২১ শে ফেব্রুয়ারীর যা ছিল প্রথম

1 (4)প্রথম সকাল ডটকম ডেস্ক: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত যা যা প্রথম ঘটেছিল এখানে তা তুলে ধরা হয়েছে। আশা করি পাঠকদের পড়ে ভাল লাগবে। প্রথম শহীদ:- একুশের প্রথম শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ। তিনি ছিলেন মানিকগঞ্জের আবদুল লতিফের বড় ছেলে। তাঁর মায়ের নাম রাফিজা খাতুন। সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামে ছিল তাঁদের বাড়ি। ঘটনার সময় শহীদ রফিকের বয়স হয়েছিল ২৬ বছর। পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের কারণে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ব্যারাকে আশ্রয় নেওয়ার সময় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন রফিক। গুলিতে তাঁর মাথার খুলি উড়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তখনই মারা যান তিনি। প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ওবায়দুল্লাহর উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা পড়ান আজিমপুর মসজিদের ইমাম হাফেজ আবদুল গফুর। সংগোপনে, আত্মীয়-স্বজনের অজ্ঞাতে আজিমপুর কবরস্থানের অসংরক্ষিত এলাকায় দাফন করা হয় শহীদ রফিকের মরদেহ।

প্রথম লিফলেট:- একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তাক্ত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় একটা কিছু করার তাগিদে ওই দিনই সন্ধ্যায় আলাউদ্দিন আল আজাদ, মুস্তফা নূরউল ইসলাম, ফজলে লোহানী, হাসান হাফিজুর রহমান পাটুয়াটুলির সওগাত অফিসের বিপরীত গলিতে অবস্থিত পাইওনিয়ার প্রেসে যান। দুটি টেবিলে বসে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাঁরা লিখে ফেলেন কয়েকটি প্রবন্ধ, নিবন্ধ। তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি হয়ে যায় একটি বুলেটিন। ‘বিপ্লবের কোদাল দিয়ে আমরা অত্যাচারী, শাসকগোষ্ঠীর কবর রচনা করব। বুলেটিনে লিখেছিলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। এটি ছাপানোর দায়িত্ব পালন করেন হাসান হাফিজুর রহমান। পরে লিফলেট প্রসঙ্গে তিনি জানান, আমি, আমীর আলী (লন্ডনপ্রবাসী) আর একজন আমার সঙ্গে ছিল। আমরা তিনজন জেলখানার উল্টোদিকে ক্যাপিটাল প্রেসে চলে যাই। সেখানে ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে প্রুফ দেখে লিফলেটটি ছাপিয়ে আনি। প্রেসটি সেদিন আমাদের সর্বাত্মক সহায়তা করে। রাতেই লিফলেটটি বিশ্ববিদ্যালয় ও পলাশী ব্যারাক এলাকায় বিলি করে ভাষা আন্দোলনের কয়েকজন কর্মী। প্রথম সংকলন:- একুশের প্রথম সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি। সম্পাদনা করেন হাসান হাফিজুর রহমান। ‘৫৩ সালে পুথিপত্র থেকে এটি প্রকাশ করেন বিশিষ্ট রাজনৈতিককর্মী মোহাম্মদ সুলতান। আলী আশরাফ, শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গণি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিস চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, জামালউদ্দিন, আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান, শওকত হোসেন, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম, আতোয়ার রহমান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, তোফাজ্জল হোসেন, কবির উদ্দিন আহমদের লেখায় সমৃদ্ধ এই সংকলনের অসাধারণ স্কেচগুলো করেন মুর্তজা বশীর। হাসান হাফিজুর রহমানের অনুরোধে নিজ হাতে উৎসর্গপত্রটি লিখে দেন আনিসুজ্জামান। পাইওনিয়ার প্রেসের পক্ষে এম এ মুকিত ছেপেছেন এবং ব্লক তৈরি করেছে এইচম্যান কোম্পানি, বাদামতলী, ঢাকা। ক্রাউন সাইজের ১৮৩ পৃষ্ঠার এ সংখ্যাটির দাম রাখা হয়েছিল দুই টাকা আট আনা। মায়ের গয়না বিক্রি করে সংকলনটি প্রকাশের টাকা জোগাড় করেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। এটি প্রকাশিত হওয়ার পর প্রকাশকের আস্তানায় তল্লাশি চালায় পুলিশ। শেষ পর্যন্ত সংকলনটিকে নিষিদ্ধ করে সরকার। পরে ’৫৬ সালে আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

একুশের প্রথম স্মরণিকা:- ঢাকা কলেজ ছাত্রাবাসের পক্ষ থেকে ‘৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চার পৃষ্ঠার পুস্তিকা শহীদের স্মরণে একুশের প্রথম স্মরণিকা। শুরুতেই আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই/নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। পরে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বন্দী থাকা হীন অপমান হাঁকবে যে বীর তরুণ/শিরদাঁড়া যার শক্ত তাজা রক্ত যাহার অরুণ’। এ পুস্তিকাতেই ছাপা হয় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। এ ছাড়া স্মরণিকায় ছিল ‘আমাদের কথা’ ও ‘ভুলি নাই রক্তরাঙা একুশের কথা’ শিরোনামের দুটি ছোট নিবন্ধ। ‘ঢাকা কলেজ ছাত্রাবাসের পক্ষ থেকে জাতীয় জীবনে চির্নরণীয় একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, সেই বীর শহীদদের স্মরণে’ উৎসর্গ করা হয় এই স্মরণিকা। এটিতে একটি আবেদনও ছিলঃ ‘নিজে পড়িয়া অপরকে পড়িতে দিন।’ শহীদ মিনার ধ্বংসের প্রতিবাদে প্রথম কবিতা ’৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশের হাতে প্রথম শহীদ মিনার ধ্বংসের প্রতিক্রিয়ায় কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ রচনা করেন ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। ঐতিহাসিক এই কবিতাটির কয়েকটি চরণ-‘স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু আমরা এখনো/চারকোটি পরিবার/খাড়া রয়েছি তো। যে-ভিৎ কখনো কোনো রাজন্য/পারেনি ভাঙ্গতে। প্রথম শহীদ মিনার ভাঙার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। পুলিশের এ নির্মমতা তাঁর হৃদয়কে বেদনাহত করে, তাঁকে বিদ্রোহী করে তোলে। পুলিশের হাতে প্রথম শহীদ মিনার ধ্বংসের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ইকবাল হলে বসে সঙ্গে সঙ্গেই এই কবিতাটি রচনা করেন। প্রথম কবিতা একুশের প্রথম কবিতাটি লেখেন মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী। কবিতাটির নাম ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। তখন তিনি প্রগতিশীল মাসিক সীমান্তর সম্পাদক এবং চট্টগ্রামের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৭ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকায় ছাপা হয় কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি। বইটির দাম রাখা হয় দুই আনা। ওই দিনই চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের জনসভায় রাজনৈতিক কর্মী হারুনূর রশীদ কবিতাটি পাঠ করে শোনান। কবিতাটি ছাপানোর সময় চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার কোহিনূর প্রেসে হামলা চালায় পুলিশ। কিন্তু প্রেসের কর্মীরা আগেভাগেই পাণ্ডুলিপি, সাজানো ম্যাটার ও মুদ্রিত কপি গোপন করে ফেলতে সক্ষম হন। পুলিশ চলে গেলে আবার নতুন করে শুরু হয় ছাপার কাজ। প্রকাশের পর কবিতাটি বাজেয়াপ্ত করে সরকার, কবির বিরুদ্ধে জারি করে হুলিয়া। আর এটি ছাপার অপরাধে কোহিনূর প্রেসের ম্যানেজার দবির আহমেদ চৌধুরী ও প্রথম পাঠক চৌধুরী হারুনূর রশীদকে দীর্ঘ কারাবাস করতে হয়।

প্রথম গান:- একুশের প্রথম গান রচনা করেন ভাষাসৈনিক আ ন ম গাজীউল হক। গানটির প্রথম চরণ ‘ভুলব না, ভুলব না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’। এটি সে সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘দূর হটো দূর হটো আই দুনিয়াওয়ালো, হিন্দুস্তান হামারা হায়’-জনপ্রিয় এ হিন্দিগান থেকে নেওয়া হয় গানটির সুর। ‘৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আরমানিটোলা ময়দানে আয়োজিত এক জনসভায় গানটি প্রথম গাওয়া হয়। এ সম্পর্কে গাজীউল হক তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছেন, ‘সভায় শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধে ভাষা আন্দোলনের ওপর লেখা গানটি আমাকে গেয়ে শোনাতে হয়। সময়ের প্রয়োজনেই গানটি লিখেছিলাম। একুশের প্রথম গান ও গানের রচয়িতা সম্পর্কে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ রচনার আগেই গাজী ভাই (গাজীউল হক) লিখেছিলেন ‘ভুলবো না ভুলবো না’। এটাই ছিল তখনকার দিনে রাজপথের গান। এ গানটি খুব পপুলার হয়েছিল। সবাই এ গান গাইত। প্রভাতফেরির প্রথম গান:- ‘৫৩ সালে প্রথম শহীদ দিবসের প্রথম প্রভাতফেরিতে গাওয়া হলো ‘মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল/ভাষা বাঁচাবার তরে/আজিকে স্মৃরিও তারে। গানটির রচয়িতা প্রকৌশলী মোশারেফউদ্দিন আহমদ। ’৫৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে লেখা হয়েছিল এ গান। হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ লিখেছেন, ‘সেই সংগীতই হয়ে ওঠে অমর একুশের প্রথম বার্ষিকীর প্রভাতফেরির গান। আলতাফ মাহমুদের অপূর্ব সুর সংযোজন। আলতাফের সঙ্গে প্রথম কণ্ঠ মেলান শিল্পী সংসদের নিজামুল হক, মোমিনুল হক, ছাত্রনেতা গাজীউল হক। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, ‘৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরির গান হিসেবে গাজী ভাইয়ের গানের পরিবর্তে ‘আজিকে ্নরিও তারে’ গানটি গাওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে গবেষক আহমদ রফিক বলেছেন, ‘৫৩ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাতফেরিতে যে গানটি গাওয়া হয়, তা আজ অনেকে ভুলে গেছেন। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তা স্বীকারও করা হয় না। গানটির রচয়িতা মোশারেফ উদ্দিন আহমদের বাড়ি বরিশাল।

প্রথম নাটক:- একুশের প্রথম নাটক মুনীর চৌধুরীর কবর। ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার ‘অপরাধে’ ‘৫২ সালে জেলে আটক ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত ও মুনীর চৌধুরীসহ অনেক লেখক-সাংবাদিক। রণেশ দাশগুপ্ত অন্য সেলে আটক মুনীর চৌধুরীকে ভাষা আন্দোলনের ওপর একটি নাটক লিখে দেওয়ার অনুরোধ করে একটি চিরকুট পাঠান। শহীদ দিবসে রাজবন্দীরাই নাটকটি মঞ্চস্থ করবে, জেলে মঞ্চসজ্জা ও আলোর ব্যবস্থা করা যাবে না। তাই মুনীর চৌধুরীকে বলা হয়, নাটকটি এমনভাবে লিখতে হবে, যাতে খুব সহজে জেলেই এটি অভিনয় করা যায়। মুনীর চৌধুরী ‘৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি নাটকটি লিখে শেষ করেন। ওই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি, রাত ১০টায় জেলকক্ষগুলোর বাতি নিভিয়ে দেওয়ার পর হ্যারিকেনের আলো-আঁধারিতে মঞ্চস্থ হয় কবর। অভিনয়ে অংশ নেন বন্দী নলিনী দাস, অজয় রায় প্রমুখ। প্রথম উপন্যাস:- অমর একুশের ওপর লেখা প্রথম উপন্যাস আরেক ফাল্গুন। শহীদ দিবস পালন, একুশের মিটিং-মিছিল, সরকারি বাধা, শহীদ মিনার নির্মাণসহ একুশের স্মৃতিবিজড়িত নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটি লিখেছেন জহির রায়হান। পঞ্চাশের দশকেই এটি পত্রিকায় ছাপা হয়, বই আকারে বের হয় ৬৯ সালে। একুশের ইতিহাস নিয়ে প্রথম বই:- ‘৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার মাত্র তিন মাস পর ভাষা আন্দোলন ও একুশের ইতিহাস নিয়ে লেখা হয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। গ্রন্থটির সম্পাদক অধ্যাপক (পরে প্রিন্সিপাল) আবুল কাসেম। ‘৫২ সালের জুন মাসে ‘আমাদের প্রেস’ থেকে মুদ্রিত এবং তমদ্দুন লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত হয় এ বই। প্রথম সংস্করণে প্রিন্টার্স লাইনে লেখা আছে-প্রকাশনায় হাসান ইকবাল, ১৯ নম্বর আজিমপুর রোড, ঢাকা। মুদ্রণে এন আর জামালী, ‘আমাদের প্রেস’ ১৯ আজিমপুর রোড, ঢাকা। প্রাপ্তিস্থান তমদ্দুন লাইব্রেরি, ১৯ আজিমপুর, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ জুন ১৯৫২। দাম চার আনা। দুই কভারসহ মোট ৪০ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থটির সাইজ ৭•৫ ইঞ্চি বাই ৫ ইঞ্চি। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে এবং তৃতীয় সংস্করণ ‘৬৯ সালের মার্চে।

প্রথম শহীদ মিনার:- কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের যে চেহারা আজ আমরা দেখি, আদিতে তার রূপ কিন্তু মোটেও এমন ছিল না। তখন এটি ছিল ১১ ফুট লম্বা ত্রিস্তরবিশিষ্ট একটি স্তম্ভ। ২৩ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রনেতা গোলাম মওলা ও তাঁর সহযোগীদের উদ্যোগে স্তম্ভটি রাতারাতি গড়ে তোলে প্রায় ৩০০ মানুষ। এদের বেশির ভাগই ছিলেন মেডিকেলের ছাত্র। এই স্তম্ভের মূল নকশা করেছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র বদরুল আলম। নকশা থেকে শুরু করে নির্মাণ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্তরের সঙ্গে জড়িত ছিলেন মেডিকেলের আরেক ছাত্র সাঈদ হায়দার। মিলিটারি কারফিউ আর হাড় হিম করা শীত উপেক্ষা করে তৈরি করা এই শহীদ মিনার দেখতে পরদিন ভিড় জমায় শত শত মানুষ। মিনারতলে ফুল থেকে শুরু করে টাকা-পয়সা পর্যন্ত অনেক কিছুই দান করতে থাকে তারা। নাম না-জানা এক নারী দান করেন তাঁর গলার হার। শাসকশ্রেণী বেশি দিন সহ্য করেনি এই মিনার। তৈরির তিন দিন পর তাদের নির্দেশে মিনারটি শুধু ধ্বংসই করেনি পুলিশ, পাশাপাশি ধ্বংসাবশেষও নিয়ে যায় তারা। তবে খুব বেশি দিন বাঙালিকে মিনারবিহীন রাখতে পারেনি তারা। চার বছরের মধ্যে আবার তৈরি হয় মিনার। সেই মিনার আরও বড়, আরও উঁচু, আরও সংহত। প্রথম শহীদ দিবস:- ‘৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো পালন করা হয় শহীদ দিবস। ওই দিন বিভিন্ন স্তরের ও শ্রেণীর মানুষ বিশেষ করে মহিলা খালি পায়ে ও সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত দীর্ঘ শোভাযাত্রা নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে। দলে দলে নগরবাসী আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে ও কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে। বেলা ১২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হয় শোভাযাত্রীরা। ১২টার সময় সেখান থেকে সুশৃঙ্খল ও সুনিয়ন্ত্রিতভাবে বের হয় তারা। শোভাযাত্রীরা শোকজ্ঞাপক কালো পতাকা, কালো ব্যাজ ধারণ করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’ প্রভৃতি শ্লোগান সহকারে অগ্রসর হতে থাকে।

প্রথম নিয়ন্ত্রণকক্ষ:- একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের পর ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ২০ নম্বর ব্যারাকের ১ নম্বর কক্ষে স্থাপন করা হয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ বা কন্ট্রোল রুম। এখান থেকেই পরিচালিত হতে থাকে আন্দোলন। এই কক্ষ থেকেই মাইকে জ্বালাময়ী বক্তৃতা, উদ্দীপনামূলক গান এবং আন্দোলনের নানা কর্মসূচি ঘোষণা করা হতো। মাইকটি লাগানো হয়েছিল ব্যারাকের উত্তর-পশ্চিম কোনায় অবস্থিত আম বাগানের ডালে। একেবারে পরিষদ ভবনের নাকের ডগায়। কন্ট্রোল রুম স্থাপন ও প্রচারকাজে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররাই ছিল অগ্রণী। প্রথম প্রকাশ্য জনসভা:- একুশের শহীদদের স্মরণে ‘৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গায়েবানা জানাজার পর একটি সংক্ষিপ্ত সভা হয়। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মহম্মদ এমাদুল্লাহ। সভাপতির ভাষণে তিনি দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। সভাপতির ভাষণের আগে একমাত্র অলি আহাদই এ সভায় বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘নূরুল আমীন সরকারের হত্যার জবাব দিব ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে। আইন পরিষদ থেকে পদত্যাগকারী প্রথম সদস্য:- ‘৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেন। গভর্নর ও পরিষদের স্পিকারকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি বলেন, ‘বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা দাবি করায় ছাত্রদের উপর পুলিশ যে বর্বরতার পরিচয় দিয়াছে, তাহার প্রতিবাদে আমি পরিষদে আমার সদস্যপদ হইতে পদত্যাগ করিতেছি। যে নূরুল আমীন সরকারের আমিও একজন সমর্থক, এ ব্যাপারে তাহাদের ভূমিকা এত দূর লজ্জাজনক যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এই দলের সহিত সংযুক্ত থাকিতে এবং পরিষদের সদস্য হিসাবে বহাল থাকিতে আমি লজ্জাবোধ করিতেছি। আবুল কালাম শামসুদ্দীনই প্রথম সদস্য, যিনি একুশের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আইন পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন।

প্রথম মিছিল:- ’৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গায়েবি জানাজা শেষে সমবেত হাজার হাজার ছাত্র, শ্রমিক, সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীসহ সর্বস্তরের জনগণ বিশাল মিছিল নিয়ে হাইকোর্টের পথ ধরে নবাবপুর রোডের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘খুনী নূরুল আমীনের বিচার চাই’, ‘খুনের বদলে খুন চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে দিতে মিছিলটি হাইকোর্টের গেটের সামনে উপস্থিত হলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ তাদের পথ রোধ করে। মিছিলটি সেক্রেটারিয়েটের পাশ দিয়ে আবদুল গণি রোড ধরে অগ্রসর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মিছিল গণি রোডের দিকে মোড় নিতে শুরু করামাত্র পুলিশ একই সঙ্গে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ শুরু করে। মিছিলকারীদের অনেকেই এ সময় ফজলুল হক হল, কার্জন হল, ঢাকা হলসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ও হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আশ্রয় গ্রহণ করে। প্রথম বক্তব্য:- ‘৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বেলা সাড়ে তিনটায় পূর্ববঙ্গ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়। মাত্র ঘণ্টা কয়েক আগে ছাত্রদের ওপর গুলি চালনার প্রতিবাদে অধিবেশন সেদিনের জন্য স্থগিত রাখার দাবি জানান আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। তিনি বলেন, ‘জনাব স্পিকার সাহেব, প্রশ্নোত্তরের পূর্বে আমি আপনার কাছে একটা নিবেদন করতে চাই। যখন দেশের ছাত্ররা, যারা আমাদের ভাবী আশা-ভরসাস্থল, পুলিশের গুলির আঘাতে জীবনলীলা সাঙ্গ করছে, সেই সময় আমরা এখানে বসে সভা করতে চাই না। প্রথমে ইনকোয়ারি তারপর হাউস চলবে। একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে এটাই ছিল আইন পরিষদে প্রথম বক্তব্য। প্রথম বাংলায় বক্তৃতা:- ‘৫২ সালের ১২ আগস্ট সব ভ্রূকুটি অগ্রাহ্য করে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলায় বক্তৃতা শুরু করেন। পশ্চিম পাকিস্তানি গণপরিষদ সদস্যরা নানা উপহাস করে এ সময় তর্কবাগীশকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু উপহাস উপেক্ষা করেই তর্কবাগীশ বাংলায় বক্তব্য দেন। বাংলায় বক্তৃতা রেকর্ড করার জন্য ওই সময় আইনসভায় কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মাওলানা তর্কবাগীশ বেশ কয়েকবার স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণের পর পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা বক্তৃতা রেকর্ড করার জন্য লোক নিয়োগ করা হয়।

প্রথম ইশতেহার:- একুশে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের পর ওই দিনই পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ববঙ্গ কমিটি ‘অত্যাচারী নূরুল আমীন সরকারের বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সারা পূর্ববঙ্গব্যাপী তুমূল ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়িয়া তুলুন’ শীর্ষক একটি ইশতেহার প্রচার করে। সাইক্লোস্টাইল করা এ ইশতেহারই ছিল একুশের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে প্রথম ইশতেহার। একুশে স্মরণে প্রথম বিশেষ সংখ্যা:- একুশে ফেব্রুয়ারির গুলি ও ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে হরতাল পালিত হয়। ওই দিন মিছিলে আবার গুলি চালায় পুলিশ। হতাহত হয় বহু ছাত্র-জনতা। একুশের এই রক্তাক্ত ঘটনার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সৈনিক-এর শহীদ সংখ্যা। সকালে পত্রিকা প্রকাশের মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যায় এক হাজার কপি এবং পরে পুনর্মুদ্রণ করা হয়। এটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের স্মরণে কোনো পত্রিকার প্রথম বিশেষ সংখ্যা। লেখাটি ভালো লাগলে সবার সাথে শেয়ার করুন। তথ্যসুত্র:- দৈনিক প্রথম আলো এবং অমর একুশে ও আর জি

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *