শহীদ মিনার (গল্প)

6 (6)নূরুল ইসলাম নূরচান: রফিক সাহেবের বাড়ির উত্তর পাশের কলা বাগানটি বেশ বড়, ছিমছাম ও সুন্দর। বাগানটি রফিক সাহেব নিজে করেন নি, বর্গা দেয়া। কলা বাগানের প্রায় সবগুলো গাছে ছড়া ধরেছে, ইতোমধ্যে বেশ কিছু গাছ থেকে ছড়া কেটে তা বিক্রি করা হয়ে গেছে। বর্গা চাষি এসে রফিক সাহেবের নিকট বলল, ‘চাচা, কলাবাগ থেকে কে যেন সাতটি কলা গাছ কাইট্যা লইয়া গেছে গা, এক্কেবারে গোড়া থেকে। রফিক সাহেব এ কথা শুনে অবাক, ‘বলো কী, কলার ছড়িসহ নাকি শুধু গাছ? ‘ছড়িসহ না চাচা, খালি গাছ। ‘আচ্ছা তুমি যাও, আমি দেখছি বিষয়টি;কারা করল এ কাজ। সাতটি অর্থব কলা গাছ কেটে ফেলার জন্য এত বড় সালিশ ডাকার কোনও প্রয়োজন ছিলনা।এমন মন্তব্য সালিশে আসা কারো কারো মুখে উচ্চারিত হচ্ছে নিচুস্বরে। অথচ এমন একটি কাজই করেছেন রফিক সাহেব। বাগানের সাতটি গাছ থেকে কলার ছড়া কেটে ফেলার পর গাছগুলো র্পূণ দন্ডায়মান ছিল। রফিক সাহেব জানতে পেরেছেন কলার গাছগুলো কেটে নিয়ে গেছে পাশের গ্রামের তিন তরুণ, ওই তিন তরুণের বিরুদ্ধেই এ সালিশ ডেকেছেন তিনি।

রফিক সাহেবের বাড়-বাড়িতে বসা সালিশে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাধারণ নারী-পুরুষও উপস্থিত হয়েছে। কলাবাগানের বর্গা চাষি এবং রফিক সাহেবের বক্তব্য হল, কলার ছড়া কাটার পর গাছগুলো রাখা হয়েছিল তা থেকে নতুন চারা গজানো এবং আগে গজানো চারাগুলো হৃষ্টপুষ্ট হওয়ার জন্য। কিন্তু গোড়া থেকে কলা গাছগুলো কেটে ফেলার কারণে এখন আর কলাচারা জন্মাবেনা এবং আগে জন্মানো চারা সুস্থ-সুন্দর ও হবে না। বৃত্তাকারে বসা সালিশের মাঝখানে বসা নিত তরুণ। আচানক ব্যাপার হলো, এতগুলো লোকের সামনে বসা তিন তরুণের মধ্যে কোন ভয় বা অপরাধবোধ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ভয় অথবা সংকোচের পরিবর্তে ওরা বরং স্বগর্বে বসে রয়েছে ভরা মজলিশে। এরি মধ্যে তিনজনই অকপটে স্বীকারও করেছে যে, ওরাই রফিক সাহেবের কলা বাগান থেকে সাতটি কলা গাছ কেটে নিয়েছে। রফিক সাহেব উচ্চ পদস্থ সরকারি কমকর্তা ছিলেন। অল্প দিন হয় অবসর গ্রহণের পর বাড়িতে চলে এসেছেন। আগে তিনি ঢাকায় থাকতেন সপরিবারে।

ঢাকায় তাকলেও নিজ গ্রামসহ আশপাশে যথেষ্ট সুনাম পরিচিতি রয়েছে রফিক সাহেবের। সালিশে উভয় পক্ষের মধ্যে অনেক কথাবার্তা শেষে তিন তরুণ দোষী সাব্যস্ত হল। সালিশের এক কোনায় বসে থাকা এক বৃদ্ধ এতক্ষণ কোন কথা বলেননি, শুধু শুনেছেন। এখন তিনি হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে ওঠে দাঁড়ালেন। এবং বিনয়ের স্বরে বললেন, ‘রফিক কাহা, এই পোলাপানগ কোন দোষ নাই। আমিই তাগরে কইছিলাম, আপনের কলা বাগ থাইক্যা কলাগাছ কাইট্যা নিয়া একটি শহীদ মিনার বানাইত। তাই তারা কলা গাছ কাইট্যা নিয়া আমাগ হাই ইশকুলের মাডে শহীদ মিনার বানাইছে। আপনে হয়তো জানেন না কাহা, আমাগ এলাকার দুই তিন মাইলের মদ্যে কোন শহীদ মিনার নাই। তাই পরত্যেক বছর কলা গাছ আর বাঁশের জিংলা দিয়া শহীদ মিনার বানাইয়া তাতে ফুল দেই আমরা।

এক নাগারে কথগুলো বলে একটু দম নিলেন বৃদ্ধ। তারপর বললেন,‘এহন শাস্তি যুদি দিতে অয় তয় আমারে দেন, কাহা। বসা থেকে ওঠে দাঁড়ালেন রফিক সাহেব। তারপর ধরা গলায় বললেন, ‘না, না, চাচা, কলা গাছ কেটে নিয়ে আপনারা কোন অন্যায় করেননি বরং অতি উত্তম একটি কাজ করেছেন। এজন্য আমি আপনাদেরকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আমাদের মায়ের ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। অথচ তাঁদেরকে স্মরণ করা এবং শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য পর্যাপ্ত শহীদ মিনার নেই এটা অত্যন্ত লজ্জাকর ব্যাপার। এ ছেলেগুলো যদি আগেই বলত যে, কলাগাছ নিয়ে ওরা শহীদ মিনার বানিয়েছে তাহলে সালিশ-দরবার ডাকতাম না, আমি। রফিক সাহেব অনেকটা অনুতপ্ত, অনুশোচনার স্বরে পুনরায় বললেন, ‘চাচা,আর কোন সময় কলা গাছ দিয়ে শহীদ মিনার বানাতে হবেনা আপনাদের।…….. হাইস্কুল মাঠে আমি আগামীকালই একটি সুন্দর শহীদ মিনার তৈরির ব্যবস্থা করব। সে শহীদ মিনারেই আমরা আাগামী একুশে ফেব্রুয়ারি তথা আন্তর্জাতিক মাতৃক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভাষা শহীদদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা নিবেদন করব।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *