ভাষা আন্দোলনে নারীরা

1 (2)প্রথম সকাল ডটকম ডেস্ক: ৫২, বাঙালির ইতিহাসে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছর। ভাষা আন্দোলন এর সাথে সম্পৃক্তদের নামের তালিকা এলেই রফিক, সালাম, জব্বার এর নাম আসে। অথচ এই আন্দোলনে নারীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা অনেকেই জানে না। তখনকার রক্ষণশীল সমাজে নারীদের বাড়ির বাইরে বের হাওয়াই যেখানে অপরাধ বলে বিবেচ্য হত, সেখানে নারীরা ভাষার জন্য পুরুষের সঙ্গী হয়ে লড়াই করেছে যা সত্যিই অসাধারণ। ভাষার দাবীতে নারীরা জীবন বাজী রেখে পুরুষের সাথে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে মিছিল করেছে। স্লোগান দিয়েছে। রাত জেগে পোস্টার লিখেছে।’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের মধ্যে ডা. হালিমা খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, রওশন আরা রেণু, সুফিয়া আহমেদ, তৈফুরা, সুফিয়া খান, ড. শরীফা খাতুন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। ড. সুফিয়া আহমদের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।’ এই পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সভা, হরতাল, বিক্ষোভ মিছিল ইত্যাদি কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টায় ছিল গণপরিষদের অধিবেশন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য স্মারকলিপি প্রদানের উদ্দেশ্যে গণপরিষদের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচিও ছিল। ছাত্রসমাজের এমন কর্মসূচিতে বিচলিত বোধ করে সরকার। তখন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নূরুল আমীন। তাঁর সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করে।

২১ তারিখ সকাল থেকে ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জমায়েত হয়। কারণ, ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাঁরা। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ড. সুফিয়া আহমদ স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, তাঁর ওপর দায়িত্ব পড়েছিল আনন্দময়ী ও বাংলাবাজার স্কুলের মেয়েদের জড়ো করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় নিয়ে আসার। তিনি কাজটি করেছিলেন। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ছেলেরা দশজন করে এবং মেয়েরা চারজন করে বের হয়ে পুলিশের ব্যারিকেড পার হয়ে এগিয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, প্রথমে ছাত্রদের দুটি দল মিছিল নিয়ে বের হলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে ট্রাকে তোলে। তৃতীয় দল নিয়ে বের হয় মেয়েরা। কিছুদূর যাওয়ার পর শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ। টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়। তিনি সামান্য আহত হয়েছিলেন। ড. হালিমা খাতুন ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদেরই একজন। তাঁর স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়, সক্রিয় অংশগ্রহণের চিত্র। তিনি বলেন, ১৪৪ ধারা ভাঙা নিয়ে তুমুল উত্তেজনা ছিল তাঁদের। তাঁর ওপর দায়িত্ব ছিল মুসলিম গার্লস স্কুল এবং বাংলাবাজার গার্লস স্কুল থেকে মেয়েদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আসা। ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁর দল ছিল মেয়েদের প্রথম দল। পুলিশ পথ আটকালে তাঁরা পুলিশের রাইফেল ঠেলে স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যান। পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং টিয়ারগ্যাস ছোড়ে। তাঁরা বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সি থেকে প্রাথমিক চিকিসা নিয়ে আবার রাস্তায় নেমে আসেন এবং গণপরিষদ ভবনের দিকে এগোতে থাকেন। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারেননি তাঁরা। শুরু হয় পুলিশের গুলিবর্ষণ।

রওশন আরা বাচ্চু সেদিনের স্মৃতিচারণে বলেছেন, তিনি দেখতে পান, ছাত্রদের দুটো দল পুলিশের ব্যারিকেড টপকে চলে যায়। এর পরই তিনি অন্যদের নিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ান। তাঁকে সামনে পেয়ে পুলিশের লাঠিচার্জের আঘাত এসে পড়ে তাঁর ওপরে। তিনি পুলিশের এলোপাথাড়ি লাঠিপেটায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। গুলিবর্ষণ শুরু হলে রাস্তার পাশের একটি পুরনো রিকশার গ্যারেজে লুকিয়ে থাকেন। অনেকক্ষণ সেখানে থেকে সন্ধ্যায় ছাত্রী হোস্টেলে ফিরে যান। একুশের প্রথম শহীদ ছিলেন রফিকউদ্দীন। তাঁর মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। ঘটনার পরপরই এই ঐতিহাসিক দৃশ্যের ছবি তোলেন আমানুল হক কাজী ইদ্রিস এবং মেডিকেল ছাত্রী হালিমা খাতুনের সহযোগিতায়। সেদিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের সেবা দিতে গিয়ে ক্রোধে ফেটে পড়েছিলেন হাসপাতালের সেবিকা মেয়েরা। প্রতিরোধের জায়গাটি এভাবে তাদের সহযোগিতা, সমর্থনে দীপ্ত হয়ে উঠেছিল।

১৯৬০ সালে আসাম ভাষা আইন পাস হয়। এই আইনে অসমীয়া ভাষাকে আসামের রাজ্য ভাষা করা হয়। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেল স্টেশনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন এগারো জন। একজনের লাশ গুম করার জন্য পুলিশ পাশের পুকুরে ফেলে দিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের কর্মীরা সেই লাশ খুঁজে বের করে। এই আন্দোলনের পর আসাম সরকার ভাষা আইন সংশোধন করে এবং বরাক উপত্যকার জন্য সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা বহাল থাকে। ১৯ মে বরাক উপত্যকার শহীদ দিবস। যে এগারো জন শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন নারী। তাঁর নাম কমলা ভট্টাচার্য। ঢাকার বাইরে যে নারীদের ভূমিকার কথা জানা যায় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য “মমতাজ বেগম”। সময়টা ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ভাষা আন্দোলনের মিছিলে ছাত্রদের উপর পুলিশের বর্বর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে সামরিক বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নারায়ণগঞ্জ এর মর্গান হাইস্কুলের ৩০০ ছাত্রী নিয়ে মিছিল করেছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম। যা পরবর্তীতে ‘ইভনিং টাইমস’ নামে সংবাদ পত্রের শিরোনাম হয়। ইতিহাস এর পাতা থেকে অনেক নারীর ভূমিকা হারিয়ে গেছে। রাজিয়া বেগম নামে একজন নারী জানান, তিনি ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তান থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। বাবার কড়া শাসন উপেক্ষা করে ভাষা সৈনিকদের জন্য খাবার নিয়ে যেতেন। হাত খরচের টাকা দিতেন পোস্টারে জন্য।এমন অনেক নারী সৈনিক ছিলেন যাদের কথা আমরা জানি না। কিন্তু এসব অকুতোভয় নারীদের প্রতি রয়েছে প্রত্যেক বাঙালির স্বশ্রদ্ধ সালাম। তারা বেঁচে থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে। সুত্র:-উইমেন নিউজ

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *