নারীর অধিকার : সমধিকারের নামে অগ্রাধিকার নয়!

alauddin copyমো. আলাউদ্দিন মজুমদার: সম্প্রতি কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলা সদরের একটি স্কুলে বার্ষিক ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগদান করি। ওই অনুষ্ঠানে স্কুলের নবম শ্রেণির মেয়েরা ছেলে-মেয়ে তথা নারী-পুরুষ সমধিকারের জন্য গণসচেতনতামূলক একটি অভিনয় প্রদর্শন করে। সেই অভিনয়ে ফুটে উঠে স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশে নারীর অবহেলা ও বঞ্চনার চিত্র। যখন নারীরা ছিল সম্পূর্ণরূপে অবহেলিত। তাদেরকে কাজ করতে হত দাসীর মত। অন্যদিকে খাওয়া-দাওয়া, চাওয়া-পাওয়াসহ সর্বক্ষেত্রেই পুরুষদের অগ্রাধিকার বজায় ছিল। নারী-পুরুষের সেই আকাশ-পাতাল ব্যবধান এখন আর দেখা যায় না। নারীর প্রতি সেই অবহেলাও আজ আর নেই। উপরোন্ত আজকের এই সমাজে পুরুষরাই তাদের প্রাপ্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকার নারী-পুরুষের সমধিকারের কথা বললেও সেটা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সমাজে নারীরা সর্বক্ষেত্রেই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। একটু বিশ্লেষন করলেই বিষয়টি চোখের সামনে ভেসে উঠবে। আমি সংক্ষেপে পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি।

শিক্ষা ক্ষেত্রে: শিক্ষাক্ষেত্রে সব সময়ই নারীদেরকে পুরুষদের বেশি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিতরণ করা বৃত্তির ৭০ শতাংশই মেয়েদেরকে প্রদান করা হয়। আর ছেলেরা প্রায় মাত্র ৩০ শতাংশ। এতে করে ধনীর দুলালীরা শিক্ষা বৃত্তি পেলেও নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে অনেক অসহায়-দরিদ্র মেধাবী ছেলেই সেই শিক্ষা বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয় । যারা একদিন পড়ালেখার খরচ বহন করতে না পেরে বিপথগামী হয়। তাহলে এটা কোন ধরনের সমধিকার? তাই নারী-পুরুষ সমধিকারের জন্য সকল শিক্ষার্থীকে সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হোক।

প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে: শিক্ষা ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পর প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে একজন মেয়েকে এইচএসসি পাশ হলেই চলে। অথচ ছেলেদেরকে পাশ করতে হয় ডিগ্রি, অনার্স বা সমমান। এতে দেখা যায়, একই চাকরির জন্য মেয়েদের চেয়ে একজন ছেলেকে ৪-৬ বছর বেশি পড়ালেখা করতে হয়। এখানেই শেষ নয়! প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কম যোগ্যতা সম্পন্ন হলেও ৬৫ শতাংশ মহিলা শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। আর বেশি যোগ্যতা থাকলেও পুরুষ শিক্ষক নেয়া হয় মাত্র ৩৫শতাংশ। এতে করে সব ধরণের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারীদের অগ্রাধিকার নামক অভিশাপের কবলে পড়ে অনেক পুরুষ চাকরি বঞ্চিত হয়। তাই এক্ষেত্রেও সমযোগ্যতা সম্পন্ন সমসংখ্যক নারী-পুরুষ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হোক। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে: ফায়ার সার্ভিস ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের জন্য ৫শতাংশ কোটা সংরক্ষিত রাখা হয়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রেই সেই ৫শতাংশ কোটা সংরক্ষিত থাকে। এখানে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যদি আমরা সমধিকারে বিশ্বাসী হই তবে এই কোটা কেন? তাই নারী-পুরুষ সমধিকারের লক্ষ্যে নারীদের সংরক্ষিত কোটা বাতিল করা হোক। এছাড়া যাতায়াতের ক্ষেত্রে পাবলিক বাসগুলোতেও তাদের জন্য সিট সংরক্ষিত থাকে (এটা নিয়ে দ্বিমত নেই)।

আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে: স্বাধীনতা পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের হার ছিল অনেক বেশি। সেই কারণে নির্যাতন প্রতিরোধে ও নির্যাতনকারীকে শাস্তি প্রদানে মহিলাদের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন নামে একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু বর্তমান সমাজে নারী নির্যাতনের চেয়ে পুরুষরাই বেশি নির্যাতিত হচ্ছে। তবে, এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধে বা নির্যাতনকারীকে শাস্তির আওতায় আনতে কোন আইন প্রণয়ন করা হয়নি। যদি আমরা সমধিকারে বিশ্বাসী হই, তবে পুরুষদের জন্যও পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধে একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হোক। এ রকম আরও অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষদের চেয়ে মহিলাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। যা কখনোই সমধিকারের আওতায় পড়েনা। এভাবে চলতে থাকলে একদিন এ সমাজে পুরুষরা কখনো কথাই বলতে পারবে না। তাই, সমধিকারের নামে আর কাউকে অগ্রাধিকার নয়! শুধু উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির ক্ষেতে নয়, সর্বক্ষেত্রেই নারী-পুরুষ সমধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। লেখক: সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *