ছড়াকার আবু আসাদের স্বপ্ন পূরণ হবে কবে?

52 copyনূরুল ইসলাম নূরচান: প্রথা বিরোধী ছড়াকার আবু আসাদের তৃতীয় মৃত্যু বার্ষিকী গত ১৪ জানুয়ারি (২০১৫) পালিত হয়েছে। সে শুধু ছড়াকার ছিলেন না, শিশু-কিশোর ছড়া কবিতার পাশাপাশি প্রচুর গান, দুটি যাত্রাপালা এবং তিন চারটি নাটিকা লেখে ছিলেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ বেতার থেকে ছড়া নাটিকা ‘বর্ষা এলো বৃষ্টি হলো’ সম্প্রচার করা হয়। এ নাটিককার জন্য আবু আসাদ পুরস্কারও পেয়েছিলেন। আবু আসাদের জন্মস্থান নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার খইশাখালী গ্রামে। অত্যন্ত পারিতাপের বিষয় হলো, সে দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর যাবৎ দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাক ও ভোরের ডাকসহ জাতীয় পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করলেও সে গুলো গ্রন্থিত করতে পারেননি অর্থাভাবে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ২০১০ সালের মে মাসে তার ‘আমার দেখা স্বাধীনতা’ শিরোনামে একটি ছড়া কবিতার বই প্রকাশ করেছিলেন। এ বইয়ের প্রথম এবং শেষ ছড়াটি হলো ‘চক্রাকারে বিমানগুলো ঘুরতে দেখেছি/সর্বনাশা নিঠুর বোমা ছুঁড়তে দেখেছি/কেউটে ফণায় কালো ধোঁয়া উড়তে দেখেছি/অগ্নিশিখায় বাংলা আমার পুড়তে দেখেছি/দিগবেদিকে বাঙ্গালিকে ছুটতে দেখেছি/শহর ছেড়ে গাঁও-গেরামে জুটতে দেখেছি/বীর-দাপটে মৃত্যুভীতি টুটতে দেখেছি/স্বাধীনতার স্বপ্নে জেগে উঠতে দেখেছি/বনবাদাড়ে দামালদেরকে থাকতে দেখেছি/সব হারিয়ে অশ্রু তবু ঢাকতে দেখেছি/ধর্ম ও দল ভুলে কাছে ডাকতে দেখেছি/স্বদেশ ভূমির মানচিত্র আঁকতে দেখেছি/চারদিকে লাল রক্ত শুধু ঝরতে দেখেছি/বীর ছেলেদের অস্ত্র হাতে ধরতে দেখেছি/পাক বাহিনীর সাথে হেসে লড়তে দেখেছি/রাজকারকে বিরোধিতা করতে দেখেছি/মা-বোনকে চেখের জলে ভাসতে দেখেছি/স্বদেশ মাকে তবু ভালোবাসতে দেখেছি/রক্ত-রাঙা সূর্য পুবে হাসতে দেখেছি/পাখির ডানায় স্বাধীনতা আসতে দেখেছি; বন-বনানীর লতা পাতায়/শিমুল পলাশ জবার খাতায়/কৃষ্ণচুড়ার মিতে পাতায়/কী অপরূপ বেশ/আকাশচূড়ে ওই পতাকায়/লাল সবুজের দেশ/ঘাস শিশিরে রৌদ্র লোটে/দিঘির জলে শাপলা ফোটে/টিয়ের পালক- মালায়-ঠোঁটে/এটা-ই করে পেশ/আকাশচূড়ে ওই পতাকায়/লাল সবুজের দেশ/কাক-কোকিলের সুর-গীতিতে/সিঁদুর পরা মা-র সিঁথিতে/আকাশ সাজে সেই রীতিতে/রাতটা হলে শেষ/আকাশচূড়ে ওই পতাকায়/লাল সবুজের দেশ’। এর আগে আবু আসাদের ‘বাঘ কন্যা বন কুমারী’ নামের একটি যাত্রা নাটকের বই প্রকাশ হয়েছিল। সে আজীবন চিরকুমার ছিলেন। স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন তিনি। শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকায় বেতন পেতেন অল্প। সামান্য উপার্জন দিয়ে নিজের হাত খরচ এবং সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতেন। সংসারে দুটি বোন কুমারী। লেখালেখির পাশাপাশি নিজের প্রতিষ্ঠিত শিশু কিশোর সংগঠন ভোরের পাখি পরিচালনায় করেছেন তিনি। আমি একজন গদ্য লেখক এবং সাংবাদিক হওয়ার কারণে প্রায় প্রতিদিন দীর্ঘ রাস্তা ভেঙ্গে চলে আসতেন উপজেলা সদরে, আমার নিকট। কথা বলতেন এবং লেখকদের মূল্যায়ন অবমূল্যায়ন ও লেখালেখি নিয়ে। আমি অবশ্য তার বয়সে ছোট। তবুও ঘনিষ্ঠতা ছিল প্রচুর। আবু আসাদ লিখতেন কম। কিন্তু গবেষণা করতেন প্রচুর। তার সমসাময়িক শিশু সাহিত্যিক ফারুক নওয়াজ, খালেক বিন জয়েনউদ্দিন, আসলাম সানী, লুৎফর রহমান রিটন, সুজন বড়ুয়া এবং ছড়াকার আবু সালেহসহ অনেকের কথা বলতেন প্রচুর। তাদের সাথে সখ্যতাও ছিল বেশ। প্রায়ই মোবাইলে ফোন করে খোঁজ খবর নিতেন। লেখালেখি এবং বেশি গবেষণার জন্য বিয়ের কথা মাথায় আনেননি বলে জানিয়েছিলেন আবু আসাদ। দুঃখ করে প্রায়ই বলতেন, যে দেশে লেখকদের সঠিক মুল্যায়ন হয় না, সে দেশে লিখে কি হবে এবং লেখক সৃষ্টি হবে কেমন! সে এও বলতেন যে, লেখকদের যদি মূল্যায়ন করতেই হয়, করে তবে জীবদ্দশায় করা উচিত। এতে করে লেখকদের কর্মস্পৃহা বেড়ে যায় অনেক। আবু আসাদের আজীবন একটি স্বপ্নছিল, তার একটি লেখা পাঠ্য তালিকাভুক্ত হোক; তবেই তার লেখকজীবন স্বার্থক হবে। তার বহু লেখা অগ্রন্থিত রয়েছে। এ লেখাগুলো এবং আবু আসাদ সম্পর্কে তার মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যে ও কেউ কোন খোঁজ নেয়নি। অত্যন্ত অযতেœ অবহেলায় লেখাগুলো নষ্ট হবার যোগাড়। তাই অনেকেই বলছেন, কবি ছড়াকার আবু আসাদের স্বপ্ন পূরণ হবে কবে? লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *