চাই সর্বজনীন গণমুখী ও বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা

bookমো. আলাউদ্দিন: সম্প্রতি “শিক্ষার মান ও আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা” শিরোনামে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার মানের উপর বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। আজকের লেখাটিও শিক্ষা বিষয়ক। তবে প্রসঙ্গ কিছুটা ভিন্ন। আজকে লিখছি আমরা কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা চাই? এবং সেই আলোকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বরূপ, সমস্যা ও উত্তরণের উপায় কি? সেই প্রসঙ্গে। শিক্ষা কি? শিক্ষা মানুষের কি কাজে লাগে? একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য কি হওয়া উচিত? এদেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অপামার জনসাধারনের শিক্ষিত হওয়া যে জরুরি সে ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ না থাকলেও উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গেলে এবং আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে একটু দৃষ্টিপাত করলেই আমরা দেখতে পাবো যে, গোড়ায় গলদ রেখে এবং শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নির্ধারণ না করেই এদেশের প্রত্যেকটি মানুষকে স্কুলে পাঠালেও কোন লাভ হবেনা। এসব প্রশ্নের উত্তর কি আমরা জানিনা? জানাতো অবশ্যই উচিত সেই ছোটবেলায় পড়েছি, “শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড”, “শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞান লাভ করা”, “শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে”। যা পড়েছি, তা কি বিশ্বাস করেছি, তা কি ধারন করেছি নিজের ভেতরে? সন্দেহ জাগে, কারণ আমরা উপরক্ত উক্তি গুলো ভুলে গিয়ে এখন শুধু “লেখা পড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে” এই উক্তিটাই মনে রেখেছি, এখনকার শিক্ষার্থীরা শিক্ষাকে শুধু চাকরির বাজারে একটা চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় মাধ্যম ছাড়া আর কিছুই মনে করেন না, শিক্ষকরাও করছেন কিনা সন্দেহ দেখা দিতে পারে।

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য তাহলে কি? বর্তমান পৃথিবীর সমাজ ব্যবস্থার আলোকে বলা যায়, “শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিটি মানুষকে জ্ঞানী, স্বাধীন, স্বনির্ভর, বিবেকবুদ্ধি, ন্যায়নীতি ও দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন একজন প্রকৃত মানুষে পরিণত করা এবং সমাজ, রাষ্ট্র, শিল্প বা বিজ্ঞানের কোন বিশেষ শাখায় পারদর্শী করে গড়ে তোলা যাতে সেই বিশেষ শাখায় কাজ করে সমাজের প্রতি সে তার দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং সেই সাথে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, হয়ে উঠতে পারে মানব সমাজের একজন প্রকৃত সদস্য। এবার ভেবে দেখা দরকার আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কি এই দায়িত্ব পালন করতে পারছে? মানষচক্ষে বা যেভাবেই দেখা হোকনা কেন, আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বরুপ কিন্তু তা বলেনা। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিজ্ঞানী, দার্শনিক কিংবা শিল্প উদ্যোক্তা তৈরি করতে ব্যর্থ। শিল্প, সাহিত্য বা বিজ্ঞান-জ্ঞানের প্রতিটি বিষয়ে আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের জ্ঞান এবং কর্মদক্ষতার দৈন্য বর্তমান আধুনিক বিশ্বে লক্ষণীয়, সর্বোপরি বাংলাদেশের ৩৭ বছরের ইতিহাসে এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের উন্নয়নে কোন কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের সর্বত্রই আজ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম বিদ্যমান, দুর্নীতিতে ৫ বার আমরা বিশ্ব চাম্পিয়ন হয়েছি। লক্ষণীয় বিষয় যে এই পরিস্থিতি সৃৃষ্টির পেছনে দেশের কিছু লোক জড়িত, যারা আমাদের এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার ফসল এবং অধিকাংশই তথাকথিত মেধাবী বলে বিবেচিত, আর বাকিরা এই পরিস্থিতির নীরব সমর্থক।

তাহলে খুব সহজেই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে ছোটবেলায় শেখানো, “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তারা উভয়ই সমান অপরাধী”, “ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ” বা “মানুষের তরে মানুষ আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে” নীতিবাক্যগুলো শুধুমাত্র পরীক্ষা পাশের বিষয়ে পরিনত হয়েছে যার প্রায়োগিক দিক সম্পূর্নভাবে উপেক্ষিত। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এই অকার্যকর ও অনুৎপাদনশীলতার কারন কি? খতিয়ে দেখতে গেলে আমাদের তাকাতে হবে মূল সমস্যাগুলোর দিকে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে গত ৪৩ বছরে আমাদের দেশে একটি সুনির্দিষ্ট শিক্ষানীতির প্রনোয়ন বাস্তবায়িত হয়নি। এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে চরম শ্রেণীবৈষম্য ও বাণিজ্যমুখী শিক্ষা এদেশের গোটা জনগোষ্ঠির কাছে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে অত্যন্ত ঘৃনিত ভাবে উপস্থাপন করছে। আর শিক্ষার্থীর মননে সৃষ্টি করছে জ্ঞানবিমুখী অর্থলোভী মানষিকতা। একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক, এদেশে শিক্ষার ইতিহাসের দিকে। আগেই বলেছি, গত ৪৩ বছরে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়াই চলছে। হতাশাজনক এবং বিষ্ময়কর হলেও সত্য যে, এদেশের শিক্ষা পদ্ধতি এখনো মূলত শতবর্ষ পুরনো ব্রিটিশ সরকার প্রণিত শিক্ষা ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হচ্ছে, মৌলিক পরিবর্তন খুব সামান্যই।

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৯২ সাল থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মোট ৬টি শিক্ষানীতি প্রনীত হয়, এই শিক্ষাপদ্ধতি গুলোর মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসকদের দেশ শাসনের সুবিধার্থে একটি করণিক শ্রেণী গড়ে তোলা। পাকিস্তান আমলে আরো ৫টি ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা কমিটি গঠিত হলেও পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ বিরোধী ও সাম্প্রদায়িক চরিত্র বিশিষ্ট হওয়ায় এদেশের গণ মানুষের বিরোধীতায় গ্রহনযোগ্য হয়নি। জনগনের বিরোধীতা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার এই শিক্ষানীতি গুলোর আংশিক বাস্তবায়নে সক্ষম হয়। যা এদেশে একটি শিক্ষিত কুলিন সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করে। কিন্তু অপামার জনসাধারন শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত থেকেই যায়। স্বাধীনতার পরপর বিজ্ঞানী কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় এবং ১৯৭৪ সালে এ কমিটি বাংলাদেশের শিক্ষানীতির একটি পুর্নাঙ্গ রূপরেখা প্রণয়ন করেন, যা বিশেষজ্ঞদের মতে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও পূর্ণঙ্গ শিক্ষানীতি ছিল। দূর্ভাগ্যজনক ভাবে ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকার এই শিক্ষানীতির বাস্তবায়নের পথ রুদ্ধ করে দেয়। পরবর্তী ৩১ বছরে আরো ৭টি শিক্ষাকমিশন গঠন করা হলেও একটি পূর্নাঙ্গ শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, বরং শতবর্ষ পুরনো শিক্ষানীতিকেই সাজানো হয়েছে নতুন পোষাকে, ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রয়োজনে, কাঁটাছেড়া করা হয়েছে ইতিহাসের বইয়ের পাতায়, তরুণ মনে সৃষ্টি করা হয়েছে বিভ্রান্তি।

বিগত সরকারের আমলে প্রণীত মনিরুজ্জামান শিক্ষাকমিশনও স্বাধীনভাবে কাজ করার বদলে সরকারের ইচ্ছামত শিক্ষানীতি প্রনয়ন করেছে, মাদ্রাসা শিক্ষার দাখিল ও কামিলকে স্নাতক ও মাস্টার্সের সমমর্যাদা দেয়ার প্রস্তাব করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং বিগত সরকারের শেষ দিকে ভোট বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে তা বাস্তবায়িতও হয়েছে। যতদিন না আমরা আমাদের দেশের জন্য একটি আধুনিক, বৈজ্ঞানিক, জনস্বার্থ রক্ষাকারি শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে পারছি ততদিন শিক্ষাখাতে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও প্রকৃত ফল পাওয়া যাবেনা বলে আমার মনে হয়। চরমভাবে শ্রেনীবৈষম্যের শিকার এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, সাম্প্রতিক সময়ে এ বৈষম্য প্রকট আকার ধারন করেছে। বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলেও সবার জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ অবধারিত নয়। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলা মিডিয়াম, ইংলিশ মিডিয়াম ও মাদরাসা এই তিনটি বিভাগে বিভক্ত। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মাদরাসা শিক্ষার প্রচলন শুরু করলেও এই প্রাচীনপন্থী এবং কুপমুন্ডূক শিক্ষাব্যবস্থা এখনো আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ আর এই শিক্ষাব্যবস্থার শিকার হচ্ছে দেশের অপেক্ষাকৃত নিন্ম পর্যায়ের প্রান্তিক শ্রেনীর লোকজন। মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের জাতীয় চেতনা ও সংস্কৃতির পরিপন্থি, ছাত্রদেরকে যুগোপযোগী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে অক্ষম এবং সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী তৎপরতা সৃ্িষ্টতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

একই সাথে ইংরেজি মিডিয়ামগুলোও আমাদের জাতীয় চেতনা ও সংস্কৃতির পরিপন্থি এবং বিজাতীয় সংস্কৃতি লালনের মাধ্যমে সমাজের উচ্চবিত্ত্বদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিনত হয়েছে। সেই সাথে বাংলা মিডিয়াম স্বীকৃত হচ্ছে মধ্যবিত্তের শিক্ষা হিসাবে। শিক্ষা ব্যবস্থার এই ব্যপক বৈষম্য সংবিধান পরিপন্থি এবং দেশের মানুষকে করেছে বিভক্ত। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে এই বৈষম্যের স্বরূপ আরো বেশি প্রকট হয়ে দেখা দেয়। উচ্চবিত্তের ইংরেজি মিডিয়াম ও কিন্ডারগার্টেনগুলোয় শিক্ষার মান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর চেয়ে অনেক উন্নত ও আধুনিক, ফলে শিক্ষার প্রাথমিক স্তরেই ধনী ও গরীব ছাত্রদের মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে মেধার বিস্তর বৈষম্য। বর্তমানে শিক্ষার বাণিজ্যমুখী চরিত্র এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য শুধু বিদ্যালয় বা কলেজ যথেষ্ট না হওয়ায় কোচিং সেন্টার, নোট ও গাইড বই বা প্রাইভেট টিউটর বিহীন দরিদ্র ছাত্ররা পিছিয়ে পড়ছে। আগেই উল্লেখ করেছি, শিক্ষা আমাদের দেশে সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার, কিন্তু এখন তা পণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষাকে ভিত্তি করে চলছে একপ্রকার বাণিজ্য, যা কিনা দেশের সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু এই অধিকার বাস্তবায়নে আমাদের রাষ্ট্র নিতান্তই নগন্য ভূমিকা পালন করছে।

বর্তমানে শিক্ষা ব্যয় এতই বৃদ্ধি করা হচ্ছে যা নিু ও মধ্যবিত্তের জন্য হুমকি স্বরূপ। শিক্ষাক্ষেত্রে ইউনেস্কোর সুপারিশ জাতীয় আয়ের ৮% বরাদ্দ দেয়ার কথা থাকলেও বিগত সরকারগুলো বিষয়টি বাস্তবায়িত করেনি। অথচ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে মিগ-২৯, ফ্রিগেট কেনা হয়েছে যা দিয়ে ১০ বছরের জন্য ১৫ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ অথবা ৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা যেত। শিক্ষাখাতে প্রতি বছর বাজেটের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেখানো হলেও সেখানে রয়েছে নানা ধরনের অনিয়ম ও দূর্নীতি। গণশিক্ষার বিস্তার সম্পর্কে জাতিসংঘের একটি আবেদন নিুরূপঃ “শিক্ষার অধিকার হল একটি মৌলিক মানবিক অধিকার। প্রতিটি মানুষের জন্য এই অধিকারকে বাস্তবে পরিনত করতে হবে। মানব প্রগতির ভিত্তি স্থাপন এবং পরিকল্পনা রচনা হয় মানুষের মনে। মানুষের প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও কুশলতার সাহায্যেই এই প্রগতিকে আয়ত্ত করতে হয়। অক্ষরজ্ঞান হল শিক্ষার মূল ভিত্তি; আবার সেই শিক্ষা ভিত্তি স্থাপন করে জাতীয় উন্নয়নের। কাজেই শিক্ষাই হল সামাজিক অগ্রগতির পূর্ব শর্ত। নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিল্পগত উৎকর্ষ, যুদ্ধের ভয় থেকে মুক্তি, মানুষে মানুষে গভীর একাত্মতা ও পারস্পারিক শ্রদ্ধা, প্রগতির আদর্শে অটল বিশ্বাস-এমন মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে সার্বজনীন সংগ্রাম পরিচালিত হোক। শিক্ষা ব্যবস্থাকে হতে হবে সমাজ-বিপ্লবের সঙ্গী, সামাজিক রুপান্তর ও প্রগতির হাতিয়ার। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে বড় কর্তব্য শিক্ষা ক্ষেত্রে শ্রেণী বৈষম্যের অবসান ঘটানো। সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে একমুখী ও জাতীয়করন করা গেলে এই সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। এই জাতীয়করনের অর্থ দাঁড়াবে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মধ্যে রাখা, শহর ও গ্রামের সব বিদ্যালয়ের শিক্ষাদানের মান যথাসম্ভব এক পর্যায়ে আনা, অভিজ্ঞতা ও কাজের পরিমাণের ভিত্তিতে সব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের হারে সমতা নির্ণয় করা।

আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাসূচী যে অনাবশ্যক তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত, বাস্তব জীবনের সঙ্গে তার ক্ষীন সম্পর্ক এবং অনেকটা প্রয়োগমূল্যহীন- এ বিষয়ে দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই। এ শিক্ষা মানুষকে ভদ্রতা আর পান্ডিত্যের মুখোশ এটে দেয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সত্যিকার মনুষ্যত্বের উদ্বোধন ঘটায় না। যে শিশু শিক্ষা জীবনের শুরুতে থাকে প্রাণোচ্ছল, কৌতুহলে উদ্দীপ্ত, বিদ্যালয়ের শিক্ষা পেয়ে সে-ই হয়ে ওঠে নীরস জ্ঞানের ভারে জীর্র্ণ, স্বাধীন সৃজনশীল চিন্তার চেয়ে মুখস্তবিদ্যায় বেশী অভ্যস্ত, উৎপাদনশীল শ্রমে বিমুখ, আত্মসর্বস্ব লক্ষ্যহীন ব্যক্তিত্ব। সমাজ, শিক্ষালয় ও অভিভাবকরা ছাত্রদের উপর শিক্ষার উপর যেয়ে দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেয় তা শিক্ষার্থীকে করে তোলে বিবেক বিবর্জিত অর্থলোভী এক প্রাণীতে। আজ আর কেউ পীড়িতদের সেবা করার জন্যে ডাক্তার হতে চায় না, ডাক্তার হতে চায় অর্থ ও সম্মানের লোভে, প্রকৌশলী হতে চায় একই লোভে, উদ্ভাবন বা সৃষ্টিশীলতার নেশায় নয়। অভিভাকরা ছোট্ট প্রতিভাবান শিশুটিকে নামিয়ে দিচ্ছে ভর্তিযুদ্ধে, সবাই ভালো স্কুলে, ভালো কলেজে যাওয়ার এবং ভালো ফলাফলের দৌড়ে ব্যস্ত হয়ে হারিয়ে বসছে স্বকীয়তা, সৃষ্টিশীলতা। আমরা ভূলে যাই যে, নিউটন, আইনস্টাইন বা এডিসনরা কেউই স্কুলে ভালো ছাত্র ছিলেননা, অভিভাবকরা যদি অল্প বয়সেই তাদেরকে ভর্তিযুদ্ধ, পরীক্ষাযুদ্ধ ও মুখস্তযুদ্ধে নামিয়ে দিত, কি হত তাদের? না জানি কত নিউটন, এডিসনরা আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বলি হয়ে অকালে ঝরে পড়ছে। এক্ষেত্রে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বের দাবী রাখে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর কাছে মুর্তিমান আতংক স্বরূপ, যার ফলে শিক্ষার্থীরা স্কুলবিমুখ হয়ে পড়ে।

স্কুলগুলো আনন্দময় কোন পরিবেশ তৈরি করেনি শিক্ষাদানের জন্য, যাতে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ অনুভব করে। আর পরীক্ষার বিষয়টি শিক্ষার্থীর নিকট আরেকটি ভীতিপ্রদ ঘটনা। ফলে গোটা শিক্ষা বিষয়টিই শিক্ষার্থীর নিকট অসহনীয় হয়ে উঠে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ন। রবীন্দ্রনাথ খুব অল্প কথায় প্রকাশ করেছেন যে, “শিক্ষক কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেই জোটে কিন্তু গুরুতো ফরমাস দিলেই পাওয়া যায় না।” আজ থেকে ৮০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ এদেশের শিক্ষকদের অবস্থার যে করুন বর্ণনা দিয়েছিলেন আজো কি তা প্রায় অপরিবর্তনীয় নয়-“ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দেবার কল। মাষ্টার এই কারখানার একটা অংশ। আমরা যাহাকে স্কুলের শিক্ষক করি তাঁহাকে এমন করিয়া ব্যবহার করি যাহাতে তাঁহার হৃদয় মনের অতি অল্প অংশই কাজে খাটে”। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড এবং শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর। এটি গুরত্বের সাথে অনুধাবন করার বিষয় যে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা অপর্যাপ্ত, কোন কোন ক্ষেত্রে মানবেতরও বটে। তাই জাতি গড়ার কারিগরদের আর্থিক সহ অন্যান্য বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে যাতে তারা অন্য যেকোন কিছুর উপরে জাতি গড়ার কাজে তাদেরকে সম্পূর্ণ ভাবে নিয়োজিত করতে পারে এবং প্রকৃত মেধাবীরা এ পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে উদ্বুদ্ধ হন। পরিশেষে একটি সর্বজনীন, গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন আজ ঐতিহাসিকভাবেই সময়ের দাবীতে পরিনত হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার এই রূপান্তরের কাজে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবকসহ সকলের অগ্রণী ভূমিকা একান্ত কাম্য। লেখকঃ শিক্ষার্থী- সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ইন্ট্যারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ বিসনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলোজি, ঢাকা।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *