ৭০% কøাসে উপস্থিত ছিল এমন শিক্ষার্থীদেরকে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে সকল বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়,কারিগরি বিদ্যালয় ও মাদ্রসা প্রধানগণকে নির্দেশনা প্রদান করা হলো। এ ধরণের অপরিপক্ক সিদ্ধান্তের ফলে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়বে, কমবে শিক্ষার মান। এতে করে পরীক্ষা গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে, শিক্ষার্থীরা অমনোযোগী হবে, চূড়ান্ত পরীক্ষায় আরো খারাপ করবে, পরীক্ষার চেয়ে ক্লাসের হাজিরাকে প্রধান্য দিবে, শ্রেণি শিক্ষকের কদর বেড়ে যাবে, অন্যান্য শিক্ষকদেরকে উপেক্ষা করা হবে, হাজিরা দিয়ে শ্রেণি থেকে বের হয়ে যাবে। শিক্ষার্থীদেরকে শৃঙ্খলিত করা যাবেনা। এছাড়া শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের ভিন্নতার কারণে এ ধরণের আরো নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

পরিপত্রটি জারি করার পেছনে তাদের যুক্তি হলো, সরকার আশা করে প্রতিটি শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কৃতকার্যের সাথে স্কুল জীবন সমাপ্ত করুক। এবং শিক্ষার পরবর্তী ধাপে অংশগ্রহণ করুক। এটি যেমন সরকারেরও প্রত্যাশা তেমনি অভিভাবক ও শিক্ষকেরও প্রত্যাশা। কিন্তু কোন শিক্ষার্থী যদি তার নানা অনিয়ম ও ব্যর্থতার কারণে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছতে না পারে সে ক্ষেত্রে অন্যকে দায়ী করা ঠিক হবেনা। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে সরকারের প্রত্যাশা পূরণের কি-ই-বা গুরুত্ব আছে? শিক্ষা ও দক্ষতার মতো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবেগাপ্লুত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য কল্যাণকর নয়।

পরিপত্রটি কেন বাতিল হবেনা, এ নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবক মহলে আলোচনা চলছে। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তের সাথে তারা একমত নন। জোড় গলায় দ্বিমত পোষণ করছেন। অভিভাবক মহলেও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। এমনকি শিক্ষার্থীরাও এ সিদ্ধান্তের সাথে একমত নয়। পরিপত্রটি দেখে মনে হয় জাতীকে ধ্বংস করার জন্য এটি একটি হটকারী সিদ্ধান্ত। আমি অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি, যারা বিদ্যালয়ে এসে কেবল প্রথম ঘণ্টায় উপস্থিতি দিয়ে সটকে পড়ে। বাকি সময়টা স্কুলের বাহিরে অবস্থান করে। হাজিরা খাতা অনুযায়ী প্রত্যহ বিদ্যালয়ে তার উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় পরীক্ষায় সে অকৃতকার্য হচ্ছে। ৭০% উপস্থিতির চিন্তা করে যদি তাকে নির্বাচনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণসহ পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেয় তাহলে কি তারা পাস করবে? মোটেই নয়। হ্যাঁ একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্যরা এগিয়ে যেতে পারে যদি বিগত দিনের মতো পরীক্ষার আগেই তাদের হাতে প্রশ্নপত্র পৌছে দেয়া যায়! প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষার্থীদেরকে জোর করে পাস করানোর দরকার কী? সবাইকে যদি পাশ করানো রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা থাকে তাহলে পরীক্ষার দরকার কী? জন্ম ও দলীয়সূত্রে পাশ করানোর ব্যবস্থা করলেইতো হয়! পরীক্ষার নামে অর্থ ও সময় অপচয়ের দরকার কী?

যে শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বছর একই বই অধ্যয়ন করেও যখন নির্বাচনী পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারেনা, সে কীভাবে বোর্ড পরীক্ষায় পাস করবে? তার পরেও যখন শিক্ষার্থী পাস করে আসে তখনই প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রশ্ন উত্থাপন হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসতো এখন মামুলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত পরীক্ষার পূর্ব রাতটি যেন ফটোকপি মেশিনের দখলে। যদিও চলতি বছরের (২০১৫) এসএসসি পরীক্ষায় কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম দেখা গেছে। পূর্বের মতো প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি মিডিয়াতে আসেনি। তবে একথা সত্য যে, শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট সবারই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত। এজন্য সরকারকেই প্রথমে নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রণালয় যেভাবে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তাতে শিক্ষার মান রক্ষা হবেনা। নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েও পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মতো জোর-জবস্তিমূলক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে তার ফল ভাল হবেনা। তবে কোন প্রতিষ্ঠান যদি বিদ্যালয়ের শত ভাগ পাস কিংবা ভাল ফলাফল দেখানোর জন্য যদি কোন শিক্ষার্থীর উপর যুলুম করে, সে সব প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।

পরিপত্রে আরো বলা হয়েছে, শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে বিষয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে জবাবদিহী করতে হবে। শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদকে প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের একমাসের মধ্যে সভা করে শিক্ষকদের কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে পুরস্কার ও তিরস্কার করতে বলছে মন্ত্রণালয়। প্রশ্ন হলো, শিক্ষকককে তিরস্কার করা হবে কেন? দরকার হলে নির্দেশনা প্রদান করবে, সংশোধনী দিবে। কিন্তু তিরস্কারের বিষয়টি পরিপত্রে উল্লেখ করা কি মেধার অবমূল্যান নয়? কোন শিক্ষার্থীকে তিরস্কার করলে শিক্ষককের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আইন রয়েছে, তাহলে শিক্ষককে তিরস্কার করা হলে তার বিরুদ্ধে কেন আইন থাকবেনা? সর্বোপরি শিক্ষকদের বেলায় তিরস্কার শব্দটি কোনভাবেই আসতে পারেনা। শিক্ষা সচিবের কর্মকা- দেখে বলতে হয় ‘অসাড় চিন্তার প্রসার ঘটেছে আর সুস্থ বিবেকের মৃত্যু হয়েছে।

 

শিক্ষক সমাজ কেন যেন রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়েছে। অথচ শিক্ষার্থী ভর্তির পূর্বে স্কুল-কলেজের পরিচালনা পর্ষদের ভর্তি বাণিজ্যটাকে শিক্ষকের সামলাতে হয়। কখনোবা দলীয়চিন্তায় ফ্রী ভর্তি করাতে হয়, ফ্রী পড়াতে হয়। তাছাড়া রাজনৈতিক চাপতো থাকছেই। এছাড়া শিক্ষার্থীকে কোন ধরণের মৃদু শাস্তিও দেয়া যাবেনা। কোন কিছু বলা যাবেনা। নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেনা। এমনকি শিক্ষকরা বেতন বৃদ্ধির জন্য যৌক্তিক দাবী তুললে টিয়ারসেল ও পিপার আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করা হয়। পুলিশের গুলি খেয়ে প্রাণ দিতে হয়। এ যদি হয় শিক্ষকদের অবস্থা, সে দেশে যে কোন আদর্শ বাস্তবায়ন হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। শিক্ষক হওয়াটাই যেন অভিশাপ হয়েছে। শিক্ষকদের উপর এভাবে যুলুম করা হলে ভবিষ্যতে এ পেশায় মেধাবীরা আসতে আগ্রহী হবেনা। ফলে কোটা ভিত্তিক নিয়োগ প্রাপ্তরা ও নকলবাজরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণভাবে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট, [email protected] (লেখাটির সম্পুর্ন দায়বদ্ধতা লেখকের)

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *