নতুন বই নিয়ে যত অনিয়ম ও বিড়ম্বনা

মুহাম্মদ আবদুল কাহহার: ‘নতুন বই পায়নি চট্টগ্রামের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী’। গত ৪ জানুয়ারি চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে প্রচারিত সংবাদটি আমাদেরকে দারুণভাবে হতাশ করেছে। আমরা দেখেছি, নতুন বছরকে ঘিরে সারাদেশে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। সে হিসেবে তিনি বাহবা পেতে পারেন। শিক্ষামন্ত্রী প্রশংসার দাবীদার হলে ব্যর্থতার দায় কে নিবেন সেটিও দেখার বিষয়। প্রতিবছর ১ জানুয়ারি বই উৎসব পালন করা হয়। অনেকেই ভাবেন মন্ত্রী হয়তো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করেই দায় শোধ করেছেন, আমরা তা মনে করিনা। কেননা সিলেটের এমসি কলেজে ছাত্রলীগ কর্তৃক অগ্নিকান্ডের ঘটনা দেখে অতি আবেগে কেঁদেছেন। শিক্ষার্থীরা রোদে দাঁড়িয়ে অতিথীদেরকে সম্মান জানাবেন এটা তিনি মেনে নিতে পারেননি বলেই ক্ষণে ক্ষণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষকরা যাতে কোচিং বাণিজ্য করতে না পারেন সে জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন। এ সকল পদক্ষেপ থেকে মনে হচ্ছে তিনি শিক্ষা বান্ধব ও সজ্জন ব্যক্তি। অপরদিকে বই উৎসবের ৪/৫ দিন পরও যখন শিক্ষার্থীরা বই পায়না, সকল পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রশ্নপত্র ফাঁসকে সাজেশন বলা, পরীক্ষায় নকল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের অপরাজনীতি, শিক্ষক নিয়োগে দলীয়করণ, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রের মহড়া, ছাত্রলীগের দলীয় কোন্দলের দিকগুলো বিবেচনায় নিলে সফলতার চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী বলে বোধ হয়।

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে তুলে ধরা হয়েছে, কালোবাজারে সরকারি বই, বই বিতরণে অনিয়ম, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিক্ষোভ, খোলাবাজারে সরকারি বই বিক্রি হচ্ছে, দোকান থেকে বিনামূল্যের বই জব্দ, বই বিতরণে টাকা নেয়ার অভিযোগ সহ অনিয়মের বিভিন্ন চিত্র নিয়মিত লীড নিউজ হচ্ছে। এসকল নেতিবাচক সংবাদ যথারীতি লজ্জাকর। প্রতি বছরই নতুন করে কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। সে সব প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট থানা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করে কালো টাকার বিনিময়ে তাৎক্ষণিক নতুন বই সংগ্রহ করে। এই কারণে বছরের শুরুতে চাহিদা দিয়েও বই পায় না অনেক প্রতিষ্ঠান। বই বিতরণের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি বই নিয়ে এভাবে বাণিজ্য করে আসছে। ফলে সরকার যেমন বিতর্কিত হচ্ছে তেমনি অসাধু ব্যক্তিরা মোটা অংকের টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া নতুন বই নেয়া-কে কেন্দ্র করে অভিভাবক মহলে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, স্কুল থেকে নতুন বই টাকা দিয়ে নিতে হয়। মূলত সরকারি বইয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের থেকে টাকা নেয়া অপরাধ। আবার প্রতিষ্ঠানের সেশন চার্জ, স্কাউট ফি, উন্নয়ন ফি, কম্পিউটার ফি কিংবা বকেয়া মাসিক বেতন আদায় টাকা ব্যতীত বই দেয়া হয় না-এমন সংবাদও পাওয়া যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে অধিকাংশ স্কুলে ক্লাশ শুরু হয়েছে অথচ সবগুলো বই পায়নি শিক্ষার্থীরা। যদিও প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসেই প্রতিষ্ঠান থেকে চাহিদা পাঠানো হয় তার পরেও যথা সময়ে সম্পূর্ণ পাওয়া যায় না। এর ফলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের মাঝে নিয়মিত বাকবিতন্ডা চলে। তারা সরকারের অক্ষমতা মানতে নারাজ। কেননা সরকার পক্ষ থেকে নিয়মিতই বলা হচ্ছে যে, ১ জানুয়ারির মধ্যেই চাহিদানুযায়ী সবগুলো বই বিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রকৃত সত্য হলো, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্কুলে শ্রেণি অনুযায়ী সবগুলো বই ১ জানুয়ারির মধ্যে তারা বুঝে পাননি বিধায় শিক্ষার্থীদেরকে পূর্ণ সেট বই দিতে পারেননি বিধায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। অন্যদিকে, আরেকটি সমস্যা দেখা যাচ্ছে যে, একটি বইয়ের ভেতরের অনেক পৃষ্ঠাই নেই, কিংবা এক বইয়ের মধ্যে অন্য বইয়ের পৃষ্ঠা বাঁধাই করে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা প্রায় প্রতিদিনই নতুন বই ফেরত নিয়ে আসছে।

বই বিতরণের ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো, যে ভেন্যু থেকে সরকারি বইগুলো ছাড় করাতে হয় সে ভেন্যু থেকে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে তিন বা ততোধীক কিস্তিতে বইগুলো গ্রহণ করতে হয়। এতে করে প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। যে সব প্রতিষ্ঠানে তেমন আয় নেই সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতনের টাকা থেকে বই আনার পরিবহন খরচ মেটাতে হয়। সুতারং সকল প্রতিষ্ঠান কিভাবে বইগুলো একই সময় পেতে পারেন সে ব্যবস্থা করা গেলে শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ সাশ্রয় হবে। কেননা ১২ থেকে ১৪ টি বই ৩/৪ বার বিতরণ করতে হলে নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। অভিভাবকদের প্রশ্ন হলো, সকল বই না দিতে পারলে বই উৎসব করার প্রয়োজন কি ? অল্প কয়েকটি বই দিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলে দেশ ব্যাপী ধোঁকা দেয়া হচ্ছে। তারা আরো বলেন, সবকটি বই না দিয়ে বই দেয়া হয়েছে এমন সংবাদ প্রচার বা ভাষণ না দেয়া-ই শ্রেয়। পরীক্ষার অনিয়মের কারণে পাশের হার বেড়ে যাওয়ায় যেমন সরকারের সফলতা এবং শিক্ষার্থীদেরকে সম্পূর্ণ বই না দিয়ে সব বই দেয়া হয়েছে- এমন ঘোষণা দেয়া প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।

সরকারের আস্ফালনের একটি বৈশিষ্ট্য ডিজিটাল বাংলাদেশ। সে হিসেবে ন্যাশনাল কারিকুলাম এ- টেকসটবুক (ঘঈঞই)-র ওয়েবসাইটে বাংলা ও ইংলিশ ভার্সনের সকল ই-বুক থাকার কথা। কিন্তু সে ওয়েবসাইটে রয়েছে অপূর্ণতা। প্রতি বছরই কোন না কোন বই নতুন সংযোজন হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরেও নবম শ্রেণিতে নতুন করে দু’টি বই সিলেবাসের অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে। পাঠ উপস্থাপনের আগে একজন শিক্ষককে পাঠ পরিকল্পনা তৈরী করতে হয়। তা হতে পারে লিখিত-অলিখিত কিংবা অডিও-ভিডিও প্রযুক্তিতে। যেটাই হোক না কেন এ জন্য শিক্ষকের পাঠ্য বইয়ের প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে ই-বুকই শিক্ষক বেশী দরকার হয়। এছাড়া মাল্টিমিডিয়া ক্লাশগুলোতেও ই-বুকের ব্যবহার করা গেলে পাঠ আরো বেশী আকর্ষণীয় হয়। শিক্ষায় তথ্যও প্রযুক্তির ব্যবহার শেখাতে গিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নামের সেই বইটিও যদি এনসিটিবির ওয়েবসাইটে না পাওয়া যায় তখনই প্রশ্ন জাগে এ আবার কেমন ডিজিটাল বাংলাদেশ!

এনসিটিবির ওয়েবসাইটে ২০১৩ ও ২০১৪ সালের অধিকাংশ বই আপলোড করা হলেও বিভিন্ন শ্রেণির ইংলিশ ভার্সনগুলো আপলোড করা নেই। নবম শ্রেণির ভুগোল ও পরিবেশ, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, বিজ্ঞান, ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা, শারীরিক শিক্ষা, কম্পিউটার এবং ৬ষ্ঠ শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, খ্রিষ্টান ধর্ম নৈতিক শিক্ষা, আপলোড করা হয়নি। নবম শ্রেণির অর্থনীতির (’১৪) ক্ষেত্রে বাংলা ভার্সনের স্থলে ইংলিশ ভার্সন বই আপলোড করা হয়েছে। এরকম আরো কয়েকটি বইয়ের ক্ষেত্রে একই অবস্থা বিদ্যমান। এভাবে দায়সারা দায়িত্ব পালন করেই চলছে এনসিটিবির আইটি বা ই-বুক বিভাগ। এ বিষয়ে এনসিটিবির এক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের বইগুলো আপলোড করতে বিলম্ব হবে। সংশ্লিষ্ট আরো কিছু জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর না দিযে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ তার দায়িত্বে অবহেলা করায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বিদ্যালয়গুলোতে বই সীমিত থাকায় শিক্ষকরা অনেকসময় চাহিদা মাফিক বইয়ের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষকরে অনলাইনে বইগুলো না থাকায় বিভিন্ন বইয়ের দোকানে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সরকারি বই বিক্রি নিষিদ্ধ থাকলেও ক্রেতা সাধারণরা বইয়ের দোকানগুলোতেই ভীর করছেন। সেই সুবাদে অসাধু ব্যক্তিরা সরকারি বই পাইরেসি করে বাজারে সরবরাহ করছে। এই সুযোগ কজে লাগিয়ে অনেক বিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী গোপনে বইগুলো বাজারজাত করছে। সরকারি বই বিক্রি করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হলেও এ অপরাধ যেন বেড়েই চলছে। কোথাও কোথাও প্রশাসনের পক্ষ থেকে লোক দেখানো অভিযান হলেও তা কেবল ফটোসেশনের জন্যই করা হয় বলে সাধারণের মানুষ মন্তব্য করেছেন।

সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কয়েকটি বইয়ের দোকানে র‌্যাব-২ অভিযান চালিয়ে যেভাবে সরকারি বই উদ্ধার করেছে তেমনিভাবে নীলক্ষেতসহ বিভিন্ন শহর ও শহরতলী এলাকায় অভিযান অব্যাহত রাখলে এবং দোষী ব্যক্তিদের মোটা অংকের জরিমানা ও দন্ড দেয়া হলে অপরাধীর সংখ্যা কমে আসতে পারে। এছাড়া জেলা ও থানা শিক্ষা অফিস, বই রাখার ভেন্যু এবং বিদ্যালয় ভিত্তিক যেসব অনিয়ম ঘটছে সেগুলো তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। তা-না-হলে দুর্নীতি ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়বে। সব ধরণের অনিয়ম রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলেই সাধারণ মানুষ মনে করেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের আদর্শিকভাবে সহনশীল কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার।

পরিশেষে বলতে চাই, দুনিয়ার সকল শিক্ষাই যেন পরকালে মুক্তির উপায় হয়। আর নতুন বই নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে নওগাঁর মান্দা উপজেলার কুসুম্বা এলাকার পলাশ (১৪) নামের যে ছেলেটি ট্রাকের চাপায় মৃত্যু হয়েছে তার জীবন থেকে যেন আমরা শিক্ষা নিতে পারি-সে প্রত্যাশা থাকল। সেই সাথে তার পরিবারের প্রতি রইলো গভীর সমবেদনা। লেখক: সিনিয়র শিক্ষক, গজমহল ট্যানারী উচ্চ বিদ্যালয় হাজারীবাগ, ঢাকা-১২০৯।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *